খুলনা | মঙ্গলবার | ১৪ জুলাই ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

পুলিশ হেফাজতে স্বামী-স্ত্রী

দাম্পত্য কলহের জেরে হত্যার ঘটনা ফাঁস, উঠান খুঁড়ে নিখোঁজ ইজিবাইক চালকের মরদেহ উদ্ধার

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:০২ এ.এম | ১৪ জুলাই ২০২৬


স্বামী-স্ত্রী মিলে এক ব্যক্তিকে হত্যা করে পুঁতে রেখেছিলেন বাড়ির উঠানে। গত রোজার মাসের মাঝামাঝির এই ঘটনা কেউ জানতেন না। সেই দম্পতির কলহের জেরে এত দিন পর বিষয়টি প্রকাশ্যে চলে এল। থানায় গিয়ে পুলিশকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন স্ত্রী। তাঁর তথ্যের ভিত্তিতে উঠান খুঁড়ে ওই ব্যক্তির মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। ঘটনাটি ঘটেছে হরিণটানা মোস্তুর মোড় রেলক্রসিং সংলগ্ন ব্লু ওয়েল আবাসিক এলাকায় মাটি খুঁড়ে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়। সোমবার দুপুরে একটি বাড়ির মাটি খুঁড়ে মরদেহটি উদ্ধার করা হয়। প্রায় ৫ মাস আগে নিখোঁজ হয় ইজিবাইক চালক মারুফ। মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে। ওই বাড়ির মালিক (৩০) ও তাঁর স্ত্রীকে (২২) আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
সোমবার সকাল ১০টার দিকে গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে হরিণটানা থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে বাড়ির আঙিনা খনন শুরু করে। পরে সেখানে হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ আলামত পাওয়ার কথা জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য বাড়ির মালিক দম্পতি মুরাদ মোল্লা ও ফাল্গুনী খাতুনকে পুলিশ হেফাজতে নেয়া হয়েছে।
পুলিশ ও স্থানীয়রা জানায়, রেল সেতু সংলগ্ন আবাসিক এলাকার বাসিন্দা মুরাদ মোল্লার সাথে তার স্ত্রী ফাল্গুনী খাতুনের প্রায়ই তুচ্ছ ঘটনাকে কেন্দ্র করে কলহ বাধতো। সোমবার সকালেও তার ব্যতিক্রম হয়নি। সকালে মুরাদ মোল্লা তার স্ত্রীকে মারধর করলে ফাল্গুনী খাতুন থানায় গিয়ে স্বামীর বিরুদ্ধে নালিশ করেন।
অভিযোগের এক পর্যায়ে ফাল্গুনী পুলিশকে জানান, তার স্বামী মারুফ নামে এক চালককে হত্যা করে ইজিবাইক ছিনতাই করেছে। পরবর্তীতে সেই ইজিবাইকটি ভেঙে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে বলেও পুলিশের কাছে স্বীকারোক্তি দেন তিনি। ঘটনা শুনে পুলিশ দ্রুত ওই এলাকায় অভিযান চালিয়ে স্বামী মুরাদ মোল্লাকে আটক করে। পরে তাদের দেখানো স্থান থেকে চালক মারুফের মরদেহ উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, রমজান মাসের প্রথম দিকে ইজিবাইক চালককে ভাড়া করার কথা বলে ওই বাড়িতে ডেকে আনা হয়। পরে তাকে খাবারের সঙ্গে অজ্ঞান করার মতো কিছু মিশিয়ে দেয়া হয়েছিল বলে সন্দেহ করা হচ্ছে। একপর্যায়ে তাকে হত্যা করে বাড়ির আঙিনায় মাটি চাপা দেয়া হয়।
প্রাথমিক তদন্তের তথ্যসূত্রে পুলিশ জানিয়েছে, ওই নারী যৌনকর্মের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। এই সূত্রেই কয়েক মাস আগে ওই বাড়ির মালিকের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয় এবং পরে তাঁরা বিয়ে করেন। বিয়ের পরও স্বামীর সহযোগিতায় আগের পেশায় যুক্ত ছিলেন ওই নারী। নিহত ব্যক্তিকেও বাড়িতে ডেকে আনা হয়। এরপর তাঁকে খাবারের সঙ্গে কোনো কিছু খাইয়ে অচেতন করার চেষ্টা করা হয়। একপর্যায়ে স্বামী-স্ত্রী মিলে তাঁকে গলা টিপে হত্যা করেন। পরে মরদেহ বাড়ির সামনের উঠোনে পুঁতে রাখা হয়। বাড়িটি নির্জন এলাকায় হওয়ায় বিষয়টি কারও চোখে পড়েনি।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, নিহত ব্যক্তির ব্যবহৃত ইজিবাইকের খুলনা সিটি কর্পোরেশনের নিবন্ধিত ছিল। হত্যাকাণ্ডের পর ইজিবাইকটির বিভিন্ন যন্ত্রাংশ খুলে বিভিন্ন স্থানে বিক্রি করে দেয়া হয়েছে বলেও প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে তথ্য পাওয়া গেছে।
হরিণটানা থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, নিহত ব্যক্তির নাম গোলাম মোস্তফা মারুফ হতে পারে। তবে এখনও তার পরিচয় আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তিনি মুজগুন্নী বা আশপাশের এলাকার বাসিন্দা হতে পারেন বলে ধারণা করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, ঘনবসতি থেকে কিছুটা দূরে নতুন গড়ে ওঠা আবাসিক এলাকায় বাড়িটি অবস্থিত। সেখানে এমন একটি ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। ঘটনাস্থলে উৎসুক মানুষের ভিড়ও দেখা যায়।
হরিণটানা থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ হেলাল উদ্দিন জানান, ঘটনাস্থলে ইজিবাইকের নম্বর প্লেট পাওয়া গেছে। সেটির সূত্র ধরে খুলনা সিটি করপোরেশনে খোঁজ নেওয়া হয়েছে। সেখানে জানা যায়, নিবন্ধিত মালিক মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি প্রায় চার বছর আগে এটি বিক্রি করে দিয়েছেন। নিহত ব্যক্তি মারুফ নামের কেউ হতে পারেন বা অন্য কেউ। প্রাথমিক তদন্তে জানা গেছে, নিহত ব্যক্তির একটি পা ছিল না।
তবে থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মুরাদ হোসেন মিলন বলেন, চালক মারুফ আসামিদের পূর্বপরিচিত ছিল। গত রমজানের যেকোনো একদিন রাতে ফোন করে মারুফকে বাসায় ডেকে আনা হয়। পরে তাকে ইজিবাইকে বসা অবস্থায় পেছন থেকে দড়ি দিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করা হয়। ওই রাতেই বাড়ির উঠানে তাকে মাটিতে পুঁতে রাখা হয়েছিল। হত্যার পর ইজিবাইকটি ভেঙে টুকরো টুকরো করে বিক্রি করে দেয় তারা। কেএমপির সোনাডাঙ্গা জোনের সহকারী কমিশনার মোঃ হুমায়ুন কবির বলেন, হত্যাকাণ্ডটি গত রমজান মাসের মাঝামাঝি সময়ে ঘটেছে। বিষয়টি এত দিন সামনে আসেনি। ওই দম্পতির মধ্যে পারিবারিক কলহের এক পর্যায়ে স্ত্রী থানায় এসে ঘটনাটি জানান। এরপর তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিহত ব্যক্তি একজন ইজিবাইকচালক বলে ধারণা করা হচ্ছে, তবে এখনো তাঁর নাম-পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। তাঁর নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে থানায় কোনো অভিযোগ পাওয়া যায়নি। মরদেহের বেশির ভাগ অংশ মাটির সঙ্গে মিশে গেছে। ঘটনাস্থলে পুলিশের পাশাপাশি পিবিআই ও সিআইডির সদস্যরা কাজ করেছেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ