খুলনা | মঙ্গলবার | ১৪ জুলাই ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

মানি লন্ডারিংয়ের মামলায় গাইবান্ধা থেকে রাম মূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র গ্রেফতার

খবর প্রতিবেদন |
০১:১০ এ.এম | ১৪ জুলাই ২০২৬


সারাদেশব্যাপী আলোচিত গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় রাম মূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস (৩৬) কে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের একটি মামলায় গ্রেফতার করেছে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) পুলিশ। রোববার দিবাগত রাত সাড়ে ১২টার দিকে উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দির এলাকা থেকে তাকে গ্রেফতার করা হয়।
গ্রেফতারকৃত হরিদাস চন্দ্র ওরফে তরুণী দাস উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের গোপীনাথ চন্দ্র দাসের ছেলে এবং শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দির ও মন্দির এলাকায় রামমূর্তি নির্মাণের মূল উদ্যোক্তা। 
সোমবার পলাশবাড়ী থানার ওসি সরোয়ার আলম খান গ্রেফতারের বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ঢাকার উত্তরা (পশ্চিম) থানার একটি মানি লন্ডারিং মামলায় তাকে ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন ডিপার্টমেন্ট (সিআইডি) পুলিশ গ্রেফতার করেছে। এবং তাকে ঢাকায় নিয়ে যাওয়া হয়েছে। তিনি আরো জানান, এরপর মন্দির এলাকায় অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছে এবং পরিবেশ স্বাভাবিক রয়েছে।
এদিকে সোমবার দুপুরে বিষয়টি নিশ্চিত করেন গাইবান্ধার পুলিশ সুপার (এসপি) মোঃ জসিম উদ্দিন। তিনি মুঠোফোনে জানান, ঢাকায় হওয়া মানি লন্ডারিং মামলায় হরিদাস চন্দ্রকে গ্রেফতার করা হয়। তাঁর ব্যাংক হিসাবে প্রায় ১০ কোটি টাকা অবৈধ লেনদেন ছিল, এটা নগদ লেনদেন। এ ছাড়া হুন্ডির মাধ্যমেও লেনদেন হয়েছে।
এসপি আরও জানান, ২ জুলাই থেকে এ টাকার উৎস ও বিভিন্ন তথ্য অনুসন্ধান করছিল সিআইডি। অনুসন্ধান শেষে রোববার হরিদাস চন্দ্রের বিরুদ্ধে ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানায় মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনে মামলা হয়। সে মামলায় তাঁকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাতেই তাঁকে ঢাকায় নিয়ে গেছে সিআইডি।
এ বিষয়ে সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তি থেকে জানা যায়, হরিদাস চন্দ্র গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্য রামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা। তাঁর বাবার নাম গোপীনাথ তরনীদাস। বাবার অভাবের সংসারে ৫ ভাই ও এক বোনের মধ্যে হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস ছিল ৪র্থ। তিনি ২০০৬ সালে হাসবাড়ী বহুমুখী উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি এবং ২০০৮ সালে ঢাকার কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর ২০১০ সালে অবৈধভাবে ভারতে গিয়ে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ গ্রহণ শেষে দেশে ফেরেন।
সিআইডির সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, ২০১৯ সালে হরিদাস ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তৌহিদ ইসলাম নাম ধারণ করেন। এরপর বিভিন্ন সময় নিজেকে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রীর প্রটোকল কর্মকর্তা হিসেবে পরিচয় দিতেন। তাঁর বিরুদ্ধে সরকারি চাকরি পাইয়ে দেওয়া, বদলি, হুন্ডি ও সংঘবদ্ধ অপরাধ সংক্রান্ত বিভিন্ন অভিযোগ আছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেখা যায়, বৈধ কোনো আয়ের উৎস না থাকা সত্তে¡ও বিভিন্ন ব্যাংক হিসাব ও মুঠোফোনে আর্থিক সেবার হিসাবে তাঁর ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকা জমা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রায় সমপরিমাণ অর্থ উত্তোলনও করা হয়েছে, যা সন্দেহজনক হিসেবে দেখছে সিআইডি।
সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হরিদাসের ব্যাংক হিসাবগুলোতে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে বিভিন্ন ব্যক্তি বিপুল অর্থ জমা করেছেন, যা তাঁর পেশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অনুসন্ধানকালে বনানী থানায় তাঁর বিরুদ্ধে একটি মামলার তথ্যও পাওয়া যায়। ওই মামলায় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের ২৪ ধারাসহ দণ্ডবিধির ১৬৭, ১৬৮, ৪০৬ ও ৪২০ ধারার অভিযোগ আনা হয়েছে।
সিআইডির প্রাথমিক অনুসন্ধানে দেশি-বিদেশি মুদ্রা পাচার ও সংঘবদ্ধ অপরাধের অভিযোগের সত্যতা পাওয়ায় মামলা করা হয়েছে। তাঁর সন্দেহজনক লেনদেনের বিষয়ে তদন্ত কার্যক্রম চলমান।
২০২২ সালের ৮ নভেম্বর র‌্যাবের যৌথ অভিযানে সহযোগীসহ ঢাকার বনানী থেকে আটক হন হরিদাস। সে সময় কেউ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা না করায় তাঁকে ৫৪ ধারায় কারাগারে পাঠানো হয়। পরে তিনি কারাগার থেকে মুক্তি পান।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর হরিদাস চন্দ্র মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামে দুই একর জমির ওপর শ্রীশ্রী রাধাগোবিন্দ ও কালীমন্দিরে পুরোনো অবকাঠামোর পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। সেখানে ২৮ ফুট উচ্চতার শিবমূর্তি ও ৫৩ ফুট উচ্চতার কৃষ্ণমূর্তি নির্মাণ করা হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৬ অক্টোবর মন্দিরটির কৃষ্ণমূর্তি উদ্বোধন করেন ভারতীয় সহকারী হাইকমিশনার মনোজ কুমার। ৮১ ফুট উচ্চতার রামের মূর্তি নির্মাণাধীন।
এ ছাড়া ২০১৯ সালে ময়মনসিংহ বিভাগের ফুলবাড়িয়া এলাকায় প্রায় এক বিঘা জমি কিনে সেখানে রিসোর্ট করার তথ্য পাওয়া গেছে।
স¤প্রতি হরিদাস চন্দ্রের আয়ের উৎস খুঁজে বের করা ও তাঁকে গ্রেফতারের দাবিতে গাইবান্ধায় সচেতন নাগরিক ফোরামের ব্যানারে আন্দোলন শুরু হয়। কয়েক দফায় মানববন্ধন হয়। শেষ রোববার দুপুরে পলাশবাড়ী উপজেলা সদরের চৌরাস্তা এলাকায় মানববন্ধন হয়েছে।
উল্লেখ্য, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলায় গ্রামের শ্রী শ্রী কালি মন্দিরের পুরাতন অবকাঠামো পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের কাজ করার উদ্যোগ নেন হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস। এ বিষয়ে গ্রামে একটি বৈঠক করেন। ওই  বৈঠকে হরিদাসকে সভাপতি এবং বিপিন চন্দ্র দাসকে সাধারণ সম্পাদক করে মন্দির কমিটি গঠন করা হয়।  ২০২৫ সালের মে মাসে গ্রামের শ্রী শ্রী কালি মন্দিরের পুরাতন অবকাঠামো পরিবর্তন করে আধুনিকায়নের কাজ শুরু করেন। মন্দিরের নাম পরিবর্তন করে শ্রী শ্রী রাধা গোবিন্দ কালি মন্দির নাম করণ করেন। পরবর্তীতে স¤প্রতি মন্দির চত্বরে ৮১ ফুট রাম মূর্তি নির্মাণ কাজ শুরু করেন। এসব নির্মাণ কাজ ও কাজের অর্থের উৎস নিয়ে দেশব্যাপী আলোচনায় আসেন হরিদাস চন্দ্র তরুণী দাস। এরপর রাম মূর্তি অপসারণ ও তাকে গ্রেফতার এবং এসব কাজে অর্থের অনুসন্ধানের দাবিতে পলাশবাড়ী ও গাইবান্ধাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সভা-সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ