খুলনা | বুধবার | ১৫ জুলাই ২০২৬ | ৩০ আষাঢ় ১৪৩৩

অটোমেশনের দুনিয়ায় কোন চাকরি টিকে থাকবে?

এলিন মাহবুব |
০১:৫৭ এ.এম | ১৫ জুলাই ২০২৬


একসময় মানুষ ভাবত রোবট শুধু সিনেমার পর্দাতে থাকবে। কিন্তু আজ বাস্তবতা ভিন্ন। কারখানা থেকে ব্যাংক, হাসপাতাল থেকে সংবাদমাধ্যম সবখানে ধীরে ধীরে জায়গা করে নিচ্ছে রোবটিক্স ও অটোমেশন। প্রযুক্তির এই দ্রুত অগ্রযাত্রা যেমন উৎপাদনশীলতা বাড়াচ্ছে, তেমনি সৃষ্টি করছে এক বড় প্রশ্ন—ভবিষ্যতের শ্রমবাজার কি মানুষের জন্য সংকুচিত হয়ে যাবে?
বিশ্ব অর্থনীতির বর্তমান বাস্তবতায় “অটোমেশন” আর বিলাসিতা নয়; এটি ব্যবসায়িক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার অস্ত্র। বড় বড় প্রতিষ্ঠান এখন এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করছে যা কম সময়ে, কম খরচে এবং কম ভুলে কাজ সম্পন্ন করতে পারে। ফলে ঐতিহ্যগত অনেক চাকরি ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশেষ করে পুনরাবৃত্তিমূলক কাজগুলো যেমন ডাটা এন্ট্রি, ক্যাশিয়ারিং, কল সেন্টার সাপোর্ট কিংবা সাধারণ ম্যানুফ্যাকচারিং ধীরে ধীরে মেশিনের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে।
বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের তথ্যমতে, আগামী কয়েক বছরে অটোমেশন কোটি কোটি চাকরির ধরন বদলে দিতে পারে। তবে এর অর্থ এই নয় যে সব চাকরি হারিয়ে যাবে। বরং চাকরির প্রকৃতি বদলাবে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে সবচেয়ে বেশি মূল্য পাবে সৃজনশীলতা, বিশ্লেষণী দক্ষতা, আবেগীয় বুদ্ধিমত্তা এবং প্রযুক্তি ব্যবস্থাপনার মতো মানবিক সক্ষমতা।
বাংলাদেশের মতো উন্নয়নশীল দেশের জন্য বিষয়টি একইসঙ্গে সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ। দেশের তৈরি পোশাক শিল্প দীর্ঘদিন ধরে স্বল্পমূল্যের শ্রমশক্তির ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু যদি আন্তর্জাতিক বাজারে অটোমেটেড ফ্যাক্টরির সংখ্যা বাড়তে থাকে, তাহলে কম দক্ষ শ্রমিকদের জন্য প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠবে। অন্যদিকে, যারা রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সফটওয়্যার এবং ডাটা অ্যানালিটিক্সে দক্ষ হবে, তাদের জন্য নতুন সম্ভাবনার দরজা খুলবে।
এখানেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে “রিস্কিলিং” ও “আপস্কিলিং”। শুধু ডিগ্রি নয়, এখন প্রয়োজন ভবিষ্যত উপযোগী দক্ষতা। বিশ্বের অনেক দেশ ইতোমধ্যে স্কুল পর্যায় থেকেই কোডিং, রোবটিক্স ও ডিজিটাল শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করার দিকে যাচ্ছে। কারণ আগামী দিনের শ্রমবাজারে টিকে থাকতে হলে মানুষকে মেশিনের সঙ্গে প্রতিযোগিতা নয়, বরং সহযোগিতা করতে শিখতে হবে।
রোবট হয়তো দ্রুত হিসাব করতে পারে, কিন্তু নেতৃত্ব দিতে পারে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা তথ্য বিশ্লেষণ করতে পারে, কিন্তু মানুষের অনুভূতি বুঝতে পারে না। তাই ভবিষ্যতের পৃথিবীতে সবচেয়ে সফল হবে সেই মানুষ, যে প্রযুক্তিকে ভয় না পেয়ে তাকে নিজের সক্ষমতার অংশ বানাতে পারবে।
অটোমেশনের যুগে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রযুক্তি নয়; বরং পরিবর্তনের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা। যে সমাজ দ্রুত দক্ষতা উন্নয়ন করবে, তারাই ভবিষ্যতের অর্থনীতিতে নেতৃত্ব দেবে। আর যারা পুরোনো কাঠামো আঁকড়ে থাকবে, তারা পিছিয়ে পড়বে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায়।
আজকের শিশুদের অনেক চাকরিই হয়তো এখনও তৈরি হয়নি। তাই ভবিষ্যতের প্রস্তুতি মানে শুধু চাকরি খোঁজা নয়, বরং এমন দক্ষতা তৈরি করা যা প্রযুক্তির পরিবর্তনের মধ্যেও মূল্যবান থাকবে। রোবটিক্স ও অটোমেশন তাই কেবল প্রযুক্তির গল্প নয়; এটি মানবসভ্যতার নতুন অর্থনৈতিক বাস্তবতার গল্প।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

অন্যান্য

প্রায় ৩ মাস আগে