খুলনা | শনিবার | ১৮ জুলাই ২০২৬ | ৩ শ্রাবণ ১৪৩৩

শ্রীশ্রী জগন্নাথ দেবের রথ যাত্রার ইতিহাস ও ঐতিহ্য

কৃষ্ণ গোপাল সেন |
০২:০৯ এ.এম | ১৬ জুলাই ২০২৬


‘জগন্নাথ’ শব্দটির সন্ধিবিচ্ছেদ করলে পাওয়া যায়: জগৎ + নাথ = জগন্নাথ। এর সরল অর্থ হলো “জগতের প্রভু বা মহাবিশ্বের স্বামী”। সনাতন ধর্মে শ্রীকৃষ্ণকে স্বয়ং পূর্ণব্রহ্ম বা পরমেশ্বর ভগবান মনে করা হয়। শ্রীকৃষ্ণের এই বিশেষ রূপটি এবং তাঁর ‘জগন্নাথ’ নাম ধারণের পেছনে বেশ কিছু পৌরাণিক ও আধ্যাত্মিক কারণ রয়েছে:
অঙ্গহীন অদ্ভুত রূপের রহস্য (পৌরাণিক উপাখ্যান)
প্রচলিত কাহিনী অনুযায়ী, দ্বারকায় ভগবান শ্রীকৃষ্ণ লীলা সংবরণ করার পর তাঁর মরদেহ দাহ করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তাঁর নাভিদেশ (হৃদয় অংশ) দাহ করা সম্ভব হয়নি, কারণ তা ছিল দিব্য ও অবিনশ্বর। পরে পরম ভক্ত রাজা ইন্দ্রদুমন্যকে ভগবান স্বপ্নে নির্দেশ দেন যে, ওই পবিত্র অংশটি নীলাচলে (বর্তমান পুরী) এনে দারুব্রহ্ম (নিম কাঠ) দিয়ে মূর্তি   তৈরি করতে।
রাজা ইন্দ্রদুমন্য দেবশিল্পী বিশ্বকর্মা কে মূর্তি গড়ার দায়িত্ব দেন। বিশ্বকর্মা একটি শর্ত দেন: তিনি একটি বন্ধ ঘরের ভেতরে মূর্তি তৈরি করবেন এবং ২১ দিন পূর্ণ হওয়ার আগে কেউ যেন সেই ঘরের দরজা না খোলে। কিন্তু ১৪-১৫ দিন পর ঘরের ভেতর থেকে কোনো হাতুড়ি বা খোদাইয়ের শব্দ না পেয়ে ব্যাকুল হয়ে রানী গুণ্ডিচার অনুরোধে রাজা দরজা খুলে ফেলেন। শর্ত ভঙ্গ হওয়ায় ক্রুদ্ধ ও অসন্তুষ্ট বিশ্বকর্মা মূর্তিগুলোকে অর্ধসমাপ্ত রেখেই চলে যান-ফলে মূর্তির হাত, পা বা কান তৈরি করা সম্ভব হয়নি।
রাজা অত্যন্ত অনুতপ্ত হলে ভগবান পুনরায় স্বপ্নে দেখা দিয়ে বলেন, “আমি এই রূপেই পূজা পেতে চাই। চোখ ও কান ছাড়াই আমি ভক্তের সব আকুতি দেখতে ও শুনতে পাই। আর হাত-পা ছাড়াই আমি ব্রহ্মাণ্ডের সর্বত্র বিরাজ করি এবং বিশ্ব চরাচর পরিচালনা করি। এভাবেই হাত-পাবিহীন ব্রহ্মরূপী শ্রীকৃষ্ণ ‘জগন্নাথ’ বা জগতের নাথ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হন।
শ্রীকৃষ্ণের পরম বৃন্দাবন ভাব
দার্শনিক দিক থেকে, জগন্নাথ হলেন শ্রীকৃষ্ণের সেই রূপ যা বৃন্দাবনের জন্য তাঁর গভীর বিরহবেদনা প্রকাশ করে। একবার দ্বারকায় রোহিনী দেবী শ্রীকৃষ্ণের বৃন্দাবনলীলা ও গোপীদের বিরহের কথা শুনাচ্ছিলেন। তা আড়ালে দাঁড়িয়ে শুনে শ্রীকৃষ্ণ, বলরাম ও সুভদ্রা এতই ভাববিহŸল ও গলে যান (মহাভাব দশা) যে, তাঁদের চোখ বড় বড় হয়ে যায় এবং হাত-পা শরীরের ভেতরে সংকুচিত হয়ে যায়। নারদ মুনি তাঁদের এই অদ্ভুত প্রেমময় রূপ দর্শন করে প্রার্থনা করেন, যেন এই রূপেই ভগবান মর্ত্যে পূজিত হন। সেই প্রার্থনা অনুসারেই শ্রীকৃষ্ণের এই রূপ এবং তিনি জগৎকে উদ্ধারকারী ‘জগন্নাথ’।
জগন্নাথ দেবের রথযাত্রার ইতিহাস ও ঐতিহ্য
রথযাত্রা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ও প্রাচীন একটি উৎসব। এটি মূলত উড়িষ্যার পুরীধামকে কেন্দ্র করে বিশ্বজুড়ে উদযাপিত হয়।
রথযাত্রার ইতিহাস অত্যন্ত প্রাচীন। সনাতন শাস্ত্র ও পুরাণ অনুযায়ী, রথযাত্রার সূচনা নিয়ে কয়েকটি প্রধান মতবাদ রয়েছে:
বৃন্দাবনে প্রত্যাবর্তনের আকাক্সক্ষা: দ্বাপর যুগে শ্রীকৃষ্ণ যখন ব্রজধাম (বৃন্দাবন) ছেড়ে মথুরা ও পরে দ্বারকায় চলে যান, তখন বৃন্দাবনের গোপী ও ভক্তরা তাঁর বিরহে কাতর ছিলেন। পরবর্তীতে কুরুক্ষেত্রে সূর্যগ্রহণের সময় শ্রীকৃষ্ণের সাথে বৃন্দাবনবাসীদের দেখা হয়। ভক্তরা তাঁকে রথে বসিয়ে পুনরায় বৃন্দাবনে ফিরিয়ে আনার আকুতি জানান। ভক্তদের এই আকুতি ও ভালোবাসাকে স্মরণ করেই প্রতিবছর রথযাত্রা পালন করা হয়-যেখানে জগন্নাথদেব দ্বারকা (শ্রীমন্দির) ছেড়ে তাঁর শৈশবের বৃন্দাবনে (গুণ্ডিচা মন্দির) যাত্রা করেন।
রাজা ইন্দ্রদ্যুম্নের সূচনা: স্কন্দপুরাণ অনুযায়ী, সত্যযুগে পরম ভক্ত রাজা ইন্দ্রদ্যুম্ন যখন পুরীতে জগন্নাথ মন্দিরের প্রতিষ্ঠা করেন, তখন থেকেই জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রার এই রথযাত্রা উৎসবের সূচনা হয়।
রথযাত্রার মূল ঐতিহ্য ও রীতিনীতি
রথযাত্রা উৎসব কেবল একটি শোভাযাত্রা নয়, এর সাথে জড়িয়ে আছে শত শত বছরের প্রাচীন ঐতিহ্য ও সূ² নিয়মকানুন। স্নানযাত্রা ও অনবসর (অসুস্থতার লীলা)
রথযাত্রার ঠিক ১৫ দিন আগে জ্যৈষ্ঠ মাসের পূর্ণিমা তিথিতে জগন্নাথ দেবের  ‘স্নানযাত্রা’ অনুষ্ঠিত হয়। ১০৮ কলসি সুগন্ধি জল দিয়ে স্নানের  জন্য অতিরিক্ত স্নানের কারণে ভগবান “জ্বরে আক্রান্ত” হন এবং অসুস্থ হয়ে পড়েন। একে বলা হয় অনবসর' বা ‘আনসার’। এই ১৫ দিন মূল মন্দির বন্ধ থাকে, ভগবান কোনো দর্শন দেন না এবং তাঁকে ভেষজ কবিরাজি ওষুধ ও ফলমূলের রস পথ্য হিসেবে দেওয়া হয়। ১৫ দিন পর সুস্থ হয়ে আষাঢ়ের দ্বিতীয় তিথিতে তিনি ভক্তদের দর্শন দেন এবং রথে চড়েন।
তিনটি রথের মহিমা ও বৈশিষ্ট্য
রথযাত্রায় তিনটি বিশাল কাঠের রথ তৈরি করা হয়। প্রতি বছর সম্পূর্ণ নতুন কাঠ দিয়ে অত্যন্ত নিখুঁত মাপে এই রথগুলো বানানো হয়, যেখানে কোনো লোহা বা পেরেক ব্যবহার করা হয় না।
গুণ্ডিচা মন্দিরে গমন ও মাসির বাড়ি যাত্রা
রথযাত্রার দিন পুরীর মূল মন্দির (শ্রীমন্দির) থেকে টেনে রথ তিনটিকে প্রায় ৩ কিলোমিটার দূরে গুণ্ডিচা মন্দিরে (যা জগন্নাথের মাসির বাড়ি হিসেবে পরিচিত) নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানে জগন্নাথ, বলরাম ও সুভদ্রা সাত দিন অবস্থান করেন।
উল্টো রথযাত্রা  বা বাহুড়া যাত্রা
গুণ্ডিচা মন্দিরে সাত দিন থাকার পর, আষাঢ় মাসের শুক্লপক্ষের দশমী তিথিতে ভগবান আবার নিজের মূল মন্দিরে ফিরে আসেন। একে বলা হয়  ‘উল্টো রথ’ বা ‘বাহুড়া যাত্রা’। এর মাধ্যমেই রথযাত্রা উৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটে।
আধ্যাত্মিক ও সামাজিক তাৎপর্য
জাতিভেদহীন মহামিলন: পুরীর জগন্নাথ মন্দিরে জাতি, ধর্ম বা বর্ণের কোনো ভেদাভেদ নেই। যেকোনো ধর্মের মানুষ রথের দড়ি স্পর্শ করতে পারেন। জগতের নাথ মন্দিরের গর্ভগৃহ থেকে বের হয়ে রাজপথে আসেন যাতে সব স্তরের মানুষ ধনী, দরিদ্র, অস্পৃশ্য নির্বিশেষে তাঁর দর্শন পেতে পারেন।
মহাপ্রসাদের মাহাত্ম্য: রথযাত্রার সময়ে এবং মন্দিরে প্রতিদিন যে ‘মহাপ্রসাদ’ রান্না করা হয়, তা মাটির পাত্রে একের ওপর আরেকটি বসিয়ে অদ্ভুত উপায়ে রান্না করা হয়। এই প্রসাদ বিশ্বজনীন এবং যেকোনো মানুষ একসাথে বসে এই প্রসাদ গ্রহণ করতে পারেন, যা সামাজিক সাম্যের এক অপূর্ব দৃষ্টান্ত।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, শ্রীকৃষ্ণই হলেন পরমেশ্বর জগন্নাথ। যিনি অহংকারমুক্ত ও প্রেমময় হৃদয়ে ভক্তদের কাছে ধরা দিতে প্রতি বছর রথে চড়ে রাজপথে নেমে আসেন। আর এই কারণেই রথযাত্রা যুগে যুগে সনাতন সংস্কৃতির অন্যতম সেরা ঐতিহ্য ও স¤প্রীতির প্রতীক হয়ে টিকে রয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ