খুলনা | রবিবার | ১৯ জুলাই ২০২৬ | ৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

অবশেষে স্বজনদের সন্ধান পেলেন মোংলার শিকল বাঁধা সেই নারী

মোংলা প্রতিনিধি |
০২:১২ এ.এম | ১৯ জুলাই ২০২৬


সময় টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে স্বজনদের কাছে ফিরে গেছেন পায়ে শিকল বাঁধা, নাম-পরিচয়হীন সেই অবহেলিত নারী। শনিবার মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এসে ওই নারীকে নিজের সন্তান ও বোন হিসেবে শনাক্ত করে বুকে জড়িয়ে নেন পরিবারের সদস্যরা। এ সময় হাসপাতালের এক আবেগঘন পরিবেশের সৃষ্টি হয়। তার ৬ মাসের একটি পুত্র সন্তান রয়েছে, মাকে না পেয়ে চরম অসুস্থ হয়ে পড়েছে মিশু সন্তানটি। 
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ সূত্রে জানা যায়, উদ্ধার হওয়া ওই নারীর নাম রাবেয়া আক্তার। তিনি রুহুল আমিন ও সায়েরা বেগম দম্পত্তির মেয়ে। ছোট বেলাতেই পরিবার ছেড়ে চলে যান বাবা রুহুল আমিন। এরপর থেকে তিন বোন ও মাকে নিয়ে অত্যন্ত অভাব-অনটনের মাঝে বড় হন রাবেয়া। পরবর্তীতে বিয়ে হলেও স্বামীর অবহেলা এবং চরম দারিদ্র্যের কারণে একপর্যায়ে তিনি মানসিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়েন। ঘরে তার মাত্র ৬ মাস বয়সী একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। মায়ের অনুপস্থিতিতে শিশুটি বর্তমানে চরম অসুস্থ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। গত মাসের ১৮ জুন সকালে হঠাৎ করেই বাড়ি থেকে নিখোঁজ হন রাবেয়া। এরপর দীর্ঘ এক মাস ধরে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজাখুঁজি করেও তার কোনো সন্ধান পায়নি পরিবার। মেয়েকে হারিয়ে মা সায়েরা বেগম পাগল প্রায় হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন।
গত ৫ জুলাই সকালে মোংলা বাসস্ট্যান্ড এলাকায় পায়ে শিকল বাঁধা এবং রক্তাক্ত জখম অবস্থায় অজ্ঞাত এই নারীকে দেখতে পান রাজু নামের এক স্থানীয় যুবক। তিনি মানবিকতার খাতিরে তাকে দ্রুত উদ্ধার করে মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। পরিচয় না থাকায় ডাঃ শাহিন সহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষই তার যাবতীয় চিকিৎসার দায়িত্ব নেয় এবং দীর্ঘ ১৪ দিন ধরে তাকে নিবিড় চিকিৎসা সেবা প্রদান করে।
পায়ে শিকল বাঁধা এই নারীর কোনো পরিচয় না মেলায় স¤প্রতি সময় টেলিভিশনে একটি বিশেষ প্রতিবেদন প্রচার করা হয়। সেই সংবাদটি নজরে আসে রাবেয়ার পরিবারের। টেলিভিশনে নিজেদের মেয়ের ছবি ও খবর দেখে শনিবার সকালেই মোংলা হাসপাতালে ছুটে আসেন বড় বোন  ছুপিয়া বেগমসহ অন্য স্বজনরা। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া বোনকে জীবিত এবং সুস্থ অবস্থায় ফিরে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন তারা। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া ও যাচাই-বাছাই শেষে রাবেয়াকে তার পরিবারের কাছে হন্তান্তর করেছে। মেয়েকে ফিরে পেয়ে স্বজনরা সময় টেলিভিশন ও হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন। 
মোংলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল অফিসার এস এম শাহরিয়ার ইসলাম বলেন, আমরা সকলকেই সমান চোখে দেখে চিকিৎসা দেয়, তবে নাম পরিচয়হীন এই নারীকে আমরা সব সময় নজরে রেখে সেবা দিয়েছি। এখন সে পরিবারকে খুঁজে পেয়েছে এতে আমরাও খুশি। রাবেয়াকে হাসপাতালে ভর্তির সময় রাবেয়ার শরীরের বিভিন্ন স্থানে আঘাত ও কিছুর রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন ছিল। কর্তব্যরত চিকিৎসকেরা অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে তার সেই ক্ষতগুলোর ড্রেসিং এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসা সেবা দিয়েছেন। পায়ে লোহার শিকল বাঁধা থাকা এবং দীর্ঘদিনের অবহেলার কারণে রাবেয়া তীব্র মানসিক ট্রমা এবং শারীরিক অসুস্থতায় ভুগছিলেন। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তাকে দীর্ঘ ১৪ দিন সম্পূর্ণ নিবিড় পর্যবেক্ষণে রেখে শারীরিক ও মানসিকভাবে সুস্থ করে তোলার চেষ্টা করেছেন। তিনি আরো জানান, ভর্তির প্রথম দিকে আংশিক অচেতন অবস্থায় তিনি নিজের এবং বাবা-মায়ের নাম আংশিক বলতে পারলেও, পরবর্তীতে অতিরিক্ত মানসিক ট্রমায় চলে যাওয়ায় আর কিছুই বলতে পারছিলেন না। ফলে তার পূর্ণাঙ্গ পরিচয় নিশ্চিত করা ডাক্তারদের জন্য বেশ কঠিন ছিল। ১৪ দিনের সুচিকিৎসায় রাবেয়া শারীরিক ও মানসিকভাবে কিছুটা সুস্থ হওয়ার পর, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ প্রশাসনের সহায়তায় ও প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া মেনে তাকে তার বড় বোন সুপিয়া বেগমের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
মোংলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শারমীন আক্তার সুমী বলেন, পায়ে শিকল বাঁধা অবস্থায় অজ্ঞাত এক নারীকে উদ্ধারের বিষয়টি জানার পরপরই আমরা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তার চিকিৎসা ও নিরাপত্তার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিই। সময় টেলিভিশনে সংবাদ প্রকাশের পর আজ তার প্রকৃত পরিবারকে শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। আমরা প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া এবং যাচাই-বাছাই সম্পন্ন করে রাবেয়াকে তার স্বজনদের কাছে হস্তান্তর করেছি। একটি অসহায় ও দরিদ্র পরিবারের সন্তানকে এভাবে সুস্থ অবস্থায় তার মায়ের কোলে ফিরিয়ে দিতে পারা অত্যন্ত স্বস্তির। রাবেয়া ও তার সন্তানের চিকিৎসার বিষয়ে তার নিজ এলাকার উপজেলা প্রশাসন ও সমাজসেবা অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে পরবর্তীতে সব ধরনের মানবিক সহায়তা প্রদান করার জন্য সুপারিশ করা হবে বলে জানান তিনি।  
কোলে শিশু সন্তান আর স্বামীর অবজ্ঞা, কিছু বুঝে উঠতে না পেরে বাসে উঠেছিল রাবেয়া। কিন্তু বাস থেকে কেউ একজন ধাক্ক দিয়ে ফেলে দিলে রক্তাক্ত জখম হয় সে, এখনও তার সরিরে আঘাতের চিহ্নি দেখা যাচ্ছে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ