খুলনা | মঙ্গলবার | ২১ জুলাই ২০২৬ | ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

বেতনা নদীর অব্যাহত ভাঙনে হুমকির মুখে সাতক্ষীরার ঐতিহ্যবাহী বুধহাটা বাজার

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা ও আশাশুনি প্রতিনিধি |
০২:২০ এ.এম | ২০ জুলাই ২০২৬


সাতক্ষীরার সদর ও আশাশুনি উপজেলার মধ্যদিয়ে প্রবাহিত বেতনা (বেত্রাবতি) নদীর তিনটি পয়েন্টে পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) ভেড়িবাঁধে ভয়াবহ ভাঙন দেখা দিয়েছে। বেতনার অব্যাহত ভাঙনে হুমকির মুখে পড়েছে আশাশুনি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী বুধহাটা বাজার। ভাঙনরোধে দ্রুত জরুরি ব্যবস্থা না নিলে বাজারের একটি বড় অংশের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদী গর্ভে চলে যেতে পারে আশঙ্কা ব্যবসায়ী ও স্থানীয়দের। 
টানা কয়েক দিনের বৃষ্টিতে জেলার নদ-নদীর পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় প্রবল স্রোতের টানে সাতক্ষীরা সদর উপজেলার বিনেরপোতা ও আশাশুনি উপজেলার নওয়াপাড়া এবং বুধহাটা বাজারসংলগ্ন এলাকায় বেতনা নদীর ভেড়িবাঁধে ফাটল ও ভয়াবহ ভাঙনের সৃষ্টি হয়েছে। ভাঙন পয়েন্টে দ্রুত সংস্কার না করলে যে কোন মুহূর্তে সম্পূর্ণ বাঁধ ভেঙে সদর ও আশাশুনি উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে পড়তে পারে। ফলে ভাঙন আতঙ্কে স্থানীয়দের মধ্যে চরম উদ্বেগ সৃষ্টি হয়েছে।
নওয়াপাড়া গ্রামের বাসিন্দা মুজিবর রহমান জানান, আশাশুনির কুল্যা ইউনিয়নের বাহাদুরপুর ও বাইনবসত অংশের বেতনা নদী খননের কাজ শেষ না করায় নদীর স্রোত সরাসরি নওয়াপাড়ার ভেড়িবাঁধে এসে আঘাত হানছে। এতে করে নওয়াপাড়া পয়েন্টে প্রায় ৩০০ থেকে ৪০০ ফুট এলাকা জুড়ে বাঁধের নিচের অংশ নদীগর্ভে ধ্বসে পড়েছে। পাশাপাশি প্রায় ১৫০ ফুট এলাকা জুড়ে মূল বাঁধে ভয়াবহ ফাটলের সৃষ্টি হয়েছে, যা ক্রমশঃ বাড়ছে। কয়েক দিনে টানা বৃষ্টিপাতের ফলে নদীর পানি বৃদ্ধির পাশাপাশি স্রোত বেড়ে যাওয়ায় মাত্র দুই দিনের ব্যবধানে বাঁধের মাটি ধসে নিচে নেমে গেছে। এতে করে এলাকাবাসীর মধ্যে আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।  দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ না করলে যেকোনো সময় বাঁধ ভেঙে বুধহাটা ও ফংড়ী ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ জনপদ, ফসলি জমি, মৎস্যঘের, দোকানপাট ও বসতভিটা প্লাবিত হয়ে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন তিনি।
এদিকে বুধহাটা বাজার কমিটির সভাপতি নুরুজ্জামান জুলু জানান, বেতনা নদীর প্রবল ¯্রােতের তোড়ে বাজারসংলগ্ন পূর্ব-দক্ষিণ ও উত্তর-পশ্চিম পাশের ভেড়িবাঁধ ধ্বসে নদীতে পড়ছে। বেতনার তীব্র ভাঙনে ক্রমাম্বয়ে গ্রাস করে ফেলছে বুধহাটা বাজার। ফলে মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বাজারের অনেক ব্যবসায়ি। তাদের দোকান ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নদীগর্ভে চলে যাওয়ার উপক্রম হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড কর্তৃপক্ষ দ্রুত পদক্ষেন না দিলে ধীরে ধীরে বাজারের একটি বড় অংশ নদীগর্ভে চলে যেতে পারে।
তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, অপরিকল্পিত নদী খনন ও অব্যবস্থাপনার কারণেই পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছে। নদীর বাহাদুরপুর অংশে দীর্ঘদিন ধরে পলি জমে ভরাট হয়ে থাকলেও সেখানে খনন না করে ভাঙন কবলিত পাড়ের দিকেই খনন কাজ করা হয়েছে। যে কারনে স্রোতের গতিপথ সরাসরি বাজারের দিকে চলে এসেছে। ফলে বেতনার প্রবল স্রোতের টানে গত কয়েক দিনে বাজার সংলগ্ন এলাকায় প্রায় ২৫ থেকে ৩০ ফুট ভেড়িবাঁধ নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে।
এ ব্যাপারে আশাশুনি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শ্যামানন্দ কুন্ডু জানান, কয়েক দিন আগে বুধহাটা বাজারে বেতনার ভাঙন এলাকাটি পরিদর্শ করে এসেছেন। বিষয়টি খুবই জরুরি। তাৎক্ষণিক ভাবে পানি উন্নয়ন বোর্ডকে দ্রুত ব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে। তবে বৃষ্টির কারনে এখনো মেরামতের কাজ শুরু হয়নি। আগামী দুই একদিনের মধ্যে যাতে বাঁধের সংস্কার কাজ শুরু করা হয় সে জন্য পাউবো কর্তৃপক্ষকে বলা হয়েছে।
এদিকে শনিবার (১৮ জুলাই) সাতক্ষীরা-৩ আসনের সংসদ সদস্য হাফেজ মুহাদ্দিস রবিউল বাশার বেতনা নদীর ভেড়িবাঁধের ভাঙন এলাকা সরেজমিন পরিদর্শন করেন। নওয়াপাড়া পরিদর্শন শেষে তিনি বুধহাটা বাজারের খেয়াঘাট সংলগ্ন ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেন। সেখানে বাজারের একটি অংশ, বুড়োপীর সাহেবের দরগাহ এবং দ্বাদশ শিব ও কালী মন্দিরসংলগ্ন এলাকায় নদীভাঙন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।
এ সময় উপস্থিত জনতার উদ্দেশ্যে এমপি রবিউল বাশার বলেন, ভেড়িবাঁধের ভাঙনরোধে জরুরি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আগামী দুই থেকে তিন দিনের মধ্যেই বাঁধ রক্ষার কাজ শুরু হবে। মানুষের জানমাল রক্ষায় প্রয়োজনীয় সব ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে আশ্বাস দেন তিনি।
এদিকে সদর উপজেলার বিনেরপোতা জেলাপাড়া এলাকায় বেতনা নদীর ভেড়িবাঁধে প্রায় ১০০ ফুট এলাকা জুড়ে  ভাঙন দেখা দিয়েছে। শনিবার বিকেলে ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে নদীর পানি ভিতরে ঢোকা শুরু করলে গ্রামবাসী স্বেচ্ছাশ্রমে কাজ করে কোন রকমে পানি আটকাতে সমর্থ হয়।
বিনেরপোতা গ্রামের মাছ ব্যবসায়ি সঞ্জয় কুমার বিশ্বাস জানান, হঠাৎ করে বেতনা নদীতে পানি বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে জোয়ারের সময় নদীর স্রোতের টানে বিনেরপোতা জেলেপাড়া এলাকায় ভেড়িবাঁধে ভাঙন দেখা দেয়। ভাঙন পয়েন্ট দিয়ে নদীর পানি গ্রামে ঢোকা শুরু করলে স্থানীয়রা দ্রুত সেখানে কাজ করে পানি ঢোকা বন্ধ করে। কিন্তু একনো পর্যন্ত ভাঙন মেরামতে পানি উন্নয়ন বোর্ড কোন রকমে ব্যবস্থা নেয়নি। তিনি দ্রত বাঁধের ভাঙন পয়েন্ট মেরামতের দাবি জানান।  
সাতক্ষীরা পানি উন্নয়ন বোর্ড বিভাগ-২ এর নির্বাহী প্রকৌশলী আব্দুর রহমান তাযকিয়া জানান, বেতনা খননের পর নদীর নাব্যতা বেড়েছে। বিনেরপোতা, নওয়াপাড়া ও বুধহাটা বাজার এলাকায় ভাঙনের বিষয়টি তিনি অবগত আছেন। তবে টেকসই সংস্কার করতে হলে এ সংক্রান্ত একটি প্রকল্প নিতে হবে, যেটা সময় সাপেক্ষ। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দ্রুত প্রাথমিক সংস্কারের কাজ করা হবে। বিনেরপোতা এলাকায় পানি ঢোকা আপতত বন্ধ করা হয়েছে। সেখানে দ্রুত বাঁধের কাজ শুরু করা হবে।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ