খুলনা | মঙ্গলবার | ২১ জুলাই ২০২৬ | ৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

আর্জেন্টিনাকে হারিয়ে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন স্পেন

ক্রীড়া প্রতিবেদক |
০৪:০৬ এ.এম | ২০ জুলাই ২০২৬


ফাইনালের আগে নিউইয়র্ক যেন প্রায় দখলেই নিয়ে ফেলেছিল আর্জেন্টাইনরা। নিউজার্সি স্টেডিয়ামের গ্যালারিতেও যথারীতি তাঁদের দাপট। কিন্তু এ দাপটে কি আর চ্যাম্পিয়ন হওয়া যায়? আধিপত্য দেখাতে হয় মাঠে। সেটাই স্পেন দেখিয়েছে। ফাইনালে শুরু থেকেই নিউজার্সিতে প্রতিষ্ঠা লা রোহাদের রাজত্ব। পাসিং, প্রেসিং, বলের দখল, আক্রমণ—সবকিছুতেই যোজন যোজন এগিয়ে থেকেও গোলটা র আদায় করতে পারছিল না স্প্যানিশরা। কারণ, একজন এমিলিয়ানো ‘দিবু’ মার্তিনেস দেয়াল হয়ে দাঁড়িয়েছিলেন তাদের সামনে।

তবু স্পেন অবিরাম আক্রমণ চালিয়ে গেছে। মার্তিনেস দেয়াল ভেঙে ফেলার প্রথম প্রচেষ্টা ৯৭ মিনিটে। নিকো উইলিয়ামস বল জাল জড়িয়ে আনন্দ শুরুও করে দিয়েছিলেন। কিন্তু মিডফিল্ডার মিকেল মেরিনো আর্জেন্টিনা ডিফেন্ডার ওতামন্দিকে ফাউল করায় গোলটি আর হয়নি। অতিরিক্ত সময়ের বিরতি থেকে ফিরেই আরও একটি জোরাল আক্রমণে সেই উইলিয়ামসের হেডে বাড়িয়ে দেওয়া বলে ফেরান তোরেসের বুলেট গতির শট। মার্তিনেস-দেয়াল এবার ভেঙে চুরমার! যেন ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে অতিরিক্ত সময়ে করা আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার জয়সূচক গোলের স্মৃতিই ফিরে এল নিউজার্সির এই মিষ্টি বিকেলে। ১৬ বছর পর আবারও বিশ্বকাপের ট্রফি স্পেনের হাতে। আবারও ফুটবলে প্রতিষ্ঠা হলো স্প্যানিশ-রাজত্ব, যেটি বড্ড পাওনা হয়ে গিয়েছিল তাদের।

বল দখলে রেখে পাসিং নির্ভর ফুটবলে প্রতিপক্ষের বক্স বারবার হানা—স্পেনের এই কৌশল জেনে শুরু থেকেই আর্জেন্টিনা তাদের লো ব্লকে কৌশলে অনড় থেকেছিল। ৯০ মিনিটের শেষ দিকে ভালো একটা আক্রমণের সুযোগ পায় আর্জেন্টিনা। সেটি ঠেকিয়েই স্পেনের ফের প্রতি আক্রমণ। এরপরই আর্জেন্টিনার বড় ধাক্কা। স্পেনের ডিফেন্ডার পাউ কুবারসিকে ফাউল করে দুই হলুদ কার্ডের সম্মিলিত লাল কার্ড দেখে মাঠ ছাড়তে হয় আর্জেন্টিনার মিডফিল্ডার এনসো ফের্নান্দেস। ৯০ মিনিটের খেলার শেষ মুহূর্তে ১০জনের দলে পরিণত হয়ে যায় আর্জেন্টিনা। লিওনেল মেসি একটু চেষ্টা করেছিলেন রেফারিকে বোঝাতে, কাজ হয়নি।

১০ জনের দলে পরিণত হওয়ার পর আর্জেন্টিনা তখন আরও রক্ষণাত্মক। আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা সারটা সময় জোরালো কণ্ঠে নিজেদের দলকে উজ্জীবিত করার চেষ্টা করে গেলেন। কিন্তু কাজ হলো না । পরিপূর্ণ স্পেনের বিপক্ষে শুরু থেকেই সেই যে পিছিয়ে থাকল আর্জেন্টিনা, আর কাছাকাছিও যেতে পারেনি তারা।

ম্যাচের প্রথম মিনিট থেকেই স্পেন দারুণ আত্মবিশ্বাস আর পরিকল্পনা নিয়ে বলের দখল ধরে রেখে আধিপত্য বজায় রাখে। স্প্যানিশরা এতটাই প্রেসিং করছিল, তাদের গোলকিপার উনাই সিমনের অনেকটা সময় কেটেছে মধ্যমাঠে! ম্যাচের শুরুতেই লামিনে ইয়ামালের একটি ভালো সুযোগ তৈরি হয়েছিল, কিন্তু মার্তিনেস দারুণ সেভ করে গোল বাঁচান। এভাবেই তিনি ম্যাচের অধিকাংশ সময়ে দেয়াল হয়ে থাকলেন স্পেনের সামনে।

কিন্তু লিওনেল মেসি কোথায়? একেবারই নিষ্প্রভ হয়ে গিয়েছিলেন আর্জেন্টিনা অধিনায়ক। স্প্যানিশ কোচ লা ফুয়ান্তে ফাইনালের আগে মেসিকে আটকানোর কৌশল নিয়ে তাঁর এক মজার অভিজ্ঞতা শেয়ার করেছিলেন সংবাদ সম্মেলনে। কোন কৌশলে ওপেন প্লেতে মেসিকে বোতলবন্দী করে রাখতে হয়, সে তো দেখাই গেল। লা ফুয়েন্তের কৌশলে মেসির কাছে বল সরবরাহ একেবারেই বন্ধ ছিল। প্রথমার্ধে মেসি বলই স্পর্শ করেছেন মোটে ১৫বার। পরের অর্ধেও এ পরিসংখ্যান আর উজ্জ্বল হয়নি। দলের লো ব্লক কৌশলে মাঝমাঠে হেঁটে বেড়ানো তো মেসির জন্য নতুন কিছু নয়। রক্ষণ থেকে যে হঠাৎ আক্রমণে উঠে মেসি জাদুতে প্রতিপক্ষের জালে জড়ানো, সেটি ফাইনালে স্পেনের বিপক্ষে করতে পারেনি আর্জেন্টিনা।

দ্বিতীয়ার্ধের হাইড্রেশন ব্রেকের আগ থেকেই রীতিমতো আক্রমণের ঝড় তোলে স্পেন। মার্তিনেসের অসাধারণ সেভে বারবার আর্জেন্টিনার রক্ষা পেলেও জয়টা পাওনা হয়ে গিয়েছিল স্পেনেরই। তারা যে ফুটবল উপহার দিয়েছে ফাইনালে, এমনকি এ বিশ্বকাপজুড়ে—১৬ বছর পর শিরোপাটা বড্ড পাওনা হয়ে গিয়েছিল স্পেনের।

আর ২০২১ সাল থেকে টানা সাফল্যের একেকটা মুকুট মাথায় পড়া লিওনেল মেসির কাছে নিউজার্সির ‘মেটলাইফ স্টেডিয়াম’ বেদনার এক টুকরো জমিনই হয়ে রইল। ২০১৬ সালে এখানে যেমন কোপা আমেরিকার ফাইনাল হেরে জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিয়েও পরে ফিরে এসে অনেক কিছু পেয়েছেন। এবার বিশ্বকাপের ফাইনাল হেরে মেসি যেন আনুষ্ঠানিকভাবেই তাঁর শেষের গানটি গেয়ে ফেললেন!

প্রিন্ট

আরও সংবাদ