খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৩ জুলাই ২০২৬ | ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষায় অপবাদের ঊর্ধ্বে থাকা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
০১:৫৯ এ.এম | ২২ জুলাই ২০২৬


নেতৃত্ব ইসলামের দৃষ্টিতে সম্মানের নয়, বরং দায়িত্ব ও আমানতের নাম। একজন সাধারণ মানুষের তুলনায় একজন আমীর বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তির প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণ সমাজ গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে। তাই তাঁর দায়িত্ব শুধু সৎ হওয়া নয়; বরং এমন জীবনযাপন করা, যাতে তাঁর সম্পর্কে কোনো অমূলক সন্দেহ বা অপবাদের সুযোগ সৃষ্টি না হয়। কারণ একজন নেতার ব্যক্তিগত বিচ্যুতি শুধু তাঁর নিজের ক্ষতির কারণ হয় না; অনেক সময় তা মানুষের আস্থা, প্রতিষ্ঠানের মর্যাদা এবং দ্বীনের প্রতি শ্রদ্ধাবোধেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।
এই শিক্ষা আমরা পাই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের পবিত্র জীবন থেকে। একবার তিনি মসজিদে নববীতে ইতেকাফে ছিলেন। তাঁর সহধর্মিণী হযরত সাফিয়্যা রাযিয়াল্লাহু আনহা সাক্ষাৎ করতে এলে বিদায়ের সময় রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তাঁকে কিছুদূর এগিয়ে দেন। পথে দুইজন সাহাবী তাঁদের দেখে দ্রুত চলে যেতে চাইলে তিনি তাঁদের ডেকে বললেন, “ইনি আমার স্ত্রী সাফিয়্যা।” সাহাবীগণ বললেন, “ইয়া রাসূলুল্লাহ! আমরা কি আপনার সম্পর্কে এমন ধারণা করতে পারি?” তখন তিনি বললেন, “আমি জানি তোমরা তা করবে না; কিন্তু শয়তান মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।” (বুখারী, মুসলিম)
এ ঘটনা আমাদের শিক্ষা দেয়, সন্দেহ সৃষ্টি হওয়ার পর ব্যাখ্যা দেওয়ার চেয়ে সন্দেহের সুযোগই সৃষ্টি না করা অধিক উত্তম। একজন নেতার স্বচ্ছতা শুধু বাস্তবেই নয়, মানুষের দৃষ্টিতেও প্রতিভাত হওয়া প্রয়োজন।
এ কারণেই সাধারণ মানুষের সঙ্গে নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তির পার্থক্য রয়েছে। একজন সাধারণ ব্যক্তি ব্যক্তিগতভাবে সৎ থাকলেই অনেকাংশে দায়িত্ব পালন হয়। কিন্তু যিনি মানুষের অনুসরণীয়, তাঁর ক্ষেত্রে বিষয়টি ভিন্ন। তাঁকে এমনভাবে চলতে হবে, যাতে তাঁর আচরণ মানুষের আস্থা বৃদ্ধি করে, বিভ্রান্তি নয়।
ড. মুশফিক আহমদ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলতেন, যে মুফতি ফতোয়া দেন, যে মুহাদ্দিস হাদিস শিক্ষা দেন, যে পীর মানুষের আত্মশুদ্ধির দায়িত্ব পালন করেন, যে আমীর আনুগত্যের দাবিদার এবং যে ইমামের পেছনে মানুষ সালাত আদায় করেÑতাঁদের প্রত্যেকের জন্য সন্দেহের ঊর্ধ্বে থাকা অপরিহার্য। তাঁদের শুধু সৎ হলেই চলবে না; বরং তাঁদের সততা মানুষের কাছেও সুস্পষ্ট হতে হবে।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন, “তোহমতের স্থান থেকে নিজেদের রক্ষা করো।” (কাশফুল খাফা; আল-জামিউল কাবীর)
হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলতেন, “যে ব্যক্তি নিজেকে অপবাদের স্থানে নিয়ে যায়, মানুষ তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা করলে সে যেন তাদের দোষ না দেয়।” এই কথার মধ্যে গভীর প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। অনেক সময় মানুষের সন্দেহের জন্য সমাজের চেয়ে ব্যক্তির নিজের অসতর্কতাই বেশি দায়ী হয়।
ইতিহাসে হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর জবাবদিহিতার একটি ঘটনা অত্যন্ত প্রসিদ্ধ। একবার তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ থেকে সবার মতো একখন্ড কাপড় পেয়েছিলেন। কিন্তু তাঁকে একটি লম্বা জামা পরিহিত দেখে একজন সাহাবী প্রশ্ন করলেন, “সবার সমান কাপড় পাওয়ার পর আপনি এত বড় জামা কীভাবে বানালেন?” খলিফা হয়েও তিনি প্রশ্নকারীকে ভর্ৎসনা করেননি। বরং তাঁর পুত্র আবদুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুকে দাঁড় করিয়ে ব্যাখ্যা দিতে বললেন যে, তিনি নিজের অংশের কাপড় পিতাকে দিয়ে দিয়েছিলেন। তখন উপস্থিত সবাই সন্তুষ্ট হন। একজন শাসকের এই স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাই মানুষের আস্থা অটুট রাখে।
বাস্তব জীবনেও এ শিক্ষার প্রয়োজন রয়েছে। ধরা যাক, একজন প্রসিদ্ধ আলেম, দাঈ বা নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি এমন একটি রেস্তোরাঁয় বসে কোমল পানীয় পান করছেন, যেখানে মদও পরিবেশন করা হয়। তিনি নির্দোষ হলেও দৃশ্যটি মানুষের মনে বিভ্রান্তির জন্ম দিতে পারে। সমাজ নেতৃত্বের আসনে থাকা ব্যক্তিকে ভিন্ন চোখে দেখে। তাই তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ হওয়া উচিত প্রজ্ঞাপূর্ণ ও সুদূরপ্রসারী।
পবিত্র কোরআনে হযরত আয়শা রাযিয়াল্লাহু আনহার বিরুদ্ধে মুনাফিকদের অপবাদের ঘটনাও একই শিক্ষা দেয়। মহান আল্লাহ তা’য়ালা তাঁর পবিত্রতা প্রতিষ্ঠার জন্য স্বয়ং আয়াত নাজিল করেছেন। কারণ তিনি ছিলেন উম্মাহর মাতা এবং কিয়ামত পর্যন্ত মুসলিম নারীদের অন্যতম আদর্শ। তাঁর মর্যাদা ও গ্রহণযোগ্যতার ওপর যেন কোনো সন্দেহের ছায়া না পড়ে, সে জন্য মহান আল্লাহ তা’য়ালা নিজেই তাঁর নির্দোষিতা ঘোষণা করেছেন।
একই শিক্ষা পাওয়া যায় হযরত ইউসুফ আলাইহিস সালামের জীবন থেকেও। দীর্ঘ কারাবাসের পর যখন তাঁকে মুক্তি দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হলো, তখন তিনি সঙ্গে সঙ্গে কারাগার ত্যাগ করেননি। বরং প্রথমে তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সত্যতা উদ্ঘাটনের দাবি জানান। সত্য প্রকাশের পরই তিনি কারাগার থেকে বের হন। কারণ একজন নবীর চরিত্রে সামান্য সন্দেহও মানুষের হিদায়াতের পথে প্রতিবন্ধক হতে পারে।
আজকের যুগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কারণে একটি ছবি, একটি ভিডিও বা একটি অসম্পূর্ণ তথ্য মুহূর্তের মধ্যেই হাজারো মানুষের কাছে পৌঁছে যায়। তাই যারা নেতৃত্ব, দাওয়াত, শিক্ষা কিংবা জনকল্যাণমূলক দায়িত্ব পালন করেন, তাঁদের আরও বেশি সতর্ক থাকা প্রয়োজন। কারণ একজন নেতার চরিত্র তাঁর বক্তব্যের চেয়েও বেশি প্রভাব ফেলে।
অতএব, একজন প্রকৃত আমীর শুধু মহান আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সৎ থাকলেই দায়িত্ব শেষ হয় না; বরং মানুষের কাছেও নিজেকে সন্দেহ ও অপবাদের ঊর্ধ্বে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতে হয়। এ সতর্কতাই নেতৃত্বের মর্যাদা রক্ষা করে, মানুষের আস্থা সুদৃঢ় করে এবং সমাজকে বিভ্রান্তির হাত থেকে নিরাপদ রাখে। আল্লাহই সর্বজ্ঞ।
মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সবাইকে সততা, স্বচ্ছতা ও আমানতদারিতার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করার এবং অপবাদের সব পথ থেকে নিজেকে রক্ষা করার তাওফীক দান করুন। আমীন। 
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ১ মাস আগে

ইসলাম

প্রায় ১ মাস আগে