খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৩ জুলাই ২০২৬ | ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

গাজী নজরুলকে এমপি পদ ছাড়তে বললো জামায়াত, নইলে স্পিকার-ইসিতে চিঠি

নিজস্ব প্রতিবেদক, সাতক্ষীরা |
০১:৪৪ এ.এম | ২৩ জুলাই ২০২৬


এক নারীর সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া অন্তরঙ্গ মুহূর্তের এক ভিডিওকে কেন্দ্র করে সাংগঠনিক তদন্তে নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পাওয়ার পর সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য (এমপি) গাজী নজরুল ইসলামকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কার হয়েছেন।
অন্যদিকে দল থেকে বহিষ্কৃত গাজী মোঃ নজরুল ইসলামকে সংসদ সদস্য (এমপি) পদ ছাড়তে বলেছে জামায়াতে ইসলামী। সাতক্ষীরা-৪ আসনের এই এমপি নিজে থেকে পদত্যাগ না করলে তার এমপি পদ বাতিলে সংসদের স্পিকার এবং নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেবে দলটি। দলটির সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ এ তথ্য জানিয়েছেন।
তিনি বলেন, গাজী নজরুল এখন আর জামায়াতের কেউ নন। ফলে তিনি জামায়াতের এমপি নন। তাই এই বিষয়ে যেসব আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ রয়েছে সবই নেওয়া হবে।
ভিডিও প্রকাশের পর ব্যাপক সমালোচনার পর জামায়াত তদন্ত কমিটি গঠন করে। কমিটি গাজী নজরুলের  নৈতিক স্খলনের প্রমাণ পেলে বুধবার জামায়াত আমির শফিকুর রহমানের সভাপতিত্বে নির্বাহী পরিষদের বৈঠক হয়। বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী দলীয় গঠনতন্ত্রের ৬২ ধারা অনুযায়ী তাকে বহিষ্কার করা হয়। তার এমপি পদ বাতিলেও নির্বাচন কমিশনকে চিঠি দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়।
নির্বাহী পরিষদের একাধিক সদস্য বলেছেন, গাজী নজরুলকে পদত্যাগ করতে বলা হয়েছে। তবে তিনি এ নির্দেশনা বিষয়ে কিছুই জানাননি দলকে। আবার পদত্যাগ করবেন না, এমন কিছুও বলেননি।
জামায়াতের একজন সংসদ সদস্য বলেছেন, সংসদীয় দলের কেউ গাজী নজরুলের পক্ষে নেই। সবার চাওয়া ছিল, তাকে বহিষ্কার করা হোক। নইলে সংসদের অধিবেশনে জামায়াতকে বারবার বিব্রতকর পরিস্থিতিতে পড়তে হতো। গাজী নজরুল যদি নিজে থেকে পদত্যাগ না করে আইনি লড়াই চালিয়ে যান, তাতে হয়ত তিনি কয়েক মাস বা বছরখানেক এমপি পদে থাকবেন। তবে জামায়াতের এমপিদের সঙ্গে সংসদে বসতে পারবেন না।
এর আগে সোমবার রাতে গাজী নজরুলের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ভাইরাল হয়। ভিডিওতে থাকা ১৮ বছরের তরুণীকে তার দ্বিতীয় স্ত্রী দাবি করেন গাজী নজরুল। ওই তরুণী জানান, ১৭ জুন গাজী নজরুলের সঙ্গে তার বিয়ে হয়েছে। তরুণীর বাবা এবং গাজী নজরুলের প্রথম স্ত্রী একই কথা জানান।
যদিও বিয়ের কাজী বদরুল আলম মোঃ বাকী বিল্লাহ জানিয়েছেন, ১৭ জুন নয় বিয়ের নিবন্ধন হয়েছে ১৯ জুলাই। এতে বিতর্ক সমালোচনা আরও বাড়ে। যদিও বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী বিয়ে আগে করে, পরবর্তীতে তা নিবন্ধনে বাধা নেই। তবে ৩০ দিনের মধ্যে নিবন্ধন না করলে দুই বছর কারাদণ্ডের বিধান রয়েছে। এর মধ্যেই জামায়াত বহিষ্কার করল গাজী নজরুলকে।
বহিষ্কার : সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ‘ব্যক্তিগত মুহূর্তের’ ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার কারণে আলোচনায় আসা সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে বহিষ্কার করেছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। আজ বুধবার বিকেলে দলের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠকে নৈতিক স্খলনের দায়ে তাঁকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত হয়।
জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া বিভাগের সেক্রেটারি এহসানুল মাহবুব জুবায়ের গণমাধ্যমে বিবৃতি পাঠিয়ে দলের এই সিদ্ধান্তের কথা জানান।
বিবৃতিতে বলা হয়, আজ ২২ জুলাই (বুধবার) বিকেল চারটায় বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের জরুরি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে এ বৈঠক হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন দলের আমির শফিকুর রহমান। বৈঠকে কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
বিবৃতিতে উল্লেখ করা হয়, স¤প্রতি সাতক্ষীরা-৪ আসনের সংসদ সদস্য গাজী নজরুল ইসলামকে নিয়ে বিভিন্ন মিডিয়ায় প্রকাশিত সংবাদের বিষয়ে সাংগঠনিক তদন্ত হয়। তদন্তে গাজী নজরুল ইসলামের নৈতিক স্খলন প্রমাণিত হওয়ায় তাঁকে দলের গঠনতন্ত্রের ৬২ নম্বর ধারা অনুযায়ী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী থেকে বহিষ্কারের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয়। একই সঙ্গে তাঁকে দল থেকে বহিষ্কারের বিষয়টি বাংলাদেশ নির্বাচন কমিশনকে অবিলম্বে অবহিত করার সিদ্ধান্ত হয়।
তবে ইতোপূর্বে নজীর থাকার পরও জামায়াতের সদ্য বহিষ্কৃত নেতা গাজী নজরুল ইসলামের সংসদ সদস্য পদ বহাল থাকবে কিনা সেটা চলছে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা-বিতর্ক। সংবিধান অনুযায়ী এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিবেন নির্বাচন কমিশন। 
এমপি পদ নিয়ে সংবিধান কী বলছে? : সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার মোস্তফা শাকের উল্লাহ বলেন, ‘কোনো ভিডিও ভাইরাল হওয়া, নৈতিক বিতর্ক বা সামাজিক সমালোচনার কারণে সংসদ সদস্য পদ স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হওয়ার বিধান সংবিধানে নেই।’
তিনি বলেন, ‘সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী কোনো সংসদ সদস্য যে দলের মনোনয়নে নির্বাচিত হয়েছেন, সেই দল থেকে স্বেচ্ছায় পদত্যাগ করলে বা সংসদে দলীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে ভোট দিলে তার সদস্যপদ শূন্য হতে পারে। তবে দল থেকে বহিষ্কার করা হলে কেবল সেই কারণেই সংসদ সদস্য পদ বাতিল হয় না।’
আইনজীবী আরও বলেন, ‘যদি কোনো ফৌজদারি মামলায় দণ্ডিত হওয়ার ফলে সংবিধানের ৬৬ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী তিনি সংসদ সদস্য থাকার অযোগ্য হয়ে পড়েন, তখন সাংবিধানিক প্রক্রিয়ায় বিষয়টি নিষ্পত্তি হবে। সে ক্ষেত্রে রাষ্ট্রপতি নির্বাচন কমিশনের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত দেবেন।’
চিফ হুইপের বক্তব্য : বিষয়টি নিয়ে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নরুল ইসলাম মনি জানান, তিনি গণমাধ্যমের মাধ্যমে ঘটনাটি জেনেছেন। তার ভাষ্য, ‘অভিযোগের সত্যতা আদালতে প্রমাণিত হলে পরবর্তী আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘গাজী নজরুল যদি নিজে দল থেকে পদত্যাগ করেন, তাহলে তার আসন শূন্য হবে এবং সংবিধান অনুযায়ী ৯০ দিনের মধ্যে উপ-নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে।’
এর আগে, গাজী নজরুলকে ঘিরে একটি সিসিটিভি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনা শুরু হয়। গাজী নজরুল, তার প্রথম স্ত্রী এবং সংশ্লিষ্ট তরুণীর পরিবার দাবি করেছে, ওই তরুণীর সঙ্গে তার বৈধ বৈবাহিক সম্পর্ক রয়েছে। তবে বিষয়টি নিয়ে বিতর্ক অব্যাহত রয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ