খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৩ জুলাই ২০২৬ | ৭ শ্রাবণ ১৪৩৩

একনেকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন

মেগা প্রকল্পগুলোতে অস্বাভাবিক বিলম্ব, বারবার ব্যয় বৃদ্ধি ও জবাবদিহির অভাব নিয়ে কঠোর অবস্থানে সরকার

বিশেষ প্রতিবেদক |
০১:৪৬ এ.এম | ২৩ জুলাই ২০২৬


মেগা প্রকল্পগুলোতে অস্বাভাবিক বিলম্ব, বারবার ব্যয় বৃদ্ধি এবং জবাবদিহির অভাব নিয়ে অবশেষে কঠোর অবস্থান নিয়েছে সরকার। তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পর দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন কার্যক্রমে গতিশীলতা ও স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে চারটি প্রধান ক্ষেত্রে বড় ধরনের সংস্কার সম্পন্ন করার পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়। বুধবার সচিবালয়ে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি এসব বিষয়ে বিস্তারিত তুলে ধরেন। 
এর আগে প্রধানমন্ত্রী ও একনেক চেয়ারপারসন তারেক রহমানের সভাপতিত্বে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে প্রতিমন্ত্রী স্বীকার করেন যে, প্রশাসনিক জটিলতা, দুর্বল জবাবদিহি এবং বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মধ্যে সমন্বয়হীনতার কারণে দীর্ঘদিন ধরে মেগা প্রকল্পগুলোতে অস্বাভাবিক বিলম্ব ঘটেছে। তিনি জানান, প্রকল্প বাস্তবায়নের এসব জটিলতা নিরসনে গঠিত তদন্ত কমিটির প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার পরই প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দীর্ঘদিন ধরে ঝুলে থাকা খুলনার রূপসা এলাকার শিপইয়ার্ড সড়ক নির্মাণ প্রকল্পের তদন্ত প্রতিবেদন ইতোমধ্যেই মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটি জমা দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর চ‚ড়ান্ত দিকনির্দেশনা অনুযায়ী সেখানে পরবর্তী ব্যবস্থা নির্ধারিত হবে।
প্রকল্পের হঠাৎ ব্যয় বৃদ্ধি প্রসঙ্গে কথা বলতে গিয়ে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ের উদাহরণ টানেন প্রতিমন্ত্রী। তিনি জানান, ডলারের বিনিময় হার বৃদ্ধি, ভ্যাট-কর সমন্বয়, ইউটিলিটি লাইন স্থানান্তর এবং নতুন উপাদান যুক্ত হওয়ার কারণেই মূলত প্রকল্পটির বাজেট বাড়াতে হয়েছে। একইভাবে সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় কবরস্থান, শ্মশান ও ধর্মীয় উপাসনালয় সংস্কারে নতুন নতুন চাহিদা যুক্ত হওয়ায় সংশোধিত প্রস্তাবে অতিরিক্ত ৩৬৮ কোটি টাকা বাড়িয়ে মোট ব্যয় ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত করা হয়েছে।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গতি আনতে সরকার আগামী ১৮০ দিনের মধ্যে বড় চারটি সংস্কার কার্যক্রম শেষ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। প্রথমত, আগামী পাঁচ বছরের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনার জন্য একটি কৌশলগত (স্ট্র্যাটেজিক) ফ্রেমওয়ার্ক তৈরি করা হয়েছে যা শিগগিরই প্রকাশ করা হবে। দ্বিতীয়ত, প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি ও খরচের হিসাব তাৎক্ষণিকভাবে তদারকির জন্য একটি ‘রিয়েল-টাইম ডিজিটাল ড্যাশবোর্ড’ চালু করা হবে।
তৃতীয়ত, যোগ্য ব্যক্তি বাছাইয়ের লক্ষ্যে প্রকল্প পরিচালক (পিডি) নিয়োগের সুনির্দিষ্ট নীতিমালা, প্রশিক্ষণ ও প্রয়োজনীয় কোর্স মডিউল প্রস্তুতের কাজ শেষ করা হচ্ছে। চতুর্থত, নির্বাচনী অঙ্গীকারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে অপ্রয়োজনীয় পুনরাবৃত্তি এড়াতে সব চলমান ও প্রস্তাবিত প্রকল্প পুনর্মূল্যায়ন করে সংশোধিত বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (আরএডিপি) অন্তর্ভুক্ত করা হবে।
এছাড়া পুরো প্রক্রিয়ায় দক্ষতা আনতে পরিকল্পনা বিভাগ, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট অথরিটি, পরিসংখ্যান ও তথ্য ব্যবস্থাপনা বিভাগ, এনবিআর, আইসিটি বিভাগ এবং বাংলাদেশ ব্যাংকের ডিজিটাল সেবাগুলোকে একটি একক সমন্বিত প্ল্যাটফর্মে নিয়ে আসার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এই প্রযুক্তিগত সমন্বয় বাস্তবায়িত হলে প্রকল্প বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা নিশ্চিত হওয়ার পাশাপাশি সার্বিক গতি বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে।
একনেকে ১৪ হাজার ৪১ কোটি টাকার ৮ প্রকল্প অনুমোদন : জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় মোট ১৪ হাজার ৪১ কোটি ২১ লাখ টাকা ব্যয়ের ৮টি প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অনুমোদিত প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে তিনটি নতুন এবং পাঁচটি সংশোধিত প্রকল্প। এসব প্রকল্পে সরকারের নিজস্ব অর্থায়ন ১০ হাজার ৪৯৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা, বৈদেশিক ঋণ ৩ হাজার ৫৫০ কোটি ৪৪ লাখ টাকা এবং সংস্থার নিজস্ব অর্থায়ন ৩ কোটি ৫৪ লাখ টাকা। বুধবার বাংলাদেশ সচিবালয়ের মন্ত্রিসভা কক্ষে অনুষ্ঠিত ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম এবং বর্তমান সরকারের ষষ্ঠ একনেক সভায় এসব প্রকল্পের অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রীর তারেক রহমানের সভাপতিত্বে এ সভা অনুষ্ঠিত হয়।
অনুমোদিত নতুন প্রকল্পগুলোর মধ্যে রয়েছে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) বাস্তবায়নে বৃহত্তর দিনাজপুর (দিনাজপুর, ঠাকুরগাঁও ও পঞ্চগড়) জেলা সমন্বিত উন্নয়ন প্রকল্প। ১ হাজার ৪৯২ কোটি ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের এ প্রকল্পটি ২০২৬ সালের এপ্রিল থেকে ২০৩০ সালের জুন পর্যন্ত বাস্তবায়িত হবে। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের মাধ্যমে তিন জেলার গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, অর্থনৈতিক কর্মকান্ড সম্প্রসারণ এবং কর্মসংস্থান বৃদ্ধির লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
একই সঙ্গে ২ হাজার ৮২ কোটি ১২ লাখ টাকা ব্যয়ের পল্লী সড়ক রক্ষণাবেক্ষণ ও কর্মসংস্থান প্রকল্প অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। জুলাই ২০২৬ থেকে ডিসেম্বর ২০২৯ পর্যন্ত বাস্তবায়নাধীন এ প্রকল্পের আওতায় দেশের ৮ বিভাগের ৬৪ জেলার ৪৯৫টি উপজেলায় ৯১ হাজার ৫৬০ কিলোমিটার পল্লী সড়ক নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ করা হবে। পাশাপাশি পরিবার প্রধান ৪৫ হাজার ৭৮০ জন দুস্থ নারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের আওতায় বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম অনুসন্ধান ও উৎপাদন কোম্পানি (বাপেক্স) এবং পেট্রোবাংলার উদ্যোগে ৭২৯ কোটি ২২ লাখ টাকা ব্যয়ের ১টি মূল্যায়ন ক‚প (বেগমগঞ্জ-৫) এবং ২টি অনুসন্ধান ক‚প (বেগমগঞ্জ-৬ ও সুনেত্র-২) খনন প্রকল্পও অনুমোদন পেয়েছে। প্রকল্পটি সরকারি ও সংস্থার নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়িত হবে।
সভায় এলজিইডির সার্বজনীন সামাজিক অবকাঠামো উন্নয়ন-২ (জিএসআইডিপি-২) প্রকল্পের প্রথম সংশোধনী অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৩৬৮ কোটি টাকা বৃদ্ধি পেয়ে ১ হাজার ৪৫০ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে।
এছাড়া দুর্যোগ আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পের তৃতীয় সংশোধনী অনুমোদনের মাধ্যমে ব্যয় ১ হাজার ২৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে। সংশোধিত প্রকল্পের আওতায় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, সংস্কার ও উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়ন অব্যাহত থাকবে।
সবচেয়ে বড় সংশোধনী অনুমোদন পেয়েছে ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণ প্রকল্প। দ্বিতীয় সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৯ হাজার ৪৯২ কোটি ৬৪ লাখ টাকা বৃদ্ধি পেয়ে মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ২৭ হাজার ৪৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। সংশোধিত প্রকল্পে সরকারি অর্থায়ন ১৩ হাজার ৮০৩ কোটি ১৬ লাখ টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ১৩ হাজার ২৪২ কোটি ৫২ লাখ টাকা।
একনেক সভায় বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থা উন্নয়ন প্রকল্প, সিলেট বিভাগ-এর তৃতীয় সংশোধনীও অনুমোদিত হয়েছে। এ সংশোধনের ফলে প্রকল্পটির ব্যয় ১১৭ কোটি ৪১ লাখ টাকা কমে এসেছে।
একই সঙ্গে স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের আওতায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল সমূহে বিদ্যমান কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার ৫০ শয্যায় উন্নীতকরণ এবং জেলা সদর হাসপাতাল সমূহে ১০ শয্যার কিডনি ডায়ালাইসিস সেন্টার স্থাপন প্রকল্পের দ্বিতীয় সংশোধনীও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। সংশোধনের মাধ্যমে প্রকল্পটির ব্যয় ৮১ কোটি ৩১ লাখ টাকা বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এবারের একনেক সভায় উপস্থাপিত প্রকল্পগুলোর মাধ্যমে গ্রামীণ যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণ, বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি অনুসন্ধান এবং বড় অবকাঠামো প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। একনেকের অনুমোদন মিললে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও সংস্থাগুলো নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী প্রকল্পগুলোর বাস্তবায়ন শুরু করবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ