খুলনা | শুক্রবার | ২৪ জুলাই ২০২৬ | ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

জলবায়ুর মরণফাঁদে উপকূল: কঙ্কালসার সুন্দরবন

শেখ জাহিদুল ইসলাম |
০৩:৪৪ পি.এম | ২৩ জুলাই ২০২৬


দেশের দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলজুড়ে নিঃশব্দে ছড়িয়ে পড়ছে এক ভয়াবহ পরিবেশগত বিপর্যয়। সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের বিস্তীর্ণ এলাকায় একসময়কার সবুজ বনভূমি আজ পরিণত হচ্ছে মৃত গাছের কঙ্কালে। মাইলের পর মাইলজুড়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাতাহীন ও প্রাণহীন গাছের সারিকে পরিবেশবিজ্ঞানীরা বলছেন ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ বা ‘প্রেতাত্মা বন’। তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে সৃষ্ট দীর্ঘস্থায়ী লবণাক্ততা ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির ফলে উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্র এক নীরব মৃত্যুর দিকে ধাবিত হচ্ছে।

সম্প্রতি খুলনা বিশ্ববিদ্যালয় এবং যুক্তরাষ্ট্রের ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের যৌথ গবেষণায় উঠে এসেছে এ উদ্বেগজনক চিত্র। আন্তর্জাতিক পরিবেশবিষয়ক জার্নাল Estuarine, Coastal and Shelf Science-এ প্রকাশিত গবেষণায় বলা হয়েছে, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধির কারণে উপকূলে দীর্ঘস্থায়ী লোনা জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। এর ফলে মাটির লবণাক্ততা গত দুই দশকে ৩৫ থেকে ৪০ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, লবণাক্ত পানি গাছের জাইলেম টিস্যুকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। ফলে গাছ মাটি থেকে প্রয়োজনীয় পানি ও পুষ্টি গ্রহণ করতে পারছে না। বাইরে থেকে গাছ সবুজ দেখালেও ভেতরে ধীরে ধীরে মৃত্যুর প্রক্রিয়া শুরু হচ্ছে। একপর্যায়ে পাতা ঝরে পড়ে, কাণ্ড শুকিয়ে যায় এবং গাছ কঙ্কালসার রূপ ধারণ করে।

গবেষকরা গত ২০ বছরের স্যাটেলাইট তথ্য, থার্মাল ইমেজিং, রিমোট সেন্সিং ডাটা এবং সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটের মাঠপর্যায়ের নমুনা বিশ্লেষণ করে এ তথ্য পেয়েছেন। গবেষণা এলাকার মধ্যে ছিল সাতক্ষীরার শ্যামনগর, আশাশুনি, বুড়িগোয়ালিনী, গাবুরা ও পদ্মপুকুর এবং বাগেরহাটের শরণখোলা ও মোংলা অঞ্চল।

গবেষণা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, সাতক্ষীরা জেলার উপকূলবর্তী প্রায় ২২ শতাংশ সামাজিক বনায়ন এবং প্রাকৃতিকভাবে গড়ে ওঠা বনভূমি ইতোমধ্যে মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়েছে। বাগেরহাটের শরণখোলা এলাকায় এ হার প্রায় ১৪ শতাংশ। একই সঙ্গে সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী ১৬ থেকে ১৮ শতাংশ বাফার জোন ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ সিনড্রোমে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

গবেষণা দলের প্রধান খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশ বিজ্ঞান ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. তানভীর আহমেদ বলেন, অতিরিক্ত লবণাক্ততার কারণে গাছের জাইলেম টিস্যুর ভেতরে লবণের স্ফটিক জমে পানি পরিবহনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। ফলে গাছ দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই ধীরে ধীরে শুকিয়ে মারা যাচ্ছে।

ওকলাহোমা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. ডেভিড এস. মিলার বলেন, স্যাটেলাইট তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যাচ্ছে যে সুন্দরবনের সীমান্তবর্তী এলাকাগুলো দ্রুত ঝুঁকির মধ্যে পড়ছে। জলবায়ু পরিবর্তনের বর্তমান ধারা অব্যাহত থাকলে এ সংকট আরও বিস্তৃত হবে।

গবেষণায় আরও বলা হয়েছে, বন উজাড়ের ফলে উপকূলীয় এলাকায় তাপমাত্রা ও আর্দ্র তাপপ্রবাহ বৃদ্ধি পাচ্ছে। মৃত গাছের শিকড় দুর্বল হয়ে যাওয়ায় মাটির বন্ধন শক্তি কমে যাচ্ছে, ফলে নদীভাঙন ও বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে। একই সঙ্গে কৃষিজমিতে লবণের আস্তরণ পড়ে উৎপাদনশীলতা কমে যাচ্ছে।

পরিবেশ বিশেষজ্ঞ ও ব্র্যাক বিশ্ববিদ্যালয়ের ইমেরিটাস অধ্যাপক ড. আইনুন নিশাত বলেন, ‘ঘোস্ট ফরেস্ট’ জলবায়ু পরিবর্তনের একটি দৃশ্যমান ট্র্যাজেডি। উপকূলে মিষ্টি পানির প্রবাহ নিশ্চিত করা না গেলে আগামী কয়েক দশকে সুন্দরবনের বড় একটি অংশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়তে পারে।

রিভার্সাইন আবহাওয়াবিদ ড. মুহাম্মদ আব্দুল কালাম মল্লিকের মতে, উপকূলে আর্দ্র তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা ক্রমাগত বাড়ছে। লবণাক্ততা ও তাপপ্রবাহের যুগপৎ আঘাত শুধু মানুষের জন্য নয়, সুন্দরবনের মতো গুরুত্বপূর্ণ বাস্তুতন্ত্রের জন্যও বড় হুমকি।

গবেষক ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা পরিস্থিতি মোকাবিলায় লবণাক্ততা সহিষ্ণু গাছের বনায়ন, নদী খননের মাধ্যমে মিষ্টি পানির প্রবাহ বৃদ্ধি, বিশেষ ‘ইকো-সিস্টেম রেস্টোরেশন ফান্ড’ গঠন এবং উপকূলীয় সামাজিক বনায়ন নীতির আধুনিকায়নের সুপারিশ করেছেন।

তাদের সতর্কবার্তা, এখনই কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হলে ‘প্রেতাত্মা বন’-এর বিস্তার একসময় বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবনের অস্তিত্বকেও হুমকির মুখে ফেলতে পারে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ