খুলনা | শুক্রবার | ২৪ জুলাই ২০২৬ | ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

সুন্দরবনে বেড়েই চলেছে চোরা শিকারীদের দৌরাত্ম্য

খুলনা রেঞ্জে ১ বছরে ২৯৪ মামলায় গ্রেফতার ৩৯৬ জন

কয়রা প্রতিনিধি |
১১:৫৩ পি.এম | ২৩ জুলাই ২০২৬


সুন্দরবনে চোরা শিকারীদের দৌরাত্ম্য দিন দিন বেড়েই চলেছে। চলমান অভিযানে বন অপরাধীরা ধরা পড়লেও থামছেনা তাদের দৌরাত্ম্য। নানামুখী সংকট আর দস্যুদের চাপে হিমশিম খাচ্ছে বন বিভাগ। তারপরও বিশ্বের ঐতিহ্য এই সম্পদ রক্ষায় বনরক্ষীদের নজরদারি ও প্রতিনিয়ত অভিযানের ফলে সাফল্য পেয়েছে পশ্চিম বিভাগ খুলনা রেঞ্জ। এই রেঞ্জের অধিনস্থ বনে অপরাধের মাত্রা আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে হ্রাস পেয়েছে। জনবল সংকট, উন্নত জলযানের অভাব, আধুনিক সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত শিকার করেই তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে এ বনের অতন্ত্র প্রহরীরা।
গত ১ বছরে পশ্চিম সুন্দরবনের খুলনা রেঞ্জে বিভিন্ন সাঁড়াশি অভিযানে ২৯৪ টি মামলায় ৩৯৬ জন বন অপরাধীকে গ্রেফতার করা হয়েছে। এ সময় উদ্ধার করা হয়েছে ৫৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ, ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ মৎস্য ও কাঁকড়া আহরণের সরঞ্জাম। একই সঙ্গে বন্যপ্রাণি শিকার বন্ধ করতে এর সাথে জড়িত ১৩৫ জনের একটি বিশেষ তালিকা তৈরি করে তাদেরকে নজরদারিকে রাখা হয়েছে। এতে করে বন অপরাধ বিগত দিনের তুলনায় অনেক কমে আসছে।
বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ২০২৫-২০২৬ অর্থ বছরের মধ্যে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও বন্যপ্রাণী রক্ষায় বনরক্ষীরা বনের গহীনে পায়ে হেঁটে ও জলপথে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করে বন বিভাগ। এই ১ বছরে বন অপরাধের দায়ে খুলনা রেঞ্জে মোট ২৯৪ টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এসব মামলায় মোট ৩৯৬ জনকে হাতেনাতে গ্রেফতার করে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হয়েছে। এছাড়া পলাতক আসামি রয়েছে ৬৩ জন। এর মধ্যে অভয়ারণ্যে মাছ ও কাঁকড়া ধরার অপরাধে মামলা দায়ের করা হয়েছে ১০৬ টি। বিষ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩ টি। মামলার তথ্য অনুযায়ী পিওআর ৮৪ টি, সিআর, ৪ টি, ইউডিআর ২০৬ টি। ঐ সূত্রে আরও জানা গেছে, খুলনা রেঞ্জের অধিনস্থ বনের বিভিন্ন দুর্গম এলাকা থেকে গত ১ বছরে জব্দকৃত সামগ্রীর তালিকায় রয়েছে ২২ টি ট্রলার, ৩৪৯ টি নৌকা, ৬ হাজার ৯৮৬টি অবৈধ কাঁকড়া ধরার ( আটন) ফাঁদ, ৯৮৩৩ মিটার দৌনদড়ি, ২৬১২ কেজি মাছ এবং ১ হাজার ৯৮১ কেজি অবৈধভাবে আহরিত কাঁকড়া। 
এছাড়া সুন্দরবনের নদী ও খালে বিষ প্রয়োগ করে মাছ শিকারি চক্রের বিরুদ্ধেও কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এ সময় দস্যু ও অসাধু চক্রের কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে ৮৭ বোতল মাছ ধরার অবৈধ কীটনাশক, জব্দ করা হয়েছে ২০৩ কেজি মধু। হরিণ সংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৩৩ টি। অভিযানে জব্দ করা হয় ৪৮৭ কেজি হরিণের মাংস ও ৫ হাজার ৭১২ মিটার হরিণ ধরার ফাঁদ। 
কয়রার কপোতাক্ষ কলেজের সাবেক অধ্যাপক আ ব ম আঃ মালেক বলেন, জনসচেতনতামূলক কার্যক্রমে সুন্দরবনের অপরাধ কিছুটা হলেও কমানো সম্ভব। বন বিভাগের একাধিক স্টেশন ও টহল ফাঁড়িতে কর্মরত বন কর্মীরা জানান খুলনা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা যোগদানের পর হতে হরিন ও বন্যপ্রাণি শিকারসহ বিষ প্রয়োগে মাছ শিকার প্রতিরোধে স্টেশন ও টহল ফাঁড়ির স্টাফদের কঠোর নির্দেশনা প্রদান করেন। তারই ধারাবাহিকতায় বিভিন্ন অভিযানে আটক করা হয়েছে অবৈধ জাল, নৌকা, আটনসহ এসকল বন অপরাধীদের। 
সুন্দরবন খুলনা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক ও রেঞ্জ কর্মকর্তা মোঃ শরিফুল ইসলাম বলেন, স্মার্ট টহল টিম ও বিশেষ টহল টিম মোতায়ন, ফুট প্রেট্রোলিং করে অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন, অপরাধ উদঘাটন করতে গিয়ে জেলেদের আগ্রাসী আচরণ লক্ষ্য করা যাচ্ছে যা বন অপরাধ দমনে নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। সুন্দরবনের হরিণ শিকার ও বিষ দিয়ে মাছ শিকার বন্ধ করতে প্রয়োজন সামাজিক আন্দোলন। জনবল সংকট ও আধুনিক জলযানের অভাবে বিশাল এই সম্পদ পাহারা দিতে এবং অপরাধ নিয়ন্ত্রণ করতে বনকর্মীদের হিমশিম খেতে হচ্ছে। সেই সাথে বন নির্ভর জনগোষ্ঠীর বিকল্প কর্মসংস্থান না থাকায় বনের উপর চাপ কমছে না। ফলে বন বিভাগের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিন রাত টহল কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।
পশ্চিম বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) এজেডএম হাছানুর রহমান বলেন বনরক্ষীরা চরম ঝুঁকি ও কষ্ট মাথায় নিয়ে দুর্গম বনে পায়ে হেঁটে, নদীতে নৌযান চালিয়ে নিয়মিত টহল দেওয়ায় বন অপরাধ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ফুট পেট্রোলিং, আধুনিক প্রযুক্তি ড্রোন উড়িয়ে অপরাধি শনাক্ত, সচেতনতামূলক কার্যক্রমে বন অপরাধে সফলতা এসেছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ