খুলনা | শুক্রবার | ২৪ জুলাই ২০২৬ | ৮ শ্রাবণ ১৪৩৩

মামলা দায়ের, অভিযুক্ত কর্মচারী ও তার স্ত্রী গ্রেফতার

খুবির ছাত্রী হলের ওয়াশ রুমে মোবাইলে ভিডিও ধারণ, ক্যান্টিন কর্মীকে গণধোলাই

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৫৩ এ.এম | ২৪ জুলাই ২০২৬


খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) বিজয় ’২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশ রুমে গোপনে মোবাইল ফোন রাখার অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত এক কর্মচারীকে আটক করে শিক্ষার্থীরা। রাত ৯টা ৪৫ মিনিটে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় হল জুড়ে চাঞ্চল্য ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়। শিক্ষার্থীদের গণধোলাইয়ে হলের ক্যান্টিন কর্মী ইমাম হাসান (২৪) অসুস্থ হয়ে পড়লে পুলিশে সোর্পদ করে শিক্ষার্থীরা। পরে তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।  গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে পরীক্ষা-ক্লাস বর্জন করে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা লাগিয়ে সকল একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তবে শিক্ষার্থীদের দাবির সাথে সহমত পোষণ করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ^াস দেন বিশ^বিদ্যালয় প্রশাসন।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, ওয়াশ রুমে একটি সন্দেহজনক মোবাইল ফোন দেখতে পেয়ে তারা বিষয়টি খতিয়ে দেখেন। পরে ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকার অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসান নামে এক ব্যক্তিকে আটক করেন তারা।  শিক্ষার্থীদের ভাষ্য, তিনি প্রায় দুই বছর ধরে বিজয়’২৪ হলের ক্যান্টিনে কর্মরত রয়েছেন।
প্রত্যক্ষদর্শী কয়েকজন শিক্ষার্থী জানান, ভিডিও ধারনের খবর ছড়িয়ে পড়লে হলের বিভিন্ন বলকের শিক্ষার্থীরা সেখানে জড়ো হন। পরে অভিযুক্তকে হলের ভেতরে আটকে রেখে বিষয়টি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। ঘটনার পর থেকে আবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ বিরাজ করে। প্রশাসনিক ভবনের মূল ফটকে তালাবদ্ধ এবং দুপুরে হাদী চত্বরে জড়ো বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী বলেন, নারী আবাসিক হলের মতো একটি সংরক্ষিত স্থানে এ ধরনের ঘটনা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য উদঘাটন এবং অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ আইনগত ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান তারা।
শিক্ষার্থীরা আরও দাবি করেন, নারী আবাসিক হলে বহিরাগত ও বিভিন্ন সেবাদানকারী কর্মীদের প্রবেশে কার্যকর নজরদারি নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে হলের নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ বৃদ্ধি এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিজয় ’২৪ হলের প্রভোস্ট প্রফেসর ড. সেলিনা আহমেদ বলেন, এ ঘটনায় তদন্ত চলছে। তদন্ত শেষ হওয়ার আগে আমি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে চাই না। তদন্ত শেষে প্রয়োজনীয় তথ্য জানানো হবে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ হারুনর রশীদ খান বলেছেন, বিজয় ’২৪ হলের ঘটনাটি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে হল প্রশাসনকে এ বিষয়ে আরও কঠোর হওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। 
তিনি বলেন, আশ্চর্যজনক বিষয় হলো একজন বহিরাগত কীভাবে মেয়েদের হলের বাথ রুমে প্রবেশ করতে পারল। বিষয়টি গভীরভাবে তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন এবং নারী শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক পরিচালক (ডিএসএ) দপ্তর ও হল প্রশাসনের প্রতি দ্রুত তদন্ত সম্পন্ন করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আহŸান জানান।
খুলনা বিশ^বিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম বলেন, ‘শিক্ষার্থীদের সকল দাবির সাথে সহমত পোষণ করছি। দোষীর বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
হরিণটানা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোঃ হেলাল উদ্দিন বলেন, অভিযুক্ত ইমাম হাসান শিক্ষার্থীদের মারধরের শিকার হওয়ায় তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের প্রিজন সেলে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। তার স্ত্রীকে পুলিশ হেফাজতে রাখা হয়েছে।
তিনি বলেন, শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন যে ইমাম হাসানের স্ত্রীও এ ঘটনার সঙ্গে জড়িত। এছাড়া তিনি ইমাম হাসানকে ছাড়িয়ে নেওয়ার সময় শিক্ষার্থীদের সঙ্গে মারমুখী আচরণ করেন এবং ভিডিও ছড়িয়ে দেওয়ার ভয় দেখান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রবিষয়ক সহকারী পরিচালক মো. হাসান মাসুদ বলেন, বুধবার রাতের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন অভিযুক্তকে বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন হরিণটানা থানায় হস্তান্তর করেছে। শিক্ষার্থীরা আজ ক্লাস বর্জন করে বিভিন্ন হল ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছেন। আমরা এখন বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসেছি।
তিনি আরও বলেন, এখনো পর্যন্ত এ ঘটনায় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো মামলা করা হয়নি। শিক্ষার্থীদের দাবি, অভিযুক্তকে দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে বিচার করতে হবে।
উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে একাধিকবার সভা : উদ্ভ‚ত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের উদ্যোগে বৃহস্পতিবার সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একাধিকবার সভা অনুষ্ঠিত হয়। সকালে এবং দুপুরে অনুষ্ঠিত সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোঃ নূরুন্নবী। বিকেলে ঢাকা থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পৌঁছে একাধিকবার বৈঠকে বসেন উপাচার্য প্রফেসর ড. মোঃ রেজাউল করিম। সভাগুলোতে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্কুলসমূহের স্কুলের ডিন, রেজিস্ট্রার, ডিসিপ্লিন প্রধান, আবাসিক হলগুলোর প্রভোস্ট, ছাত্র বিষয়ক পরিচালক ও অন্যান্য বিভাগের পরিচালকবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
এসব সভায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় বৃহস্পতিবারের সকল পরীক্ষা স্থগিত রাখা হয়। সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী-অভিযুক্ত ক্যান্টিনকর্মী মোঃ ইমাম হাসান ও তার স্ত্রী রুপা মণির বিরুদ্ধে হরিণটানা থানায় মামলা দায়ের করা হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে রেজিস্ট্রার (ভারপ্রাপ্ত) প্রফেসর ড. এস এম মাহবুবুর রহমান বাদী হয়ে এ মামলা দায়ের করেন (নং-৩৩২৩ (৬)/১)। বিকেলে মামলা দায়েরের পর অভিযুক্তকে আদালতে প্রেরণ করা হলে আদালত তাকে কারাগারের প্রেরণের নির্দেশ দেন। 
এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের জন্য হল প্রশাসন ৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেন। এ কমিটিকে আগামী তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে বলা হয়েছে। এছাড়া অভিযুক্ত কর্তৃক পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল এবং হলের অভ্যন্তরে কর্মচারীদের মোবাইল নিয়ে প্রবেশ নিষিদ্ধ করা হয়। এছাড়া অপরাজিতা ও বিজয় ’২৪ ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়ন এবং এই দুই ছাত্রী হলের ক্যান্টিনে কোনো পুরুষ কর্মী কাজ করতে পারবেন না মর্মে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়।
সভায় শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে বাংলা ডিসিপ্লিনের প্রফেসর ড. মোঃ রুবেল আনছারের যৌন হয়রানির ঘটনায় রিভিউ আবেদন প্রাপ্তি সাপেক্ষে পুনরায় তদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের সাময়িক বহিস্কৃত শিক্ষক প্রফেসর মোঃ রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কর্তৃক গঠিত উচ্চ পর্যায়ের কমিটি এবং যৌন নিপীড়ন প্রতিরোধ কেন্দ্রের তদন্ত কমিটির দু’টি তদন্ত চলমান রয়েছে বলে জানানো হয়। সভায় দুই কমিটির সাথে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিবর্গ তদন্ত কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত করেন। কমিটি দু’টি আগামী ৭ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিবেন মর্মে নিশ্চয়তা প্রদান করেন। 
এছাড়াও সভায় উপস্থিত ডিসিপ্লিন প্রধানবৃন্দ এবং ছাত্র বিষয়ক পরিচালকের দপ্তর চলতি টার্মে রেজিস্ট্রশনের সময় বৃদ্ধির ব্যাপারে আলোচনা করেন। যার প্রেক্ষিতে আগামী ৪ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানা ছাড়া রেজিস্ট্রেশনের মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়। এছাড়া আগামী ৫ আগস্ট থেকে ১১ আগস্ট পর্যন্ত জরিমানাসহ রেজিস্ট্রেশন কার্যক্রম চলমান থাকবে বলেও উল্লেখ করা হয়।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ