খুলনা | শনিবার | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র গৃহীত, ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিন

বিশেষ প্রতিবেদক |
০১:২৩ এ.এম | ২৫ জুলাই ২০২৬


গুরুতর শারীরিক অসুস্থতার কথা জানিয়ে নিজের পদত্যাগপত্র জমা দেন দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী, তাঁর পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ (বীর বিক্রম) ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। শুক্রবার বিকেলে জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের শপথকক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্পিকার এ তথ্য জানান।
স্পিকার বলেন, ‘গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের সংবিধানের ৫০ অনুচ্ছেদের ৩ দফা অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিন শুক্রবার বিকেল ৫টা ১ মিনিটে তাঁর স্বাক্ষরযুক্ত পদত্যাগপত্র স্পিকারের কাছে দাখিল করেন। পদত্যাগপত্র গ্রহণের পর সংবিধানের ৫৪ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আমি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেছি। একই সঙ্গে পদত্যাগপত্রটি জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের রেকর্ডে সংরক্ষণ এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
স্পিকার জানান, রাষ্ট্রপতি তাঁর পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেছেন যে তিনি গুরুতর অসুস্থ। তিনি হৃদ্রোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও কিডনির জটিলতায় ভুগছেন। তাঁর হৃৎযন্ত্রে বাইপাস সার্জারি হয়েছে এবং স¤প্রতি স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অটোনমিক নিউরোপ্যাথি রোগ শনাক্ত হয়েছে। এ রোগের কারণে তিনি মাঝে মধ্যে অচেতন হয়ে পড়েন। এসব শারীরিক জটিলতা ও মানসিক অসামর্থ্যরে কারণে রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করা তাঁর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না এবং দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার প্রয়োজন হওয়ায় তিনি পদত্যাগ করেছেন।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই প্রয়োজন হলে ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নেওয়া থাকে। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার স্পিকারের দায়িত্ব পালন করবেন।
স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, রাষ্ট্রপতির পদত্যাগের বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা চলছিল। এখন স্পষ্ট হয়েছে যে তিনি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্যগত কারণেই পদত্যাগ করেছেন। তিনি সাবেক রাষ্ট্রপতির সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন।
সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্পিকার বলেন, একজন রাষ্ট্রপতি অসুস্থ হতে পারেন এবং তিনি লিখিতভাবে তাঁর অসুস্থতার কারণ উল্লেখ করেছেন। এ ক্ষেত্রে অতিরিক্ত কোনো চিকিৎসা সনদের প্রয়োজন নেই। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই পদত্যাগের মধ্য দিয়ে এ বিষয়ে সব ধরনের ধোঁয়াশা, বিভ্রান্তি ও অনিশ্চয়তার অবসান হবে।
হাফিজ উদ্দিন আহমদ আরও বলেন, রাষ্ট্রপতির পদ কখনো শূন্য থাকে না। সংবিধানের বিধান অনুযায়ী তিনি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছেন এবং রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন শুরু করেছেন।
জনগণের সরকারের প্রতি তাঁর সমর্থন ছিল : সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দায়িত্ব নেওয়া হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেছেন, ‘আমার মনে হয়, তিনি (মোঃ সাহাবুদ্দিন) মাফিয়া সরকারের আমলে নির্বাচিত হলেও বর্তমানে জনগণের ভোটে যে সরকার নির্বাচিত হয়েছে, তার প্রতি তিনি সমর্থন এবং শ্রদ্ধা প্রকাশ করেছেন সব সময়। আমি তাঁর মঙ্গল কামনা করি।’
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগপত্র গ্রহণ করে তা জাতীয় সংসদ সচিবালয়ের নথিতে সংরক্ষণ ও প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক কার্যক্রম গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান স্পিকার।
এ প্রসঙ্গে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, সংবিধান অনুযায়ী স্পিকার হিসেবে শপথ গ্রহণের সময়ই তিনি প্রয়োজনে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালনের শপথও নিয়েছিলেন। একইভাবে স্পিকারের পদ শূন্য হলে ডেপুটি স্পিকার দায়িত্ব পালন করবেন বলেও সাংবিধানিক বিধান রয়েছে।
খুব সংক্ষেপেই আয়োজিত সংবাদ সম্মেলন শেষ স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। সাংবাদিকদের অনেক প্রশ্ন থাকলেও তিনি মাত্র দু’টি প্রশ্নের উত্তর দিয়ে কর্মসূচির ইতি টানেন।
রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ নিয়ে নানা ধরনের গুজবের বিষয়ের এক প্রশ্নে স্পিকার বলেন, ‘আজ বাংলাদেশের নানা ধরনের কথাবার্তা আমি দুপুরে এসেই শুনছি। দেখা গেল যে, এটি প্রকৃত তিনি শারীরিক অসমর্থের কারণে পরিত্যাগ করেছেন। আমি তাঁর মঙ্গল ও সুস্বাস্থ্য কামনা করি।’
এই প্রশ্নের উত্তরেই মোঃ সাহাবুদ্দিনকে নিয়ে নিজের সংক্ষিপ্ত মূল্যায়ন তুলে ধরেন হাফিজ উদ্দিন। গত ১২ মার্চ সাহাবুদ্দিনের কাছ থেকেই স্পিকার হিসেবে শপথ নিয়েছিলেন তিনি।
আরেক প্রশ্নের উত্তরে হাফিজ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতির পদত্যাগ একটি গুরুতর ঘটনা। এর সঙ্গে দেশের ভালো-মন্দও জড়িত। রাষ্ট্রপতি একজন মানুষ, তিনি অসুস্থ হতেই পারেন এবং তিনি রোগেরও নাম প্রকাশ করেছেন। লিখিতভাবে জানিয়েছেন, তিনি কী কী রোগে ভুগছেন এবং মাঝে মধ্যে তিনি অচেতন হয়ে পড়েন। এ জন্য ডাক্তারের সার্টিফিকেটের কোনো প্রয়োজন নেই। যিনি যেখানে নিজেই এটি দাবি করেছেন।’
হাফিজ উদ্দিন বলেন, ‘আমরা আশা করি, এই পদত্যাগের ফলে সব ধোঁয়াশা পরিষ্কার হলো। কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা বা কোনো ধরনের বিরূপ মনোভাব কিংবা কনফিউশন যাতে এসব ব্যাপারে না ঘটে ...আগেও রাষ্ট্রপতিরা পদত্যাগ করেছেন বিভিন্ন কারণে। রাষ্ট্রপতি দেশের একজন সম্মানিত মাননীয় রাষ্ট্রপতি, তিনি পদত্যাগ করতেই পারেন এবং এই চেয়ার কখনো শূন্য থাকে না এবং আমি জাতীয় সংসদের স্পিকার হিসেবে এই পদত্যাগপত্র গ্রহণ করেছি। এটি হলো বাস্তবতা। আশা করি, সব ধরনের কনফিউশন এখন থেকে দূর হয়ে যাবে
জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ মোঃ নুরুল ইসলাম ও ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামাল এবং সংসদ সচিবালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এ সময় উপস্থিত ছিলেন।
এর আগে বিকেল ৪টার দিকে মোঃ সাহাবুদ্দিনের পদত্যাগপত্র নিয়ে জাতীয় সংসদে যান বঙ্গভবনে কয়েকজন কর্মকর্তা। তারা স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদের কাছে পদত্যাগপত্র পৌঁছে দেন। 
আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকাকালে তাদের মনোনীত প্রার্থী হয়ে ২০২৩ সালের ২৪ এপ্রিল বিনা প্রতিদ্ব›িদ্বতায় রাষ্ট্রপতি হয়েছিলেন মোঃ সাহাবুদ্দিন। একই দিনে দেশের ২২তম রাষ্ট্রপতি হিসেবে শপথ নেন মোঃ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু। মেয়াদের আরও প্রায় এক বছর নয় মাস বাকি থাকতেই তিনি পদত্যাগ করলেন। আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠভাজন হিসেবে পরিচিত সাবেক জেলা ও দায়রা জজ সাহাবুদ্দিন চুপ্পু ২০১১ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত সময়ে দুর্নীতি দমন কমিশনের কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। 
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানে শেখ হাসিনা সরকারের পতন ঘটলে রাষ্ট্রপতি মোঃ সাহাবুদ্দিনকে অপসারণের দাবি জানায় বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনসহ বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দল। তাকে ‘ফ্যাসিস্টের দোসর’ হিসেবে আখ্যা দিয়ে তখন বঙ্গভবন ঘেরাও কর্মসূচিও পালিত হয়। তবে বিএনপি বরাবরই রাষ্ট্রপতিকে সরানোর পক্ষে ছিল না। ফলে শেষ পর্যন্ত টিকে যান মোঃ সাহাবুদ্দিন।
উল্লেখ্য, সংবিধানের ১২৩ (২) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, মৃত্যু, পদত্যাগ বা অপসারণজনিত কারণে রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হলে পরর্বুী ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন অনুষ্ঠান করতে হবে। এছাড়া সংবিধানের ৪৮ (১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সদস্যদের ভোটে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ