খুলনা | শনিবার | ২৫ জুলাই ২০২৬ | ৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

২৬ দিন পর অনশন ভাঙলেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক

মোদিকে নতুন চ্যালেঞ্জ ভারতের ‘ককরোচ পার্টির’

খবর প্রতিবেদন |
০১:৩৩ এ.এম | ২৫ জুলাই ২০২৬


ভারতের ‘ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি)’ নেতারা বলেছেন, সরকারের কাছ থেকে সুবিধা আদায়ে সক্ষম হওয়ার পর এ ব্যাপক বিক্ষোভের অন্যতম নেতা শুক্রবার অনশন ভেঙেছেন। তবে তেলাপোকা পার্টির সমর্থকরা এ আন্দোলন থেকে সরে যাবে না। খবর দ্য ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের। ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) শীর্ষ নেতা অভিজিৎ দীপকে বলেন, ‘আমরা পিছু হটব না।’
ককরোচ জনতা পার্টির ব্যানারে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অসঙ্গতি এবং কর্মসংস্থানের অভাবকে কেন্দ্র করে ভারতের সড়কে বিক্ষোভ করছে হাজারো তরুণ তরুণী। শিক্ষার্থীদের এ আন্দোলন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সরকারের জন্য বিগত বছরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে।
আন্দোলনের অন্যতম নেতা ৫৯ বছর বয়সী সোনম ওয়াংচুক ২৬ দিন ধরে অনশন করায় তার ২০ পাউন্ড ওজন কমেছে। ভারতের রাজধানীতে একটি প্রতিবাদ মিছিলের নেতৃত্ব দেওয়ার কথা ছিল তার। এর কয়েক দিন আগে পুলিশ তাকে জোর করে হাসপাতালে নিয়ে যায়।
পুলিশ ওই মিছিল আয়োজনে নিষেধাজ্ঞা দিলেও তা অমান্য করে হাজার হাজার মানুষ তাতে অংশগ্রহণ করে। এসময় পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ হয়। পুলিশ বিক্ষোভকারীদের ওপর লাঠিচার্জ ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। আন্দোলনের নেতারা জানিয়েছেন, বেশ কয়েকজন বিক্ষোভকারী আহত হয়েছেন। অন্যদিকে পুলিশ জানিয়েছে, প্রায় ১২০ জন পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্য আহত হয়েছেন।
ওয়াংচুক সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, হাসপাতালে সরকারি কর্মকর্তারা তার সঙ্গে দেখা করেছেন। সংঘর্ষের ঘটনায় বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে পুলিশের কাছে অভিযোগ করা হবে না, কর্মকর্তারা এমন প্রতিশ্র“তি দেওয়ার পর তিনি অনশন ভেঙেছেন।
ওয়াংচুকের পোস্ট করা একটি ভিডিওতে দেখা যায়, হাসপাতালে তার বেডের পাশে সরকারি কর্মকর্তারা সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে আছেন। এ সময় ভারতের স্বাস্থ্যমন্ত্রী এ বছর মেডিকেল কলেজে ভর্তি পরীক্ষায় অসঙ্গতির জেরে আত্মহত্যা করা শিক্ষার্থীদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। এ ছাড়া পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের বিষয়ে সংসদে ‘বিস্তারিত আলোচনা’ করা হবে বলেও জানান তিনি।
ভারতে ভালো বেতনের বেসরকারি চাকরির স্বল্পতার মধ্যে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষাই লাখ লাখ শিক্ষার্থীর জন্য সরকারি কলেজে আসন ও চাকরি পাওয়ার উপায়। কিন্তু প্রশ্ন ফাঁসের অভিযোগের কারণে অনেক পরীক্ষা বাতিল করা হয়। কিছু পরিবার আগেভাগেই পরীক্ষার প্রশ্নপত্র পাওয়ার জন্য প্রচুর অর্থ খরচ করে, যা প্রতারক চক্রগুলোর একটি লাভজনক ব্যবসা।
এ বছর মে মাসে ২০ লাখ শিক্ষার্থী স্নাতক পর্যায়ের মেডিকেল ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিল, কিন্তু প্রশ্নপত্র ফাঁসের কারণে জুনে তাদের আবার পরীক্ষা দিতে হয়েছে। পরীক্ষায় অনিয়ম নিয়ে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ ভারতজুড়ে মানুষের মনে সাড়া ফেলেছে।
বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি এ বিষয়ে মুখ খুলেছেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় তিনি পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের ঘটনার বিচার করতে দ্রুত বিচার আদালত স্থাপনের প্রতিশ্র“তি দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ভারতের তরুণদের কল্যাণ তার কাছে অগ্রাধিকার।
আরেকটি ভিডিও বার্তায় নরেন্দ্র মোদি বলেন, বন্ধুরা, আমি জানি যে প্রশ্নপত্র ফাঁস কোনো সামান্য বিষয় নয়; এটি লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের জন্য অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
নয়াদিল্লি-ভিত্তিক নীতি বিষয়ক সংস্থা পলিসি মঙ্কসের ভাস্কর পান্ত বলেন, সরকার শুরুতে বিক্ষোভকারী নেতাদের সঙ্গে কথা বলতে জ্যেষ্ঠ মন্ত্রীদের পাঠায়নি। এতে এখন তারা উভয় সংকটে পড়েছে। কারণ বিক্ষোভকারী নেতারা ভারতের শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের দাবিতে অনড় রয়েছেন।
ভাস্কর পান্ত আরও বলেন, কোনো মন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি মেনে নেওয়া দুর্বলতার লক্ষণ, আর তা প্রত্যাখ্যান করা অবজ্ঞার লক্ষণ। এই সিদ্ধান্ত নিতে যত দেরি করা হবে, দাবির চাপ ততই মন্ত্রীর কাছ থেকে তার ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার দিকে সরে যাবে।
সা¤প্রতিক দিনগুলোতে পুলিশের ব্যারিকেডের ওপর আঁকা গ্রাফিতিতে প্রধানমন্ত্রী মোদির পদত্যাগের আহŸান জানানো হয়েছে। এ সপ্তাহে প্রতিদিন জড়ো হওয়া বিক্ষোভকারীদের অনেকেই ভারতীয় এ নেতাকে উপহাস করা প্ল্যাকার্ড নিয়ে আসেন। নয়াদিল্লি ছাড়াও বেঙ্গালুরু ও মুম্বাইয়ের মতো অন্যান্য বড় শহরগুলোতেও বিক্ষোভ হয়েছে।
আন্দোলনের সমর্থকদের পাঠানো খাবারের অর্ডার বিতরণকারী ডেলিভারি রাইডার প্রশান্ত মালিক বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পুলিশের লাঠিচার্জের ছবিগুলো বিক্ষোভকারীদের প্রতি জনগণের সমর্থন আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
প্রশান্ত বলেন, ‘এরা বাচ্চা, সন্ত্রাসী নয়। তারা নিজেদের অধিকারের জন্য লড়ছে।
অনশন ভেঙেছেন অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক : ককরোচ জনতা পার্টির (সিজেপি) দাবির সমর্থনে দিল্লির যন্তর মন্তরে চলমান ছাত্র আন্দোলনকে তীব্র করেছিলেন লাদাখের অধিকারকর্মী সোনম ওয়াংচুক। বৃহস্পতিবার গভীর রাতে গুরগাঁওয়ের মেদান্ত হাসপাতালে ২৬ দিনের টানা অনশন ভেঙেছেন তিনি।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে (সাবেক টুইটার) দেওয়া এক পোস্টে সোনম ওয়াংচুক বলেন, ‘কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিং এবং লেহ লাদাখ অ্যাপেক্স বডির শীর্ষ নেতাদের উপস্থিতিতে অবশেষে আমি অনশন ভেঙেছি। এর আগে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ৬৫ জন সংসদ সদস্য ব্যক্তিগতভাবে এসে কিংবা চিঠির মাধ্যমে আমাকে অনশন ভাঙার অনুরোধ জানান। মূলত বিভিন্ন শর্ত নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা এবং দেশে সম্ভাব্য সহিংসতার কথা বিবেচনা করেই এ সিদ্ধান্ত।’
শর্তগুলোর বিস্তারিত শিগগিরই একটি আলাদা ভিডিওর মাধ্যমে প্রকাশ করার কথা সোনমের। সেই সঙ্গে কোথাও যেন কোনো ধরনের সহিংসতা না ছড়ায়, সে বিষয়ে সবাইকে অত্যন্ত সতর্ক থাকার আহŸান জানান এই অধিকারকর্মী।
এদিকে সোনম ওয়াংচুক অনশন ভাঙার পরপরই এক্সে একটি পোস্ট করেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। পোস্টে তিনি বলেন, ‘আমি সোনমজিকে চিকিৎসকদের পরামর্শ মেনে চলার এবং দ্রুত আগের ওজন ফিরে পাওয়ার অনুরোধ জানাচ্ছি। সোনমজির সুস্থতার জন্য ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি।’
আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা সিজেপির : সোনম ওয়াংচুকের ওই সিদ্ধান্তের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন সিজেপির (ককরোচ জনতা পার্টি) প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দিপকে। এক্সে দেওয়া এক পোস্টে তিনি বলেন, ‘২৬ দিন পর সোনম স্যার অনশন ভাঙায় আমরা স্বস্তি পেয়েছি এবং তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞ। স্যারের এ অসাধারণ সাহস ও আত্মত্যাগের জন্য ধন্যবাদ। নিজের জীবন বাজি রেখে তিনি পুরো জাতির বিবেককে জাগিয়ে তুলেছেন। এ দেশের জন্য তাঁর জীবন অনেক বেশি মূল্যবান।’
তবে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধান পদত্যাগ না করা পর্যন্ত যন্তর মন্তরে ককরোচ জনতা পার্টির শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে বলে জানান দিপকে।
এর আগে দিনের শুরুতে দেওয়া অন্য এক পোস্টে আন্দোলনকারীদের শান্ত থাকার আহŸান জানিয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুক। কিছু অপশক্তি বা সমাজবিরোধী চক্র সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা করছে, এমন খবরে দুঃখ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘শান্তি এবং শুধু শান্তিই আমার পথ। যন্তর মন্তরের প্রতিবাদ কর্মসূচি শান্তিপূর্ণ থাকলেও আমি অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে জানতে পেরেছি যে অন্য কোথাও কিছু সমাজবিরোধী চক্র এ শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের সুযোগ নিয়ে সহিংসতা ছড়ানোর চেষ্টা করছে।’
পরিস্থিতি যা-ই হোক না কেন, আন্দোলনকারীদের অহিংস থাকার ওপর জোর দিয়ে এই অধিকারকর্মী বলেন, ‘প্রতিপক্ষ যা-ই করুক না কেন, আমাদের প্রতিক্রিয়া হতে হবে শুধুই ফুল। যেকোনো মূল্যে দয়া করে এ ঐতিহ্য বজায় রাখবেন।’
আগের দিন কেন্দ্রীয় মন্ত্রী জে পি নাড্ডা ও জিতেন্দ্র সিংয়ের উদ্দেশ্যে একটি চিঠি দিয়েছিলেন সোনম ওয়াংচুক। গত মঙ্গলবার রাতে মেদান্ত হাসপাতালে এই দুই মন্ত্রী তাঁর সঙ্গে দেখা করেন।
চিঠিতে শিক্ষামন্ত্রী ধর্মেন্দ্র প্রধানের পদত্যাগের দাবিতে সরাসরি চাপ না দিয়ে ওয়াংচুক উল্লেখ করেন, মন্ত্রীরা তাঁকে দু’টি বিষয়ে আশ্বাস দিয়েছেন। প্রথমত, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র ফাঁসের জেরে যেসব শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছেন, তাঁদের পরিবারকে ‘উপযুক্ত ক্ষতিপূরণ’ দেওয়ার বিষয় বিবেচনা করবে সরকার। দ্বিতীয়ত, শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগের বিষয় বিবেচনা করাসহ সামগ্রিক জবাবদিহি নিশ্চিত করতে লোকসভায় একটি ‘অর্থপূর্ণ আলোচনা’র আয়োজন করা হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ