খুলনা | রবিবার | ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩

পেয়েছেন নানা অনিয়মের প্রমাণ, ঢাকায় ফিরে ব্যবস্থা গ্রহণ # হাসপাতালের পাশে ক্লিনিক পরিচালনায় স্বাস্থ্য কর্মকর্তাকে তিরস্কার # উপকূলের স্বাস্থ্য সেবায় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়নের আশ্বাস

মোরেলগঞ্জ ও শরখোলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ ৩ হাসপাতালে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর ঝটিকা সফর

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট ও শরণখোলা প্রতিনিধি |
০১:৪১ এ.এম | ২৬ জুলাই ২০২৬


বাগেরহাটের মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সসহ জেলার ৩টি হাসপাতাল আকস্মিক পরিদর্শন করেছেন স্বাস্থ্য মন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। সড়ক পথে গতকাল শনিবার বেলা ১১টার দিকে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী মোরেলগঞ্জ হাসপাতালে প্রবেশ করেন। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক গোলাম মোঃ বাতেন, পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার, মোরেলগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ হাবিবুল্লাহসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা এ সময় মন্ত্রীর সাথে ছিলেন। 
হাসপাতালে প্রবেশ করেই মন্ত্রী মূল ভবনের বিভিন্ন ওয়ার্ডে যান। রোগী ও তাদের স্বজনদের সাথে কথা বলেন। ধৈর্য্য ধরে নানা সংকটের কথা শোনের মন্ত্রী। পরে হাসপাতালের স্টক রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করেন। হাসপাতালে ক্রয় করা রিয়াজেন্ট খুঁজতে বিভিন্ন কক্ষে প্রবেশ করেন। হাসপাতালের একটি পরিত্যক্ত ভবনের কক্ষ খুলে চক্ষু চড়কগাছ হয় মন্ত্রী ও সরকারি আমলাদের। পরিত্যক্ত ওই ভবনের বিভিন্ন কক্ষ ভর্তি সরকারি ওষুধ, স্যালাইন, সুই সিরিঞ্জ ও অন্যান্য চিকিৎসা সামগ্রী। এমনকি সৌচাগারেও ছিল স্যালাইন ও ওষুধের স্তূপ।
এসব বিষয়ে মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামাল হোসেন মুফতি কোন সদুত্বর দিতে পারেননি। পরে হাসপাতালে থাকা বায়োমেট্রিক হাজিরা রেজিস্ট্রার পর্যালোচনা করেন তিনি। সময় ঠিকমত তাদের না আসার বিষয়টি দেখতে পান। কয়েকজন চিকিৎসকের আসা-যাওয়ার সময়ে অমিল থাকার কারণ জানতে চান। 
অভিযোগ থাকায় তিনি হাসপাতাল চত্বরে থাকা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার (টিএইচও) বাসায় যান। হাসপাতালে সংকট তৈরি করে পাশে নিজস্ব ক্লিনিক খুলে সেবা দেওয়া প্রমাণ পান। সেই ক্লিনিকও পরিদর্শন করেন মন্ত্রী। সেখানে কোন চিকিৎসকে পাননি তিনি। এসব নিয়ে মন্ত্রী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ কামাল হোসেন মুফতিকে ভৎসনা করেন।
তিনি চিকিৎসকরা যথাসময়ে হাসপাতালে আসছেন কি না তা দেখতে বায়মেট্রিক হাজিরা শিট যাচাই করেন। ওই হাসপাতালে থাকতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রী ফোন করেন বাগেরহাটের সিভিল সার্জন ডাঃ মাহবুবুল আলমকে। স্বাস্থ্যমন্ত্রীকে তিনি বলেন আমি ছুটিতে আছি। তখন মন্ত্রী জানতে চান আপনি কার কাছ থেকে ছুটি নিয়েছেন। সিভিল সার্জন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের কাছ থেকে মৌখিকভাবে ছুটি নেওয়ার কথা বলেন। পরে স্বাস্থমন্ত্রী ফোন করেন খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ শেখ মোঃ মোশাররফ হোসেনকে। এ সময় সিভিল সার্জনের ছুটির বিষয়টি তিনি জানে না বলে জানান। পরে মন্ত্রী তাকে মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কেন্দ্র পরিদর্শন করে এই অব্যবস্থাপনার দায় কার তা নির্ণয় করতে বলেন।
পরে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন বলেন, হাসপাতালে থাকা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চিকিৎসা সেবা নিতে আসা দরিদ্র, মেহনতি মানুষ সেবা পাক। এই সেবার উদ্দেশ্যে ৫০ শয্যার হাসপাতালকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করতে খুব শিগগির দরপত্র আহŸান করা হবে। কিছু রিপোর্ট পেয়েছি, যেখানে যেখানে রিপোর্ট পাই সেখানে যাচ্ছি। ধরেন এতোবড় বাংলাদেশে চার মাসে সব হাসপাতাল পরিদর্শন করা সম্ভব না। যেখানে রিপোর্ট পাই সেখানে দৌড়ে যাই। আজ এখানে আসছি, আপনারও ছিলেন। এখানে সব দেখলাম। নোট করে নিয়ে গেলাম।  বিভিন্ন ত্র“টি-বিচ্যুতি আছে। আমি ঢাকায় ফিরি। আমারও তো উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ আছে, তাদের সাথে আলাপ করে জনস্বার্থে যা করণীয় তা আমরা করব। সামনে হাসপাতালের চিকিৎসা সেবায় পরিবর্তন আসবে বলেও বলেন মন্ত্রী।
পরে তিনি বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন। মন্ত্রী হাসপাতালে প্রবেশ করেই প্রথমেই সরাসরি চলে যান রান্নাঘর পরিদর্শনে। সেখানে গিয়ে রোগীদের জন্য প্রস্তুত করা খাবারের মান ও পরিবেশ পর্যবেক্ষণ করেন। পরে হাসপাতালের বিভিন্ন ওয়ার্ড ঘুরে ভর্তি রোগীদের সঙ্গে কথা বলেন এবং চিকিৎসার খোঁজখবর নেন। এ সময় রোগীরা পর্যাপ্ত স্বাস্থ্যসেবা না পাওয়ার অভিযোগ করেন মন্ত্রীর কাছে। তবে খাবারের মান, পরিবেশ ও রোগীদের অভিযোগ শুনে অসন্তোষ প্রকাশ করেন তিনি। রোগীদের সাথে দুর্ব্যবহারের কারণে একজন সিনিয়র নার্সকে ভর্ৎসনা করেন। ভবিষ্যতে ভালো ব্যবহারের পরামর্শ দেন। বাজে ব্যবহারের শিকার ওই রোগীকে নিজের মুঠোফোন নাম্বার লিখে দেন এবং পুনরায় এ ধরনের ব্যবহার করলে মন্ত্রীকে ফোন দিয়ে জানাতে বলেন। শরণখোলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সেও একই ভাবে বিভিন্ন ওয়ার্ড ও কক্ষ পরিদর্শন করেন। সার্বিকভাবে এই হাসাপাতালের কাযক্রম দেখে সন্তোষ প্রকাশ করেন।  স্বল্প সময়ের মধ্যে শরণখোলা ও মোরেলগঞ্জে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক পদায়নের আশ্বাস দেন।
মন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্যখাতে বিদ্যমান সংকট নতুন নয়, এটি বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলের। আমরা মাত্র পাঁচ মাস হলো সরকার গঠন করেছি। এতো অল্প সময়ের ১৭ বছরের জমে থাকা সমস্যা সমাধান করা অসম্ভব। তবে ইতিমধ্যে আমরা জনবল বৃদ্ধি ও অবকাঠামো উন্নয়নের মাধ্যমে উপজেলা পর্যায়ের স্বাস্থ্যসেবাকে আরো কার্যকর ও মানসম্মত করার ব্যাপারে উদ্যোগ নিয়েছি। এসময় শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্থিতা হাওলাদার, উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ প্রিয় গোপাল বিশ্বাস, উপজেলা বিএনপি’র সভাপতি মোঃ আনোয়ার হোসেন পঞ্চায়েতসহ প্রমাসনের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা ও স্থানীয় রাজনৈতিক দলের নেতারা উপস্থিত ছিলেন। 
সেখান থেকে মন্ত্রী সড়ক পথে সরাসরি বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালে আসেন। জেলার প্রধান এই চিকিৎসালয়েও তিনি একইভাবে সব ওয়ার্ড, রান্নাঘর, সৌচাগার ও গুদাম ঘর পরিদর্শন করেন। হাসপাতালে চিকিৎসক, কর্মচারী  সংকট পূরণের দ্রুত চিকিৎসক পদায়নের আশ্বাস দেন মন্ত্রী। হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় বাগেরহাট ২৫০ শয্যা হাসপাতালের তত্ত¡াবধায়ক ডাঃ অসীম কুমার সমাদ্দারসহ চিকিৎসক ও কর্মচারীরা উপস্থিত ছিলেন।
এদিকে অবহেলিত হাসপাতালগুলোতে স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এমন ঝটিকা সফরে সন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয়রা। পাশাপাশি মোরেলগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কামাল হোসেন মুফতির দুর্নীতি ও তার প্রতি ক্ষোভ প্রকাশ করেন স্থানীয়রা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ