খুলনা | রবিবার | ২৬ জুলাই ২০২৬ | ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক কার্যক্রম সচল হচ্ছে আজ

যৌন অপরাধীদের বিচারে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি শিক্ষকরা একাত্মতা প্রকাশ

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০১:৪২ এ.এম | ২৬ জুলাই ২০২৬


যৌন অপরাধীদের বিচারের বিষয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি একাত্মতা প্রকাশ করেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরা। শনিবার সকল ডিসিপ্লিনের প্রধানগণ স্ব স্ব ডিসিপ্লিনের শিক্ষার্থীদের সাথে মতবিনিময় করেন। বিকেল সাড়ে ৪টায় উপাচার্য প্রফেসর ড. রেজাউল করিমের সভাপতিত্বে জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবির প্রতি শিক্ষকদের একাত্মতার বিষয়টি আলোচনা করা হয়।
গত ২২ জুলাই রাতে বিজয়’২৪ হলে সংঘটিত অনাকাক্সিক্ষত ঘটনার প্রেক্ষিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটসহ সকল ভবনে তালা দিয়ে একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ করে দেয় শিক্ষার্থীরা। উদ্ভুত পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের তিনটি দাবির আলোকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
সভায় উপস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. রেজাউল করিম, উপ-উপাচার্য প্রফেসর ড. হারুন-উর রশীদ খান, ট্রেজারার প্রফেসর ড. মোঃ নূরুন্নবী, ডিন, ডিসিপ্লিন প্রধান, ছাত্র বিষয়ক পরিচালক, প্রভোস্ট ও দায়িত্বপ্রাপ্ত পরিচালকবৃন্দ শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি সংহতি প্রকাশ করেন। 
সভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২২ ব্যাচের শিক্ষার্থী প্রতিনিধিদের সার্বিক বিষয়াবলি ও সংহতি প্রকাশের বিষয়ে অবহিত করেন উপস্থিত সকলের প্রতিনিধি হিসেবে বিজ্ঞান, প্রকৌশল ও প্রযুক্তিবিদ্যা স্কুলের ডিন প্রফেসর ড. মোঃ আশরাফুল আলম এবং ফরেস্ট্রি এন্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের প্রধান প্রফেসর ড. মোঃ নবীউল ইসলাম খান। যার প্রেক্ষিতে শিক্ষার্থীরা সুষ্ঠু তদন্ত ও দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার স্বার্থে বিশ্ববিদ্যালয়ের মেইন গেটসহ সকল ভবনের তালা খুলে দেওয়ার ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
সভায় বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক পরিবেশ স্বাভাবিক করতে শিক্ষার্থীদের ক্লাসে ফিরে আসার আহŸান জানানো হয় এবং ইতোপূর্বে শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে গৃহীত ব্যবস্থাবলি প্রতিশ্র“ত সময়ের মধ্যে সম্পন্ন করার ব্যাপারে দৃঢ় প্রত্যয় ব্যক্ত করা হয়।
এর আগে খুবি শিক্ষক ও হলের ক্যান্টিনের এক কর্মচারীর বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং ছাত্রীদের গোপনে ভিডিয়ো ধারণের অভিযোগের সুষ্ঠু বিচার দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম অনির্দিষ্টকালের জন্য বন্ধ ঘোষণা করেন শিক্ষার্থীরা। একই সঙ্গে তারা বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন।
বৃহস্পতিবার রাতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠক শেষে সাধারণ শিক্ষার্থীরা তিন দাবি উত্থাপন করেন। তাদের দাবি, এসব দাবি বাস্তবায়ন না হওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ থাকবে।
শিক্ষার্থীদের তিন দাবির মধ্যে রয়েছে, হলের ছাত্রীদের গোপনে ভিডিয়ো ধারণের অভিযোগে অভিযুক্ত ক্যান্টিন কর্মচারী ইমাম হাসানের সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা এবং ঘটনার আগে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে ব্যর্থতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট হল প্রভোস্ট বডিকে জবাবদিহির আওতায় আনা।
যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্ত বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মোঃ রুবেল আনছার ও এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মোঃ রেজাউল ইসলামকে দ্রুত স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করা। এছাড়া স¤প্রতি গঠিত ‘স্পন্দন ২৪’ ক্লাবের নিবন্ধন বাতিল করা।
শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, প্রশাসনের সঙ্গে বৈঠকে দাবিগুলো নিয়ে আলোচনা হলেও সন্তোষজনক কোনো অগ্রগতি হয়নি। প্রশাসন আইনি জটিলতার কথা উলে­খ করে সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে সময়ক্ষেপণ করেছে বলেও অভিযোগ করেন তারা। এ অবস্থায় দাবি বাস্তবায়নে দৃশ্যমান পদক্ষেপ না নেওয়া পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের সব একাডেমিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম বন্ধ রাখার ঘোষণা দেওয়া হয়।
এর আগে গত ২৩ জুলাই সকালে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রধান ফটক ও প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে বিক্ষোভ করেন। পরে হাদি চত্বরে অবস্থান নিয়ে যৌন হয়রানির অভিযোগে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত শেষ করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানান তারা।
এদিকে উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন একাধিকবার বৈঠক করেছে। এসব বৈঠকে হল প্রশাসনের পক্ষ থেকে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করে তিন কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। একই সঙ্গে অভিযুক্ত ইমাম হাসানের পরিচালিত হল ক্যান্টিনের বরাদ্দ বাতিল, আবাসিক হলে কর্মচারীদের মোবাইল ফোন বহন নিষিদ্ধ এবং দুই ছাত্রী হলে কোনো পুরুষ কর্মী নিয়োগ না দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। ছাত্রী হলের ক্যান্টিন পরিচালনায় কঠোর নীতিমালা প্রণয়নের সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়।
এছাড়া শিক্ষার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মোঃ রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগে রিভিউ আবেদন পাওয়া গেলে পুনঃতদন্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের ট্রেজারার অধ্যাপক ড. মোঃ নুরুন্নবী জানান, ছাত্রীদের গোপনে ভিডিয়ো ধারনের অভিযোগে অভিযুক্ত ইমাম হাসানকে পুলিশ হেফাজতে নেওয়ার পর আদালতে হাজির করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, তার বিরুদ্ধে পর্নোগ্রাফি নিয়ন্ত্রণ আইন, ২০১২-এর বিভিন্ন ধারায় মামলা হয়েছে এবং এসব ধারায় জামিনের সুযোগ নেই।
এর আগে বুধবার খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় ২৪ হলের ছাত্রীদের ওয়াশরুমে গোপনে মোবাইল ফোন রেখে ভিডিয়ো ধারণের অভিযোগে হলের ক্যান্টিনে কর্মরত ইমাম হাসানকে আটক করেন ছাত্রীরা। এ ঘটনায় আবাসিক ছাত্রীদের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ ও ক্ষোভ দেখা দেয়।
এর আগে গত ১৮ জুন এগ্রোটেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মোঃ রেজাউল ইসলামের বিরুদ্ধে এক ছাত্রীকে মেসেঞ্জারে অশালীন বার্তা পাঠানো ও কুপ্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের পর তাকে ডিসিপ্লিন প্রধানের পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের যৌন হয়রানি ও নিপীড়ন নিরোধ কেন্দ্রের গঠিত সাত সদস্যের তদন্ত কমিটি অভিযোগটি তদন্ত করছে।
এছাড়া গত বছরের আগস্টে বাংলা ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মোঃ রুবেল আনছারের বিরুদ্ধে এক ছাত্রী অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি ও অনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের প্রস্তাব দেওয়ার অভিযোগ করেন। পরে অন্য বিভাগের আরও এক ছাত্রী তার বিরুদ্ধে একই ধরনের অভিযোগ আনেন। অভিযোগ দু’টি তদন্তে গঠিত কমিটির প্রতিবেদন গত ২৬ ডিসেম্বর জমা পড়ে। পরবর্তীতে ২৮ ডিসেম্বর অনুষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ২৩৪তম সিন্ডিকেট সভায় প্রতিবেদন দু’টি গৃহীত হয়। এর মধ্যে একটি অভিযোগ থেকে অধ্যাপক রুবেল আনছারকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও অন্য অভিযোগে তাকে দুই বছরের জন্য বাংলা ডিসিপ্লিনে পাঠদান, পরীক্ষা গ্রহণসহ সব ধরনের একাডেমিক ও প্রশাসনিক দায়িত্ব থেকে বিরত রাখার সিদ্ধান্ত নেয় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ