খুলনা | সোমবার | ২৭ জুলাই ২০২৬ | ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩

চোখ বাঁধা বন্দিকে গুলি করে ব্রিজ থেকে ফেলে দেন জিয়াউল: সাবেক মেজর

খবর প্রতিবেদন |
০১:১৭ এ.এম | ২৭ জুলাই ২০২৬

 

র‍্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নে (র‍্যাব) যোগ দেওয়ার প্রথম রাতেই গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার রোমহর্ষক ঘটনার সাক্ষী হয়েছিলেন বলে দাবি সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলামের।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দাঁড়িয়ে র‍্যাবের তৎকালীন ইন্টেলিজেন্স প্রধান লে. কর্নেল (পরবর্তীতে চাকরিচ্যুত মেজর জেনারেল) জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে সেই রাতের ঘটনার বিস্তারিত জবানবন্দি দিয়েছেন তিনি।

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চেয়ারম্যান বিচারপতি গোলাম মর্তূজা মজুমদারের নেতৃত্বে তিন সদস্যের বিচারিক প্যানেলে ষষ্ঠ সাক্ষী হিসেবে তার জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। প্যানেলের অপর দুই সদস্য হলেন— বিচারপতি শফিউল আলম মাহমুদ ও অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।

এই সাক্ষীর জবানবন্দি শেষে আসামিপক্ষের জেরা শুরু হয়। জেরার এক পর্যায়ে আসামিপক্ষ ও প্রসিকিউশনের এক আইনজীবী তর্কে জড়ান। এসময় চিফ প্রসিকিউটরও উপস্থিত ছিলেন। পরবর্তীতে এজলাসে উপস্থিত বিচারক দুই পক্ষেই উচ্চস্বরে তর্ক করতে নিষেধ করেন।

প্রথম রাতেই ‘অপারেশন’ ও হত্যাকাণ্ড
সাক্ষ্যে সাবেক মেজর খোন্দকার মোহাম্মদ সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, ১৯৯২ সালে সেনাবাহিনীতে কমিশন লাভের পর ২০১১ সালে তাকে র‍্যাবে বদলি করা হয়। ১১ জুলাই তিনি র‍্যাব-৩ এ যোগ দেন। ওইদিনই র‍্যাব-৩ এর তৎকালীন কমান্ডিং অফিসার লে. কর্নেল রফিকুল ইসলাম তাকে জানান, রাতে জিয়াউল আহসানের নির্দেশে একটি অপারেশন আছে, সেখানে তাকে যেতে হবে।

সেদিন রাত ১১টার দিকে সাদা পোশাকে র‍্যাব সদর দফতরে যান সাজ্জাদুল। সেখান থেকে চারটি গাড়ি টঙ্গীর আহসানুল্লাহ মাস্টার ফ্লাইওভার পার হয়ে একটি ব্রিজের ওপর গিয়ে থামে।

সেখানে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দিয়ে তিনি বলেন, ‘ব্রিজের ওপর দাঁড়ানোর পর সকল গাড়ি থেকে সবাই নামেন। একজন চোখ বাঁধা, হাত বাঁধা বন্দিকে গাড়ি থেকে নামানো হলে লে. কর্নেল জিয়াউল আহসান সেই বন্দিকে ধরে নিয়ে ব্রিজের রেলিংয়ের সঙ্গে ঠেকিয়ে তার মাথার পেছন দিক থেকে গুলি করে রেলিংয়ের ওপর দিয়ে নিচে ফেলে দেন।’

র‍্যাবে যোগ দেওয়ার কয়েক ঘণ্টার মাথায় এমন ঘটনা দেখে হতবিহ্বল হয়ে পড়েন বলে জানান সাবেক এই সেনা কর্মকর্তা।

সাক্ষ্যে সাজ্জাদুল জানান, ব্রিজ থেকে লাশ ফেলার পর গাড়িগুলো আবার চলতে শুরু করে এবং কিছুদূর গিয়ে থামে। তখন জিয়াউল আহসান তাকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘এখানে একটি সন্ত্রাসবিরোধী অপারেশন হবে এবং তুমি সেটা করবে।’

কারা সন্ত্রাসী এবং তাদের কী করতে হবে— জানতে চাইলে জিয়াউল আহসান ‘অগ্নিমূর্তি’ ধারণ করেন বলে জানান সাক্ষী।

তিনি বলেন, ‘স্যার চিৎকার করে বললেন, 'You bloody coward officer, stupid'। আমি বিনয়ের সঙ্গে বললাম, স্যার কী কাজ করতে হবে এবং কাজটি যদি সঠিক না হয়, তাহলে আমি জেনেশুনে এমন কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারবো না।’ তখন জিয়াউল আহসান রেগে গিয়ে বলেন, "You bloody go and sit inside vehicle, I will deal your case separately."

ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে গাড়িতে গিয়ে বসার কথা জানিয়ে সাজ্জাদুল বলেন, ‘সেসময় জিয়াউল আহসানের মুখের ওপর কথা বলা মানে নিজের জীবনের ঝুঁকি, চাকরি ও ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মাঝে ফেলে দেওয়া। আমি ভাবছিলাম আমাকে হয়তো এনকাউন্টার দেখিয়ে মেরে ফেলবে অথবা চাকরি চলে যাবে।’

গাড়িতে বসে অস্পষ্ট গুলির শব্দ শোনার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ৮ থেকে ১০ মিনিট পর সবাই ফিরে এলে গাড়ি চলতে থাকে। পরে বাঁশ ঝাড়ের পাশে গাড়ি থামলে তিনি দেখতে পান, চোখ বাঁধা এক লোককে ২-৩ জন টেনে নিয়ে যাচ্ছে। পরে বাকিরা গাড়িতে ফিরলেও ওই চোখ বাঁধা লোকটিকে আর ফিরে আসতে দেখেননি তিনি।

পরদিনই সেনাবাহিনীতে ফেরত ও বাধ্য হয়ে অবসর
সাজ্জাদুল ইসলাম জানান, এই ঘটনার পরদিন ১২ জুলাই সকালেই তিনি জানতে পারেন তাকে র‍্যাব থেকে সেনাবাহিনীতে বদলি করা হয়েছে। সাধারণত সেনা সদরে পাঠানোর নিয়ম থাকলেও তাকে সরাসরি কুমিল্লার অর্ডন্যান্স ডেপোতে পাঠানো হয়। এর ৩-৪ দিন পর পত্রিকায় গাজীপুরে গুলিবিদ্ধ তিনটি লাশ পাওয়ার খবর দেখেন তিনি।

সাজ্জাদুল বলেন, ‘২০১১ সালে র‍্যাবের এই ঘটনার পর বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে আমাকে একজন অবিশ্বস্ত এবং অবাধ্য অফিসার হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। একজন সৎ, যোগ্য ও মেধাবী অফিসার হওয়া সত্ত্বেও আমার আর পদোন্নতি হলো না। ফলে ২০১৩ সালে অবসরের মেয়াদকাল ১২ বছর বাকি থাকতেই আমি স্বেচ্ছায় অবসর গ্রহণ করি।’

সাক্ষ্যগ্রহণ শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, ‘মেজর সাজ্জাদ অত্যন্ত মর্মস্পর্শী ঘটনার বর্ণনা দিয়েছেন। তিনি জানিয়েছেন, সেদিন রাতে জিয়াউল হাসানের নেতৃত্বে প্রায় পাঁচজন মানুষকে একই কায়দায় হত্যা করা হয়।’

সাক্ষীদের বক্তব্যের মিল পাওয়ার কথা উল্লেখ করে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ‘তার এই বর্ণনার সঙ্গে গত ২১ জুন সাক্ষ্য দেওয়া জিয়াউল আহসানের সাবেক দেহরক্ষী ইমরুল কায়েসের (পঞ্চম সাক্ষী) বক্তব্যের মিল আছে। আমরা কোরোবোরেশন (সমর্থনমূলক প্রমাণ) পেয়েছি। এমনকি সাবেক সেনাপ্রধান ইকবাল করিম ভূঁইয়া ট্রাইব্যুনালে এসে জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে যে সাক্ষ্য দিয়েছিলেন, তার সঙ্গেও আজকের সাক্ষীর বক্তব্যের মিল রয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘এ রকম নৃশংস বর্ণনার প্রেক্ষিতে আমরা মনে করি, জিয়াউল আহসানের পাপের বোঝা এত ভারী হয়েছে যে, এখন আমরা শুধু আদালতের ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় আছি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ