খুলনা | বৃহস্পতিবার | ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

গোঁফ কেটে পুরান ঢাকার ‘শ্রমিক মিরাজ’ পরিচয়ে সীমান্ত পার হতে চেয়েছিল

ভারত যাচ্ছিলেন চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন, ধরা পড়েন তিন সহযোগীসহ

নিজস্ব প্রতিবেদক, যশোর |
০৪:২৫ পি.এম | ২৯ জুলাই ২০২৬


আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিয়ে চুল ও গোঁফ কেটে ছদ্মবেশ ধারণ করে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার প্রাক্কালে চট্টগ্রামের আলোচিত শীর্ষ সন্ত্রাসী মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড ইমনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। বুধবার ভোরে যশোর শহরের ঝুমঝুমপুর এলাকা থেকে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। পরে সকালে তাকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়। প্রাথমিক প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে পুলিশ জানতে পেরেছে তিনি বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন। 
গ্রেফতারের সময় লুঙ্গি ও গেঞ্জি পরা অবস্থায় নিজেকে পুরান ঢাকার এক সাধারণ শ্রমিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে পুলিশকে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করেছিলেন তিনি। ডিবির তল্লাশি চৌকিতে নিজের নাম মিরাজ দাবি করলেও তথ্যপ্রযুক্তি ও শারীরিক বৈশিষ্ট্য বিশ্লেষণ করে পুলিশ নিশ্চিত হয় যে তিনিই কাক্সিক্ষত ডেভিড ইমন।
এর আগে গত ২৬ জুলাই চট্টগ্রামের অক্সিজেন-কুয়াইশ এলাকা থেকে একটি বিদেশি পিস্তল ও গুলিসহ ইমনের দুই সহযোগী আসিফ ও সাইদুলকে গ্রেফতার করা হয়। তাদের দেওয়া তথ্যের সূত্র ধরেই পুলিশ নিশ্চিত হয় যে ইমন যশোর সীমান্ত দিয়ে দেশত্যাগের চেষ্টা করছেন।
পুলিশ সূত্র জানায়, ডেভিড ইমন ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করছে এমন তথ্যের ভিত্তিতে যশোরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মিরাজুল ইসলামের নেতৃত্বে পুলিশের একটি টিম যশোর-নড়াইল মহাসড়কের ঝুমঝুমপুর এলাকায় অবস্থান নেয়। বুধবার ভোরে সন্দেহ হলে কালো রঙের একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি চালালে ইমনকে শনাক্ত করে পুলিশ। ইমনের আলোচিত গোফ কেটে ফেলায় পুলিশের চিনতে বেগ পেতে হয়। পরে এক পর্যায়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদে স্বীকার করেন সে চট্টগ্রাম নগরের আলোচিত ও শীর্ষ সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। এ সময় গাড়ির ভেতরে থাকা তার তিন সহযোগীকেও গ্রেফতার করা হয়। 
যশোর জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও তদন্ত) মিরাজুল ইসলাম বলেন, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চেকপোস্ট বসিয়ে বিশেষ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডেভিড ইমনকে তার তিন সহযোগীসহ গ্রেফতার করা হয়। প্রাথমিক আইনি প্রক্রিয়া শেষে করে তাদেরকে চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে ডেভিড ইমন পুলিশকে জানান, তিনি চিকিৎসার উদ্দেশ্যে ভারতে যাওয়ার চেষ্টা করছিলেন।
যশোরের পুলিশ সুপার (এসপি) সৈয়দ রফিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঝুমঝুমপুর এলাকায় নজরদারি ও চেকপোস্ট বসিয়ে অভিযান চালানো হয়। অভিযানে ডেভিড ইমন ও তার তিন সহযোগীকে গ্রেফতার করা হয়। প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া শেষে বুধবার সকাল ১০টার দিকে তাদের চট্টগ্রাম জেলা পুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।
এর আগে গত রোববার রাতে চট্টগ্রাম নগরের অক্সিজেন-কুয়াইশ সড়কের ওয়াজেদিয়া এলাকায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনের দুই সহযোগী মোঃ আসিফ (২৫) ও সাইদুল ইসলাম ওরফে আরিফকে (২৪) গ্রেফতার করে চট্টগ্রাম মহানগর পুলিশ (সিএমপি)। তাদের মধ্যে আসিফ একটি মামলার পরোয়ানাভুক্ত পলাতক আসামি ছিলেন।
সিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার (ক্রাইম এ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ জানান, আসিফকে গ্রেফতারের সময় তার কোমর থেকে একটি বিদেশি পিস্তল এবং ম্যাগজিনে থাকা দুই রাউন্ড গুলি উদ্ধার করা হয়। একই অভিযানে আরিফের প্যান্টের পকেট থেকে আরও দুই রাউন্ড গুলি জব্দ করা হয়।
পুলিশের দাবি, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতার দুই ব্যক্তি নিজেদের ডেভিড ইমনের সহযোগী হিসেবে পরিচয় দেন। তারা দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ অস্ত্র ব্যবহার করে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি ও অন্যান্য সন্ত্রাসী কর্মকান্ডে জড়িত থাকার কথাও স্বীকার করেছেন বলে জানিয়েছে পুলিশ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ভাষ্য, দুই সহযোগীর কাছ থেকে পাওয়া তথ্য এবং গোয়েন্দা নজরদারির ভিত্তিতে ডেভিড ইমনের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যায়। পরে বুধবার যশোরের ঝিকরগাছায় অভিযান চালিয়ে ডেভিড ইমনসহ মোট পাঁচজনকে গ্রেফতার করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে তাদের সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ক, অবৈধ অস্ত্রের উৎস, সহযোগীদের পরিচয় এবং চট্টগ্রামে সংঘটিত বিভিন্ন অপরাধে তাদের সম্পৃক্ততা সম্পর্কে আরও তথ্য উদ্ঘাটনের চেষ্টা চলছে।
পুলিশ জানায়, ঢাকায় কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর যশোর সীমান্ত দিয়ে অবৈধভাবে ভারতে পালিয়ে যাওয়ার পরিকল্পনা ছিল ইমনের। চট্টগ্রাম রেঞ্জের অতিরিক্ত ডিআইজি মো. নাজিমুল হক জানিয়েছেন, দীর্ঘ গোয়েন্দা নজরদারির পর এই শীর্ষ সন্ত্রাসীকে অবশেষে আইনের আওতায় আনা সম্ভব হয়েছে।
পুলিশ ও তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চননগর গ্রামের বাসিন্দা মোবারক হোসেন ওরফে ডেভিড চট্টগ্রামের ইমন সাজ্জাদ আলী খান ওরফে বড় সাজ্জাদ গ্র“পের সক্রিয় সদস্য। চট্টগ্রামের একাধিক আলোচিত হত্যা, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাসী কর্মকান্ড এবং অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনায় তার নাম বিভিন্ন সময় আলোচনায় আসে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অস্ত্র হাতে তার একাধিক ছবি ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি ব্যাপকভাবে আলোচিত হন।
চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলার কাঞ্চন নগর ইউনিয়নের সাধারণ পরিবারের সন্তান মোবারক হোসেনের অপরাধজগতে হাতেখড়ি বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে। ফটিকছড়ির সাবেক উপজেলা চেয়ারম্যান ও তৎকালীন শীর্ষ সন্ত্রাসী আবু তৈয়বের শিষ্য হিসেবে তিনি এলাকায় ছিচকে চুরি এবং অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। ২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার আন্দোলনের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলে তিনি এলাকা ছেড়ে চট্টগ্রাম শহরে চলে আসেন এবং ছোট সাজ্জাদের হাত ধরে নিজের নাম বদলে ডেভিড ইমন রাখেন। পরবর্তীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদ গ্র“পের সঙ্গে যুক্ত হয়ে তিনি দ্রুত অপরাধজগতের নিয়ন্ত্রণ নেন এবং ছোট সাজ্জাদ কারাগারে যাওয়ার পর এই বাহিনীর সেকেন্ড-ইন-কমান্ড হিসেবে আবির্ভূত হন।
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, মাত্র দুই বছরেই ডেভিড ইমন একাধিক খুনের মামলার সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছেন। তার অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের মধ্যে রয়েছে ২০২৪ সালের ২৮ আগস্ট বাকলিয়া এলাকায় আনিস ও মোহাম্মদ হাসান হত্যা, ২০২৫ সালের ৩০ মার্চ বাকলিয়ায় চাঞ্চল্যকর জোড়া খুন এবং একই বছরের ২৩ মে পতেঙ্গা সমুদ্রসৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবর খুন। এছাড়া সা¤প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামের বিভিন্ন ইন্টারনেট সেবাদাতা আইএসপি প্রতিষ্ঠান ও ব্যবসায়ীদের ফোন করে প্রায় দেড় কোটি টাকা চাঁদা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। চন্দপুরার ডিডিএন ইন্টারনেট প্রতিষ্ঠানে সশস্ত্র হামলা চালিয়ে চাঁদা দাবির ঘটনাও ঘটিয়েছিল তার বাহিনী।
গত বছরের ৩০ মার্চ চট্টগ্রাম শহরের চন্দনপুরা এক্সেস রোডের মুখে প্রাইভেট কারে গুলি করে জোড়া খুন, ২৩ মে পতেঙ্গা সৈকতে সন্ত্রাসী ঢাকাইয়া আকবরকে খুন এবং ৫ নভেম্বর সরোয়ার হোসেন বাবলা খুনের ঘটনায় মোবারক হোসেন ইমন ওরফে ডেভিড ইমনের নাম সামনে আসে।
এরপর চলতি বছরের ১৩ জুলাই চট্টগ্রামে ‘ডিজিটাল ডটনেট (ডিডিএন)’ নামে ইন্টারনেট সেবার এক কোম্পানিতে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর এবং ৩৫ লাখ টাকা ও মালপত্র লুটের ঘটনায় নতুন করে আলোচনায় আসেন ডেভিড ইমন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ