খুলনা | বৃহস্পতিবার | ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৫ শ্রাবণ ১৪৩৩

কয়রায় তথাকথিত জ্বীনের হসপিটালে চিকিৎসার নামে চলছে অপচিকিৎসা আর রমরমা ব্যবসা

কয়রা প্রতিনিধি |
১২:১২ এ.এম | ৩০ জুলাই ২০২৬


আজকের একবিংশ শতাব্দীতে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অভাবনীয় উন্নতি করলেও মানুষের বিরাট একটি অংশ এখনো অলৌকিক চিকিৎসার দাবিকে বিশ্বাস করে। আর সেই বিশ্বাসকে পুঁজি করেই অনেক প্রতারক বিভিন্ন ছদ্দবেশে খুলে বসে তাদের প্রতারণার ফাঁদ। তারই এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি খুলনার কয়রা। উপজেলায় সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে ‘জ্বীনের হাসপাতাল’ নাম ভাঙিয়ে দীর্ঘদিন ধরে অপচিকিৎসার অভিযোগ উঠেছে একটি চক্রের বিরুদ্ধে। উপজেলার মহারাজপুর ইউনিয়নের পবনা (মঠবাড়ী) গ্রামে গড়ে ওঠা এই কথিত হাসপাতালে নানা জটিল রোগের চিকিৎসার নামে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে প্রতিদিন মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে কোনো ল্যাবরেটরি বা প্রশিক্ষিত প্যাথলজিস্ট না থাকলেও স্যাম্পল সংগ্রহ ও পরীক্ষার রিপোর্ট ছাড়াই বিভিন্ন জটিল রোগ নির্ণয় করা হয়। এছাড়া অপারেশন থিয়েটার না থাকলেও রক্তপাত ছাড়াই হার্টে রিং পরানো, কিডনি প্রতিস্থাপন, লিভার অপারেশনসহ নানা জটিল অস্ত্রোপচারের নামে রোগীদের সঙ্গে প্রতারণা করা হচ্ছে।
সরেজমিন কথা হয় মাদারীপুর জেলার নয়াচর গ্রামের রোগী শামীম খন্দকারের বোন সালমা বেগমের সাথে। তিনি বলেন খাদ্যনালিতে পাথর পড়ার কারণে ঢাকা খালেদা জিয়া মেডিকেল হসপিটালে আমার ভাইকে অপারেশন করা হয়। অপারেশন শেষ ডাক্তারেরা অসাবধানতাবসত খাদ্যনালী ও পিত্তনালী লিবারের পাশ দিয়ে এনে এডজাস্ট করে সেলাই করে দেওয়ার কারণে পরবর্তীতে রোগী আরো মুমূর্ষ হয়ে পড়ে। কোন কিছু খেতে গেলে সাথে সাথে বমি হয়ে বের হয়ে আসে। পরবর্তীতে তার খালাতো ভাইয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ হয় জ্বীনের কবিরাজখ্যাত লিলি আক্তার সাথে। তাকে দেখানোর জন্যই মাদারীপুর থেকে মৃতপ্রায় ভাইকে নিছে ছুটে আসেন বোন সালমা খাতুন।
জ্বীনের মাধ্যমে সার্জিক্যাল অপারেশন বা রোগের চিকিৎসার দাবির পক্ষে নেই কোন নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক প্রমাণ। তবে চক্রটি স্থানীয় রাজনৈতিক প্রভাব ও প্রশাসনকে ম্যানেজ করে দীর্ঘদিন ধরে এসব কার্যক্রম চালিয়ে আসছে বলে এলাকায় আলোচনা রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে নির্দিষ্ট কমিশনের ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে রোগী সংগ্রহ করে আনা হয়। সপ্তাহের প্রতি শনিবার, মঙ্গলবার, বৃহস্পতিবার ও শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টা থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কথিত ‘জ্বীনের বিশেষজ্ঞ দল’ রোগীদের চিকিৎসা দেয়। হাসপাতালটিতে ক্যান্সার, হার্ট ব্লক, বন্ধ্যাত্বসহ নানা জটিল রোগের রোগীর উপস্থিতি বেশি দেখা যায়।
চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদের কাছ থেকে প্রথমে এক হাজার টাকার বিনিময়ে পানি পড়া, তেল পড়া ও মাদুলি দেওয়া হয়। এতে কাজ না হলে রোগের ধরন অনুযায়ী দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকার বিনিময়ে রোগী ভর্তি করা হয়। পরে গভীর রাতে অন্ধকার ঘরে চলে কথিত অপারেশন। আর এসব অপারেশনের নামে রোগীদের কাছ থেকে ৫ হাজার থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। অপারেশনের পর রোগীদের জন্য এক হাজার টাকার বিনিময়ে মাটির ঘরে এক সপ্তাহ থাকার ব্যবস্থা করা হয়। এসব রোগীদের প্রতি মাসে চেকআপের জন্য আসতে বলা হয়।
সরেজমিন ১৩ জুন বিকেলে দেখা যায় খুলনার ডুমুরিয়া, দাকোপ, সাতক্ষীরা ও যশোর থেকে শত শত  লোক কথিত হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে এসেছেন। কয়েকজন তাদেরকে সিরিয়াল দেওয়া ও বেড বুঝিয়ে দিচ্ছেন। লোকজনের অতিরিক্ত ভিড়ের কারণে অনেকেই জ্বীনের হাকিম মিলির বাড়ির সামনে শাকবাড়িয়া নদীর ভেড়িবাঁধের উপরে বসে আছেন। বাড়ির ভিতরে সারিবদ্ধভাবে লম্বা ৩টি টিন ও গোলপাতার ঘরে গত সপ্তাহে বিভিন্ন জটিল রোগের অপারেশন হওয়া ৫০ জন রোগী ভর্তি করে রাখা হয়েছে। আর রাত ৮টা থেকে ঘুটঘুটে অন্ধকারে একটি মাটির ঘরে কথিত ‘জ্বীনের বিশেষজ্ঞ দল’ রোগী দেখছে।
স্থানীয়দের দাবি অশিক্ষিত নারী মিলি বেগম ওপর জ্বীন ভর করার দাবি তুলে তার মাধ্যমে এসব চিকিৎসা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। ঘরের বাইরে অপেক্ষমাণ রোগীদের সিরিয়াল নিয়ন্ত্রণ, ভর্তি ও পরামর্শ দেওয়ার কাজ করছেন কয়েক ব্যক্তি।
স্থানীয়রা জানান স্বামী মারা যাওয়ার পর মিলি মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন এবং বাবার বাড়িতে নিজেকে আড়াল করে রাখতেন। পরে তার ওপর জ্বীন ভর করেছে বলে প্রচার চালানো হয়। এরপর থেকেই কথিত জ্বীনের মাধ্যমে চিকিৎসা দেওয়া শুরু হয়।
এখানে চিকিৎসা নিতে আসা ব্যক্তিদের মোবাইল ফোন বন্ধ রাখতে বলা হয়। এমনকি পুরো বাড়ির আঙিনায় আলো জ্বালানোও নিষিদ্ধ। ফলে নারী-পুরুষ সবাইকে একত্রে অন্ধকার পরিবেশে অবস্থান করতে হয়। সাতক্ষীরার চৌদ্দরশি এলাকা থেকে চিকিৎসা নিতে আসা আবু ওসামা নামের এক ব্যক্তি বলেন “আমার বুকে ব্যথা অনুভব করলে সাতক্ষীরা সরকারি হাসপাতালে গিয়ে হার্টে ছিদ্র রয়েছে বলে জানতে পেরেছি। হাসপাতালে অপারেশনের জন্য অনেক টাকা চেয়েছে। তাই পরিচিত একজনের মাধ্যমে এখানে এসে অপারেশন হয়েছি। গত সপ্তাহে অপারেশনের পরে বুকের একটা বেল্ট দিয়েছে। আর কোন ঔষধ পত্র লাগেনি”।
অপরদিকে চেকআপে আসা খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলার রাফেজা খাতুন জানান দুই মাস আগে তার মেরুদন্ডে অপারেশন হয়েছে। তবে আগের চেয়ে কোন পরিবর্তন না হওয়ার বিষয়টি হাকিম মিলিকে জানালে তিনি নতুন ডোজ নিতে আসতে বলেছেন। তবে অপারেশনের পরে কোন হাসপাতাল বা ক্লিনিকে তিনি চেকআপ করেছেন কি না জানতে চাইলে বলেন, এখানকার জ্বীন ডাক্তাররা অন্য কোন হাসপাতালে গিয়ে এক্স-রে করতে নিষেধ করেছেন।
কয়রা সদর ইউনিয়নের ৩ নং কয়রা গ্রামের আবু মুসা বলেন, আমি প্রায় ৬ মাস ঐ জ্বীনের হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছি। আমার হার্টে রিং পরানো ও লিভার চিকিৎসার নামে প্রায় ২০ হাজার টাকা নিয়েছে। তবে বুকের ব্যথা দিনদিন বেশি হলে খুলনার আদ-দ্বীন হাসপাতালে গিয়ে জানতে পারি দীর্ঘদিন চিকিৎসা না নেওয়ায় হার্ট ও লিভারের সমস্যা জটিল আকার ধারণ করেছে। এরপর খুলনা থেকে অপারেশন করে আগের চেয়ে অনেকটা সুস্থ আছি।
কথিত জ্বীনের হাসপাতালে হাকিম মিলির বড়ভাই মোশাররফ সরদার বলেন প্রথমে আমরা বিশ্বাস করে মানুষের উপকারের কথা ভেবে সহযোগিতা করেছি। পরবর্তীতে জানতে পেরেছি জ্বীন ডাক্তার নামে ভাঙ্গিয়ে তারা প্রতারণা করে টাকা নিচ্ছে। তাদের অনেকবার নিষেধ করলেও শুনছে না।
স্থানীয় বাসিন্দা মেহেদী হাসান বলেন, “শনিবার ও মঙ্গলবার রাতে বিভিন্ন এলাকার নিরীহ মানুষকে এখানে এনে অপচিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নেওয়া হচ্ছে। কোস্টগার্ডের অভিযানের পর কিছুদিন কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও পরে আবার শুরু হয়েছে।”
এ বিষয়ে কথিত জ্বীনের হাসপাতালের পরিচালক আলমগীর সরদার বলেন, “মহারাজপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানের অনুমতি নিয়ে আমরা চিকিৎসা দিচ্ছি। তবে অনুমতি পত্র দেখাতে বললে তিনি অপারগতা প্রকাশ করেন। এছাড়া চিকিৎসা নিতে আসা এসব নারী-পুরুষের তথ্য সংরক্ষণের কোন ব্যবস্থা নেই বলেও তিনি জানান।
তবে অনুমতির কথা অস্বীকার করে চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল মাহমুদ বলেন তাদের কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডাঃ রেজাউল করিম বলেন, এটি বন্ধের ব্যাপারে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বরাবর লিখিত অভিযোগ প্রেরণ করা হয়েছে । তিনি ব্যবস্থা গ্রহণ করবেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আব্দুল্লাহ আল বাকী বলেন এই ব্যাপারে তাদের সাথে কথা হয়েছে এবং এটি বন্ধের জন্য তাদের বলা হয়েছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ