খুলনা | বৃহস্পতিবার | ৩০ জুলাই ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ ১৪৩৩

মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির গিনিপিগ বাংলাদেশের জনগণ!

মোবাইল টাওয়ার থেকে বিকিরিত উচ্চমাত্রার তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ জীব ও উদ্ভিদ জগতের ক্যান্সারসহ ভয়াবহ রোগের কারণ

শামিম আশরাফ শেলী |
০১:৪৩ এ.এম | ৩০ জুলাই ২০২৬


নিয়ন্ত্রণহীন, বেপরওয়া মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির টাওয়ার থেকে নির্গত বিপুল পরিমাণ তেজস্ক্রিয় ইলেক্ট্রো ম্যাগনেটিক ওয়েভ বা বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ মানুষ তথা জীব ও উদ্ভিদ জগতের স্বাভাবিক জীবনকে ঠেলে দিচ্ছে ক্যান্সারসহ জানা অজানা বিভিন্ন ভয়ঙ্কর রোগ-বালাইয়ের কবলে। এই বিপদজনক কর্মকান্ড যাতে সামনে না আসে সে জন্য প্রতিনিয়ত খরচ করা হচ্ছে শত শত কোটি টাকা। অন্যদিকে জীব ও উদ্ভিদ জগতকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিয়েও নির্দিষ্ট করে প্রকাশ করা হচ্ছে না তেজস্ক্রিয় বিকিরণের মাত্রা। আর এ ক্ষেত্রে তারা দেশের মানুষকে দেখছে গিনিপিগ হিসেবে।
ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ কি : মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে যে সিগনাল নির্গত হয় মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্ক ব্যাবস্থা চালু রাখে তা হ’ল ইলেক্ট্রোম্যাগনেটিক ওয়েভ বা বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ। বিভিন্ন তরঙ্গদৈর্ঘের এই তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ যা অবস্থান করে সাধারণ আলো, রেডিও তরঙ্গ, মাইক্রোওয়েভ, অবলহিত রশ্মি, আল্ট্রাভায়োলেট রশ্মি, এক্স-রে ও গামারশ্মির মাঝে। এই বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ তেজস্ক্রিয় বিধায় সঠিক মাত্রার অতিরিক্ত পরিমাণ মানুষ তথা জীব ও উদ্ভিদ দেহে এই তরঙ্গ ক্যান্সার সহ মারাত্মক সব জানা অজানা রোগ সৃষ্টি করতে সক্ষম। আর এই তরঙ্গের ক্ষতি করার ক্ষমতা কত তা নির্ভর করে প্রতি মিটারে এই তরঙ্গদৈর্ঘের পরিমাণের উপর। জীব জগতে এই তরঙ্গের সহনীয় পরিমাণ হ’ল ০.৪ ইলেক্ট্রন ভোল্ট। এই তরঙ্গের গতি খোলা প্রান্তরে প্রতি সেকেন্ডে আলোর গতির সমান অর্থাৎ ১ লাখ ৮৬ হাজার মাইল।
গোপনীয়তা কার স্বার্থে : দেশে মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে যে বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ নির্গত হয় তার পরিমাণ কত তা জানার কোন উপায় নেই! অথচ বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ নির্গমনের পরিমাণের উপরই নির্ভর করে এর ধ্বংসাত্মক ক্ষমতা। বিকিরণের পরিমাণ যত বেশী মানবদেহ সহ জীব জগতের উপর তার ক্ষতিকর প্রভাবও তত বেশী। কিন্তু কেন তা গোপন করা হচ্ছে? তা হলে কি বর্তমানে এই তরঙ্গ নির্গমনের মাত্রা বিপদজনক পরিমাণের চাইতেও বেশী? সাধারণ মানুষের প্রশ্ন কার সার্থে এই বিপদজনক বিষয়টি গোপন রাখা হচ্ছে?
জনবসতির এলাকায় স্থাপিত টাওয়ারগুলি যে বিকিরণ ছড়াচ্ছে তার প্রভাব পড়ছে মস্তিষ্ক ও হৃদযন্ত্রে। বিকিরণের ফলে ঘুমের ব্যাঘাত, অবসাদ, ঝিমুনিভাব বেড়ে যাওয়া, মনঃসংযোগে সমস্যা, স্মৃতিশক্তি লোপ পাওয়া, মাথাব্যাথা, হজমের ক্ষমতা কমে যাওয়া, হৃদস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার মত নানা সমস্যা দেখা দিচ্ছে। মোবাইল ফোন ব্যবহার না করেও এই তেজস্ক্রিয় বিকিরণের শিকার হচ্ছে শিশু, বৃদ্ধ ও গর্ভবতী মহিলারা। কুপ্রভাব এড়াতে পারছে না পশুপাখী ও উদ্ভিদ জগতও। এ সকল কথা প্রকাশ করা হয়েছে মোবাইল ফোনের টাওযার থেকে বিকিরিত বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ’র প্রভাব ক্ষতিয়ে দেখতে গঠিত ভারতের কেন্দ্রীয় সরকারের আন্তঃমন্ত্রক কমিটির রিপোর্টে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) কি বলছে : বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ২০১১ সালে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে যে, মোবাইল ফোনের টাওয়ার থেকে বিকিরিত বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ’র কারণে ক্যান্সার পর্যন্ত হতে পারে। ১০ বছর ধরে ১৩টি দেশের উপর করা তাদের সমীক্ষা বলছে, দিনে এক-দু’ঘন্টা মোবাইল ফেনে কথা বললেই গ্লিয়োমা (মস্তিষ্কে টিউমার) হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। সেই সঙ্গে ঘন বসতিপূর্ণ এলাকাসহ যত্রতত্র গজিয়ে ওঠা মোবাইল ফোনের টাওয়ারগুলির বিকিরণ বিপদ ডেকে আনছে নিঃশব্দে প্রাণী ও উদ্ভিদ জগতের। বিশেষজ্ঞদের নির্দেশনা, অবশ্যই ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল ফোনের টাওয়ার বসানো বন্ধ করা উচিত, বিকিরণের পরিমাণ নির্ধারণ বাধ্যতামূলক করা এবং টাওয়ারগুলির উচ্চতা হওয়া উচিৎ টেলিফোনের সুউচ্চ টাওয়ারগুলির মত।
অসমর্থিত একটি সূত্রমতে, বাংলাদেশে মোবাইল ফোন কোম্পানিগুলির টাওয়ার থেকে নির্গত বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গের পরিমাণ প্রতি মিটার স্পেসে ৫ থেকে ৬ ইলেক্ট্রন ভোল্ট, যা সহনীয় পরিমাণের চেয়ে ১২ থেকে ১৫ গুণ বেশি। 
এর সত্যতা নিরুপণে নগরীতে মোট কতগুলি টাওয়ার আছে এবং সেগুলি থেকে বিকিরিত বৈদ্যুতিক চুম্বকীয় তরঙ্গ’র পরিমাণ প্রতি মিটারে কত এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলালিঙ্ক মোবাইল ফোন কোম্পানির খুলনা অফিসের ম্যানেজার মিঃ জয়দেব সময়ের খবরকে বলেন, “বিষয়টি কনফিডেন্টশিয়াল বা গোপনীয়। এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নেই। কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে জেনে কিছু সময় পরে ফোনে জানাবো।” তবে পরে তিনি আর কিছু জানাননি।
একই বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা গ্রামীণ ফোনের কর্পোরেট অফিসের একজন আধিকারিক সময়ের খবরকে বলেন, “এ বিষয়টি গ্রামীণ ফোনের নয়, গ্রামীণ ফোনের ভেন্ডর এইচ এস ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ন্ত্রণ করে।” তাদের নিকট থেকে জেনে দেওয়া সম্ভব কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন,“বিষয়টি ভেন্ডরের নিকট থেকে জানতে হবে।” তাদের সাথে যোগাযোগের কোন নম্বর অছে কি-না জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘না আমাদের কাছে তাদের কোন নম্বর নেই।”   
জীব ও উদ্ভিদ জগৎ হুমকির মুখে : গবেষকরা জানিয়েছেন, মোবাইফোনের টাওয়ারের মাত্রাতিরিক্ত বিকিরণের জেরে বদলে যাচ্ছে জীবজন্তুর আচরণ, দ্রুত কমে যাচ্ছে ময়না, টিয়া, শালিক, টুনটুনি, বুলবুলিদের মত পাখিদের সংখ্যা, ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বিভিন্ন উদ্ভিদের উৎপাদন ক্ষমতাও।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ডাঃ সর্বজিৎ আনোয়ার কামাল সময়ের খবরকে বলেন,“ ইলেকোট্রা ম্যাগনেটিক ওয়েভ একটি তেজস্ক্রিয় তরঙ্গ যা সহনীয় মাত্রার অধিক পরিমাণ মানুষ ও অন্যান্য জীবদেহে স্কিন ক্যান্সার ব্যাজারসেল কার্সিনোস, মেলানোমা, লিউকোমিয়া (ব্লাডক্যান্সর), কোলানজিও কার্সিনোমা বা লিভার ক্যান্সার এবং থাইরয়েড ক্যান্সারসহ বিভিন্ন ধরনের জটিল রোগ হতে পারে।”
তিনি আরও বলেন,“ ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় মোবাইল ফোনের টওিয়ার স্থাপন মানব তথা জীবদেহের জন্য হুমকী স্বরূপ।”    
বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)’র বিভাগীয় পর্যায়ে কোন অফিস নেই, তাদের সাথে যোগাযোগের জন্য বিটিআরসি’র ওয়েবসাইটে একটি নম্বর দেওয়া আছে। এ বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)’র ওয়েবসাইটে প্রদত্ত+৮৮০২-৫৫৬৬৭৭৬৬ নম্বরটিতে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও কারো সাথে কথা বলা সম্ভব হয়নি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ