খুলনা | শনিবার | ০১ অগাস্ট ২০২৬ | ১৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

মাদকবিরোধী আন্দোলন ঠেকাতে হয়রানি, দাবি অভিযুক্তদের : ওসির বিরুদ্ধে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ, পুলিশের অস্বীকার

গিলাতলায় পুলিশের ওপর হামলার অভিযোগে বিএনপি-জামায়াতসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে মামলা

খানজাহান আলী থানা প্রতিনিধি |
০১:৪৩ এ.এম | ০১ অগাস্ট ২০২৬



খানজাহান আলী থানাধীন গিলাতলা দক্ষিণপাড়া এলাকায় পুলিশ সদস্যকে মারধর, সরকারি কাজে বাধা এবং পুলিশের সরকারি পিকআপ ভাঙচুরের অভিযোগে ১১ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা আরও ১০-১৫ জনের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে। থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) সুধাংশু কুমার মিত্র বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেন। 
তবে মামলায় অভিযুক্ত বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতারা অভিযোগ অস্বীকার করে দাবি করেছেন, মাদকবিরোধী আন্দোলন দমাতে তাদের বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে মামলা করা হয়েছে। একই সঙ্গে থানার ওসির বিরুদ্ধে কথিত মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন তারা, যা পুলিশ অস্বীকার করেছে। 
মামলার এজাহার অনুযায়ী, গত ২৮ জুলাই বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর মাধ্যমে খবর পেয়ে পুলিশ গিলাতলা দক্ষিণপাড়া এলাকার গফফার ফুড মোড়সংলগ্ন এলাকায় যায়। সেখানে কথিত মাদক ব্যবসায়ী শাবানা বেগমের বাড়িতে ভাঙচুরের ঘটনায় উত্তেজিত জনতা অবস্থান করছিল। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে গেলে অভিযুক্তরা পুলিশকে লক্ষ্য করে ইট-পাটকেল নিক্ষেপ করে, সরকারি কাজে বাধা দেয় এবং পুলিশের ওপর হামলা চালায়। 
এজাহারে আরও বলা হয়, হামলার সময় পুলিশের গাড়িচালক কনস্টেবল মোঃ বদিয়ার হোসেনকে তার সরকারি পোশাকের কলার ধরে টানাহেঁচড়া ও কিল-ঘুষি মারা হয়। এতে তিনি আহত হন। এছাড়া ইট ও লাঠি দিয়ে পুলিশের সরকারি পিকআপের সামনের উইন্ডশিল্ড ও ডান পাশের গ্লাস ভাঙচুর করা হয়। এতে প্রায় ৫০ হাজার টাকার সরকারি সম্পদের ক্ষতি হয়েছে বলে মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে। আহত কনস্টেবলকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হয়। 
মামলায় আটরা গিলাতলা ইউনিয়ন বিএনপি’র সাংগঠনিক সম্পাদক মোঃ আনোয়ার হোসেন, খানজাহান আলী থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের যুগ্ম আহবায়ক মোঃ ইমরান মোল্লা, থানা বিএনপি’র সদস্য শেখ জিয়া, যুবদল নেতা মোঃ ইমন, জামায়াতের যুব বিভাগের সভাপতি মোঃ আসাবুর মিয়া, মোঃ সাকিব, মোঃ কামরুল ইসলাম, মোঃ বিল্লাল হোসেন, মহানগর ছাত্রদলের সদস্য ও খানজাহান আদর্শ মহাবিদ্যালয় ছাত্রদলের সভাপতি মোঃ তাজিম আহমেদ, স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মোঃ মাসুম বিল্লাহ এবং দিঘলিয়া উপজেলার মোঃ আবির হোসেনকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাতনামা আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে মামলায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। 
অভিযুক্ত আনোয়ার হোসেন বলেন, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না, খুলনা আদালত প্রাঙ্গণে অবস্থান করছিলেন। মাদকবিরোধী আন্দোলনে সক্রিয় থাকায় একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাকে মামলায় জড়িয়েছে বলে দাবি করেন তিনি। 
থানা বিএনপি’র সদস্য শেখ জিয়া বলেন, শাবানা বেগমের পরিবার দীর্ঘদিন ধরে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় বাসিন্দারা মাদক বিক্রি বন্ধের দাবিতে প্রতিবাদ গড়ে তুলেছিলেন। তিনি দাবি করেন, পুলিশের গাড়ি ভাঙচুর বা পুলিশ সদস্যকে মারধরের কোনো ঘটনা ঘটেনি। 
একই সঙ্গে তিনি অভিযোগ করেন, থানার ওসি মোঃ আবুল বাসার শাবানার কাছ থেকে প্রতি মাসে ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকা উৎকোচ নেন। এ কারণেই প্রকৃত মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নিয়ে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে বলে তার দাবি। স্বেচ্ছাসেবক দলের সদস্য সচিব মোঃ মাসুম বিল্লাহ বলেন, ঘটনার দিন তিনি ঘটনাস্থলে ছিলেন না। তিনি ওসিকে নিজের নির্দোষিতার প্রমাণ চাইলে ওসি তাকে জানান, ‘এসবি রিপোর্টে’ তার নাম রয়েছে বলে তাকে আসামি করা হয়েছে। 
এ ব্যাপারে শুক্রবার বিকেলে অভিযোগের বিষয়ে খানজাহান আলী থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোঃ আবুল বাসার বলেন, পুলিশের কাজে বাধা, হামলা ও সরকারি গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, শাবানা বেগম দীর্ঘদিন ধরে এলাকা ছাড়া। তার বাড়িতে ভাঙচুর, লুটপাট এবং মালামাল নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছে। খবর পেয়ে পুলিশ গেলে তাদের ওপর হামলা চালানো হয়। শাবানার কাছ থেকে মাসোহারা নেওয়ার অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলেও তিনি দাবি করেন। 
তার (ওসি) ভাষ্য, মামলার অধিকাংশ আসামি মাদকসেবী এবং স্থানীয় মাদক ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে চাঁদা আদায় করতেন; চাঁদা না পেয়ে তারা এসব ঘটিয়েছেন। 
মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই আবুল কালাম আজাদ বলেন, ঘটনাটির প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া গেছে। এখনো কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি। আসামিদের গ্রেফতার ও মামলার তদন্ত চলমান রয়েছে। 
এদিকে স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দার অভিযোগ, কেএমপির তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী শাবানা বেগম ও তার ছেলে সাগর দীর্ঘ ১৫ থেকে ২০ বছর ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে আসছেন। তাদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। সাম্প্রতিক সময়ে এলাকাবাসী মাদকবিরোধী সামাজিক আন্দোলন শুরু করলে শাবানা ও সাগর এলাকা ছেড়ে চলে যান। পরে শাবানার ভাই শাহীন শেখ এলাকায় এসে পুনরায় মাদক বিক্রি শুরু করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এলাকাবাসীর ভাষ্য, শাহীনকে সতর্ক করার পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হওয়ায় গত ২৮ জুলাই বিক্ষুব্ধ জনতা শাবানার বাড়িতে ভাঙচুর চালায়। তাদের দাবি, পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর পর মানুষ মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা না নেওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করে। 
পুলিশের দাবি অনুযায়ী হামলার ঘটনা ঘটেনি বরং মাদক সিন্ডিকেটকে আড়াল করতেই এ মামলা করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন মামলার এজাহারভুক্তরা ও এলাকাবাসী।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ