খুলনা | সোমবার | ০৩ অগাস্ট ২০২৬ | ১৯ শ্রাবণ ১৪৩৩

আয়নাঘরের আলামত নষ্টকারীদের ছাড় দেওয়া হবে না : চিফ প্রসিকিউটর

‘আয়নাঘর’ কোনো রূপকথা নয়, চরম বাস্তবতা’

খবর প্রতিবেদন |
০১:৫৩ এ.এম | ০২ অগাস্ট ২০২৬


রাজধানীর উত্তরায় র‌্যাব-১ কার্যালয়ে ‘আয়নাঘর’ হিসেবে পরিচিত টর্চার সেল পরিদর্শন করেছেন আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও প্রসিকিউটররা। পরিদর্শন শেষে ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম বলেছেন, এ কক্ষগুলো কোনো রূপকথা নয়, বরং বিগত সরকারের ‘ফ্যাসিবাদী’ চরিত্রের চরম বাস্তবতা।
শনিবার সকালে ট্রাইব্যুনালের তিনজন বিচারপতি, প্রসিকিউশন টিম, ভিকটিম পরিবারের সদস্য এবং মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে এই যৌথ পরিদর্শন করা হয়। তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে বন্দিশালার বিভিন্ন কক্ষ, অবকাঠামো ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনা ঘুরে দেখেন। পরিদর্শনকালে বিচারে সংশ্লিষ্ট আসামিপক্ষের আইনজীবীরা ও সাংবাদিকরাও উপস্থিত ছিলেন।
পরিদর্শনের সময় বিচারক ও প্রসিকিউশন দল বন্দিদের রাখার স্থান, জিজ্ঞাসাবাদের কক্ষ, নজরদারি ব্যবস্থাসহ বিভিন্ন বিষয় পর্যবেক্ষণ করেন। গুমের অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ঘটনাগুলোর বাস্তব চিত্র বোঝার জন্যই এই পরিদর্শন করা হয়েছে বলে জানা গেছে।
২১ জুলাই আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এর চিফ প্রসিকিউটর মোঃ আমিনুল ইসলামের আবেদনের প্রেক্ষিতে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তর (ডিজিএফআই) এবং র‌্যাবের ‘আয়নাঘর’ পরিদর্শনের অনুমতি দেয় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১।
বিচারপতি মোঃ গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন তিন সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এই আদেশ দেন। বাকি দুই সদস্য হলেন বিচারপতি মোঃ শফিউল আলম মাহমুদ ও বিচারক মোঃ মোহিতুল হক এনাম চৌধুরী।
পরে চিফ প্রসিকিউটর গণমাধ্যমকে জানান, ডিজিএফআইয়ের জেআইসি (জয়েন্ট ইন্টারোগেশন সেল) ও র‌্যাবের টিএফআই (টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন) সেলের বন্দিশালা পরিদর্শন করবেন ট্রাইব্যুনালের বিচারপতি ও বিচারকেরা। সে সময় ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউশন (রাষ্ট্রপক্ষ) ও ডিফেন্সের লোকসহ অন্যান্য প্রয়োজনীয় লোকজন উপস্থিত থাকতে পারেন।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১-এ জেআইসি ও টিএফআই সেলে গুম করার ঘটনায় সাবেক ও বর্তমান সেনা কর্মকর্তাদের বিচার চলছে।
উত্তরার র‌্যাব-ওয়ান সদর দপ্তরে অবস্থিত টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেল বা আয়নাঘর পরিদর্শনের পর কঠোর হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন চিফ প্রসিকিউটর আমিনুল ইসলাম। তিনি স্পষ্ট জানিয়েছেন যে নির্মম নির্যাতনের এই গোপন বন্দিশালা সরাসরি দেখানোর উদ্দেশ্য হলো বিচারিক কার্যক্রমে তা প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা। যারা এই বন্দিশালা ও এর আলামত আড়াল করার জন্য বিভিন্ন প্রমাণ নষ্ট করেছেন, তাদের কাউকেই আইনগত ছাড় দেওয়া হবে না।
পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের ব্রিফিংকালে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, সারা বিশ্ব যে আয়নাঘর সম্পর্কে শুনে আসছিল, সেটি আসলে কতটা নির্মল টর্চার সেল ছিল, তা সরজমিনে দেখার জন্য আমরা আজ এসেছিলাম। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রুল ৪৬ (এ) এবং রোম স্ট্যাটিউটের রুল ৭ ও ৭৩ অনুযায়ী এই বিচারিক পরিদর্শনের বিধান রয়েছে। তিনি জানান, পরিদর্শনে তারা ছোট-বড় মোট ২২টি কামরা খুঁজে পেয়েছেন। 
আমিনুল ইসলাম বলেন, সেখানে অত্যন্ত অমানবিক চিত্র আমরা দেখেছি। ২২টি কামরার মধ্যে ভিকটিমদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস এমনকি বছরের পর বছর আটকে রাখা হতো। ঘরগুলো এতটাই সরু যে একজন স্বাভাবিক মানুষের লম্বা হয়ে শোয়ার উপায় নেই।
তদন্তের বিষয়ে তিনি জানান, র‌্যাব কার্যালয়ের এই টিএফআই (টাস্ক ফোর্সেস ইন্টারোগেশন) সেলে অনেক কক্ষ দেয়াল দিয়ে ঢেকে তথ্য গোপনের চেষ্টা করা হয়েছিল।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, আমাদের ইনভেস্টিগেশন এজেন্সি (তদন্ত সংস্থা) এসে প্রথমে বিভ্রান্তিতে পড়েছিল। কিন্তু ভিকটিমদের বর্ণনার সঙ্গে যখন মিলছিল না, তখন সন্দেহ থেকে নতুন করে তোলা দেওয়ালগুলো শনাক্ত করা হয়। সেই স্ট্রাকচারগুলো (অবকাঠামো) সরানোর পর ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে আসে এবং আমরা কক্ষগুলোর সন্ধান পাই।
সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমেদ এবং ব্যারিস্টার আরমানকে এই সেলে আটকে রাখার প্রাথমিক প্রমাণ পাওয়ার দাবি করেন চিফ প্রসিকিউটর।
তিনি বলেন, এখন পর্যন্ত প্রায় ২৫০ জনের বেশি গুম হওয়া ব্যক্তির সন্ধান আমরা পাইনি। সালাহউদ্দিন আহমেদকেও এই র‌্যাব-১ এর কোনো এক কামরায় রাখা হয়েছিল বলে আমাদের প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
আইনি লঙ্ঘনের বিষয়ে আমিনুল ইসলাম বলেন, কাউকে গ্রেফতার করলে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আদালতে হাজির করার যে সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা (অনুচ্ছেদ ৩৩) এবং ফৌজদারি কার্যবিধির ৬১ ও ১৬৭ ধারা রয়েছে, এই আয়নাঘরের ক্ষেত্রে তার চরম লঙ্ঘন হয়েছে। এটি স্পষ্টতই মানবতাবিরোধী অপরাধ।
তিনি আরও জানান, কেবল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তারা নন, যারা সুপিরিয়র রেসপন্সিবিলিটিতে ছিলেন এবং যেসব রাজনৈতিক দল এই ফ্যাসিস্ট শাসনে সহায়তা করেছে, তাদের প্রত্যেককেই আইনের আওতায় আনা হবে। 
আগামী শনিবার সেনানিবাসের ভেতরে ডিজিএফআই-এর কার্যালয়ের ইন্টারোগেশন সেল (জিআইসি) পরিদর্শনের কথা রয়েছে বলেও জানান তিনি।
তদন্তের স্বচ্ছতা নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে চিফ প্রসিকিউটর বলেন, প্রসিকিউশন টিম সার্বক্ষণিক তদন্ত কার্যক্রম মনিটর করছে। আন্তর্জাতিক মান বজায় রেখেই সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হচ্ছে। এই পরিদর্শনের ওপর ভিত্তি করে একটি মেমোর্যান্ডাম তৈরি করা হবে, যা আদালতের বিচারের অংশ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ