খুলনা | বুধবার | ০৫ অগাস্ট ২০২৬ | ২০ শ্রাবণ ১৪৩৩

হত্যা হয়েছে অন্তত ২৪ ঘন্টা আগে * স্বজনদের মাঝে শোকের ছায়া

বাগেরহাটে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার, মরদেহের শরীরে আঘাতের চিহ্ন

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট |
০৪:১৪ পি.এম | ০৪ অগাস্ট ২০২৬


‎বাগেরহাটের কচুয়ায় নিজ বসতঘর থেকে একই পরিবারের তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। মঙ্গলবার দুপুরে কচুয়া উপজেলার রাড়ীপাড়া ইউনিয়নের চান্দেরকোলা গ্রামের ঘরের মধ্যে মরদেহ দেখতে পায় স্থানীয়রা। খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। দীর্ঘ পর্যবেক্ষণ শেষে রাত ৮টার দিকে মরদেহের সুরতহাল শেষ হয়। পরবর্তীতে ময়নাতদন্তের জন্য বাগেরহাট ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়।
নিহতরা হলেন চান্দেরকোলা গ্রামের মৃত আবদার আলী হাওলাদারের ছেলে আহাদ হাওলাদার (২৫), আহাদের মা মনিরা বেগম (৬০), আহাদের নানী রাশিদা বেগম (৯৩)। রাশিদা বেগম বাগেরহাট সদর উপজেলার বৃষ্টিপুর গ্রামের মৃত আব্দুর রশীদের স্ত্রী। কয়েকদিন আগে তিনি মেয়ের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন। মনিরা বেগমের স্বামী মারা গেছেন অনেক আগে। স্বামী মারা যাওয়ার পর দুই ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে এলাকায় থাকতেন। তার বড় ছেলে ফয়সাল ও মেয়ে রামিসা ঢাকায় থাকেন। আহাদ পল্লী বিদ্যুৎ সমিতিতে দিন মজুর (লাইন শ্রমিক) হিসেবে কাজ করতেন। আর মনিরা বেগম স্থানীয় সাইনবোর্ড বাজারে একটি হোটেলে কাজ করতেন।
সাইনবোর্ড-বগী আঞ্চলিক মহাসড়কের পাশে চান্দেরকোলা গ্রামের ছোট্ট ভাঙ্গাচোরা টিনের ঘরে থাকতেন মা ছেলে। দুই ছেলের জন্য একটি ভবন নির্মান শুরু করেছিলেন মা মনিরা বেগম। দুই কক্ষ বিশিষ্ট ভবনের বেশকিছু কাজ শেষ করলেও, পুরো কাজ শেষ হয়নি। তাই ভাঙ্গা চোরা টিনের ঘরে থাকতেন তারা। ওই টিনের ঘর ও কাঠের বেড়ার ফাঁকা দিয়েই পচা মরদেহের গন্ধ বের হচ্ছিল।
এদিকে একই পরিবারের তিনজনের এক সাথে মৃত্যুর খবরে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। চান্দোরকোলাসহ আশপাশ এলাকার কয়েক হাজার মানুষ ওই বাড়িতে জড়ো হয়। নিহতের স্বজনরাও বিভিন্ন স্থান থেকে আসেন খবর শুনে।
নিহতের নিকট আত্মীয় স্বপন নামের এক যুবক বলেন, “আমার দাদী (রাশিদা বেগম) খুব ধর্মপ্রাণ নারী। এখনও তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করেন। তাকে, আমার ফুফু ও ফুপাতো ভাইকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। তাদের শরীরে রক্তের দাগ, আঘাতের চিহ্ন, দাদীর চোখ বের হয়ে যাওয়ার মত হয়ে গেছে, দেখা যায় না। আজ দুই দিন তিনটা মানুষের কোন খোজ পাওয়া যায় না, আশাপাশের লোকজন কি দেখেনি, এই বলে বিলাপ করেন তিনি। এছাড়াও রাশিদা বেগমের কয়েকজন নাতনী এবং স্থানীয় বাসিন্দা রুহুল আমিন বলেন, আহাদ পল্লী বিদ্যুতের বিভিন্ন কাজ করতেন। এলাকার যে কেউ ডাকলেই চলে যেত। খুবই ভাল ছেলে ছিল। তাদের পুরো পরিবারসহ এভাবে কারা মারতে পারে! এটা আমাদের চিন্তার বাইরে। যারা মেরেছে, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেন এই ব্যবসায়ী।
মৃত্যুর খবর শুনে কচুয়া উপঝেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ আলী হোসেন, বাগেরহাটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মহিদুর রহমানসহ পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছেন।
এছাড়া বাগেরহাট জেলা গোয়েন্দা পুলিশ, কচুয়া থানা পুলিশ, পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) ও অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডির) একাধিক দল কাজ হত্যার রহস্য উদঘাটনে কাজ শুরু করেছে। তারা বসত ঘর, মরদেহ পযবেক্ষন ও স্থানীয় বাসিন্দাদের সাথে কথা বলেছেন। 
দুপুর থেকেই ঘটনাস্থলে থাকা কচুয়া থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মাহমুদ হাসান বলেন, মরদেহ ৩টি পছতে শুরু করেছে। কিছুটা গন্ধও ছেড়েছে। প্রতিটি মরদেহের শরীরে হাতুড়ি ও রডের আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। বিশেষ করে মাথায় আঘাতের চিহ্ন বেশি। শরীরের বিভিন্ন স্থান থেকে রক্তও বের হয়েছে। ধারণা করা হচ্ছে অন্তত ২৪ ঘন্টা আগে এই হত্যাকান্ডের ঘটনা ঘটেছে। এমনকি ২ দিন আগেও হত্যা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
রোববার থেকেই নিহতদের দেখা যায়নি বলে জানিয়েছেন তাদের একাধিক প্রতিবেশী। তবে নিকট আত্মীয় বা প্রতিবেশীদের সাথে অনেক ভাল সম্পর্ক না থাকায় কেউ খোঁজ খবর নেয়নি। তবে আজকে যখন মরদেহ পাওয়া যায় তখন এলাকায় সোরগোল পরে যায়।
বাগেরহাট পুলিশ সুপার হাসান মোহাম্মদ নাছের রিকাবদার বলেন, মরদেহগুলোর মাথায় আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। এ কারণে প্রাথমিকভাবে এটি হত্যাকাণ্ড বলে ধারণা করা হচ্ছে। এছাড়া ঘটনাটি দুই থেকে তিন দিন আগে ঘটতে পারে বলেও ধারণা করা হচ্ছে। বাড়িতে লোকজনের আনাগোনা না থাকায় বিষয়টি এতদিন কারও নজরে আসেনি। মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে মরদেহগুলো ময়নাতদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে। আগামীকাল ময়নাতদন্ত সম্পন্ন হবে। হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন ও হত্যাকারীদের শনাক্ত এবং আটক করতে পুলিশের একাধিক দল কাজ শুরু করেছে। এ ঘটনায় মামলা দায়েরের প্রস্তুতি চলছে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ