খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৬ অগাস্ট ২০২৬ | ২১ শ্রাবণ ১৪৩৩

ইরান যুদ্ধ ও দাবদাহের মধ্যেই তিন মাসে ৮ তেল কোম্পানির মুনাফা ৯৩ বিলিয়ন ডলার

খবর প্রতিবেদন |
০২:২১ পি.এম | ০৫ অগাস্ট ২০২৬

 

ইরান যুদ্ধের কারণে জ্বালানির দাম বেড়ে যাওয়া এবং জীবাশ্ম জ্বালানি নির্গমনজনিত জলবায়ু সংকটে প্রাণঘাতী তাপপ্রবাহের মধ্যেই বিশ্বের আটটি বড় তেল কোম্পানি মাত্র তিন মাসে ৯০ বিলিয়ন ডলারের বেশি মুনাফা করেছে।

এতে সৌদি আরামকো ও বিপির মতো তেল-গ্যাস কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে পরিবেশগত ক্ষতির দায় নেওয়া এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে দ্রুত রূপান্তরে অর্থ দেওয়ার দাবি নতুন করে জোরালো হয়েছে।

বিশ্লেষণে দেখা গেছে, জুনের শেষ পর্যন্ত তিন মাসে আরামকো, বিপি, শেল, ইকুইনর, টোটালএনার্জিস, এনিই, শেভরন ও এক্সনমোবাইল—এই আট কোম্পানি প্রায় ৯৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলি যুদ্ধ শুরুর পর বৈশ্বিক তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১২৬ ডলারের বেশি উঠে যাওয়ার পর এটিই ছিল প্রথম পূর্ণ আর্থিক প্রান্তিক (তিন মাস)।

গত বছরের একই সময়ে কোম্পানিগুলোর সম্মিলিত মুনাফা ছিল ৫০ বিলিয়ন ডলারের সামান্য কম। অর্থাৎ এক বছরে তা প্রায় দ্বিগুণ হয়েছে। হিসাব অনুযায়ী, বসন্তের ওই তিন মাসে কোম্পানিগুলো প্রতি মিনিটে ৭ লাখ ডলারের বেশি মুনাফা করেছে।

সবচেয়ে বেশি মুনাফা করেছে সৌদি আরবের রাষ্ট্রীয় তেল কোম্পানি আরামকো। তাদের ত্রৈমাসিক নিট আয় ৩৪ শতাংশ বেড়ে ৩৩ বিলিয়ন ডলারের বেশি হয়েছে। ইরানি ও হুথি বাহিনীর ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কোম্পানিটির অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও এই মুনাফা হয়েছে।

বিপি মঙ্গলবার এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ৫ দশমিক ৭৩ বিলিয়ন ডলার মুনাফার কথা জানিয়েছে, যা আগের তিন মাসের ২ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলারের দ্বিগুণেরও বেশি। শেল প্রায় ৯ দশমিক ৮৪ বিলিয়ন ডলার এবং ইকুইনর ৩ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে।

যুক্তরাষ্ট্রে শেভরন ১২ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার এবং এক্সনমোবাইল ১৪ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার মুনাফা করেছে। দুই কোম্পানির মুনাফা নিয়ে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও সমালোচনা করেছেন। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইরান যুদ্ধ থেকে কোম্পানি দুটি ‘অতিরিক্ত অর্থ উপার্জন’ করছে এবং জনগণের জন্য সেই মুনাফা ফেরত দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।

জ্বালানি কোম্পানিগুলোর বিপুল মুনাফার বিপরীতে জলবায়ু সংকটও আরও ভয়াবহ হয়ে উঠেছে। চলতি গ্রীষ্মে ইউরোপে ইতিহাসের সবচেয়ে ভয়াবহ তাপপ্রবাহ দেখা গেছে। মানবসৃষ্ট বৈশ্বিক উষ্ণায়ন ছাড়া এমন তাপপ্রবাহ ‘অসম্ভব’ ছিল বলে বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন। চরম তাপমাত্রায় প্রায় ২০ হাজার মানুষের মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে, যার মধ্যে শুধু মে ও জুনে যুক্তরাজ্যেই প্রায় ৩ হাজার জন মারা গেছেন।

দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানেও তাপমাত্রা ৪২ দশমিক ৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত উঠেছে। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলও জুলাইয়ে নজিরবিহীন তাপের মুখে পড়েছে।

জলবায়ু সংকটের কারণে ইউরোপে দীর্ঘ তাপপ্রবাহে মাটি শুকিয়ে গেছে এবং ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছে। এতে ভুট্টা, সূর্যমুখীসহ বিভিন্ন ফসলের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। ইউরোপে অন্তত ৯০ লাখ টন শস্য উৎপাদন কমতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।

শুষ্ক আবহাওয়ার কারণে ফ্রান্স, স্পেন, পর্তুগাল ও গ্রিসে ভয়াবহ দাবানল ছড়িয়ে পড়েছে। এতে বিলিয়ন বিলিয়ন ইউরোর ক্ষতি হয়েছে। উত্তর আমেরিকায় জুলাইয়ের দাবানলে কয়েক হাজার মানুষের মৃত্যুর সঙ্গেও তাপ ও বায়ুদূষণের সম্পর্ক পাওয়া গেছে।

দক্ষিণ এশিয়ায় জলবায়ু সংকট অতিবৃষ্টি ও আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। জুলাইয়ের শুরুতে বাংলাদেশের চট্টগ্রামে ২৪ ঘণ্টায় ৪০ সেন্টিমিটারের বেশি বৃষ্টিপাত হয়, যার ফলে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। পাকিস্তান ও ভারতেও বন্যা ও ভূমিধসে প্রাণহানি ঘটেছে। চীনেও ভারী বৃষ্টিপাতে বহু মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।

জাতিসংঘের জলবায়ুবিষয়ক প্রধান সাইমন স্টিয়েল বলেছেন, বিশ্বজুড়ে জলবায়ুজনিত দুর্যোগ ‘দুঃস্বপ্নের পর্যায়ে’ পৌঁছেছে। তার মতে, কয়লা, তেল ও গ্যাসের ব্যবহার দ্রুত কমিয়ে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বাড়ানো এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সুরক্ষা দেওয়াই এখন জরুরি।
সূত্র : দ্য গার্ডিয়ান 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ