খুলনা | শুক্রবার | ৩০ জুলাই ২০২১ | ১৫ শ্রাবণ ১৪২৮

মহানগরী খুলনার পাঁচটি প্রবেশ সড়কের চারটিই বেহাল!

এস এম আমিনুল ইসলাম |
১২:৪৩ এ.এম | ২৮ জুন ২০২১

দুই-তিন বছর আগে সড়কের অধিকাংশ স্থান থেকে বিটুমিন উঠে গিয়ে তৈরি হয় ছোট ছোট গর্ত। আর তা সংস্কার না হওয়ায় ধীরে ধীরে তা রূপ নেয় খানা-খন্দে। চলতি বর্ষা মৌসুমে ওই সব খানা-খন্দে বৃষ্টির পানি জমে হয়েছে জলাশয়ে। সেই জলাশয়ের মধ্যদিয়ে হেলে দুলে চলছে যানবাহন। অনেক সময় ইজিবাইকসহ ভ্যান-রিকশা উল্টে ঘটছে দুর্ঘটনা। নগরীতে প্রবেশের অন্যতম শিপইয়ার্ড সড়কের এমনই হাল।
সড়ক জুড়ে কোথাও নেই বিটুমিনের আস্তর। আগে সৃষ্ট গর্তগুলো বৃষ্টিতে ২-৩ ফুট চওড়া হয়েছে। কিছু কিছু স্থানে জমে আছে নরম কাদার স্তর। ফলে ভাঙাচোরা সড়কে কাঁদা-পানিতে নাকাল হচ্ছে মানুষ। নগরীতে প্রবেশের আরেকটি অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সংযোগ সড়কের চিত্র এমন।
শুধু শিপইয়ার্ড বা  সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সংযোগ সড়কই নয়, খুলনা মহানগরীতে পাঁচটি প্রবেশ সড়কের মধ্যে চারটিই এখন বেহাল। এ অবস্থায় নগরী খুলনাতে প্রবেশ-প্রস্থানে মানুষের পোহাতে হচ্ছে চরম দুর্ভোগ।
শিপইয়ার্ড সড়ক : ২০১০ সালে নগরের রূপসা ট্রাফিক মোড় থেকে শিপইয়ার্ডের সামনে দিয়ে খানজাহান আলী সেতু (রূপসা সেতু) পর্যন্ত চলে যাওয়া প্রায় ৪ কিলোমিটার সড়কটি প্রশস্তকরণ ও উন্নয়ন প্রকল্প হাতে নেয় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। ২০১৩ সালে প্রকল্পটি একনেক সভায় অনুমোদন মেলে। প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছিল ২০১৫ সালের জুন পর্যন্ত। পরে বাড়িয়ে ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত করা হয়। কিন্তু আট বছরে তিন দফায় মেয়াদ বাড়িয়েও এখনও প্রকল্প বাস্তবায়ন কাজ শুরু করা যায়নি। যার কারণে প্রকল্পের ব্যয় ৯৮ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ২৫৯ কোটি টাকায় এসে দাঁড়িয়েছে। সাথে সাথে বেড়েছে সড়কে খানা-খন্দ ও দুর্ভোগ। 
স্থানীয় বাসিন্দা নজরুল ইসলাম বিশাল জানান, এই সড়কের করুণ পরিণতি মানুষের কষ্ট ও যন্ত্রণা বহুগুণে বাড়িয়েছে। ইজিবাইক উল্টে প্রতিনিয়ত মানুষ আহত হচ্ছে। তবুও প্রয়োজনের তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে চলাচল করতে হচ্ছে। এলাকাবাসী দ্রুত এ সড়ক উন্নয়ন চান।
তবে প্রকল্পের পরিচালক মোঃ আরমান হোসেন বলেন, জেলা প্রশাসনের কার্যালয় থেকে এত দিন জমি বুঝিয়ে না দেওয়ায় প্রকল্পের কাজ শুরু করা যায়নি। এরপর প্রথম দফায় দরপত্র আহŸান করলেও মন্ত্রণালয় তা বাতিল করেছে। এ অবস্থায় ফের দরপত্র আহবান করা হয়েছে। এখন প্রক্রিয়া শেষে ঠিকাদার নিয়োগ হলে কাজ আরম্ভ করা যাবে।
সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সংযোগ সড়ক : শহরকে সম্প্রসারিত করার জন্য সোনাডাঙ্গা বাস টার্মিনাল সংলগ্ন সংযোগ সড়কটি নির্মানের উদ্যোগ নেয় খুলনা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (কেডিএ)। ২ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার লম্বা ওই সড়কটি নির্মাণে ব্যয় ধরা হয় প্রায় ১৮ কোটি টাকা। ২০১১ সালের ঢাকার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ডিয়েনকো লিমিটেড কাজ শুরু করে। দুই বছরেই শেষ হয় কাজ। এর কিছুদিনের মধ্যে সড়কের বিভিন্ন স্থানে বড় বড় গর্তের সৃষ্টি হয়। কয়েকবার মেরামত করেও তা টেকেনি। এখন এমন অবস্থা যে সড়কের বিটুমিনের আস্তর উঠে ছিটকে পড়ছে অন্যত্র। যান চলাচল ব্যাহত হচ্ছে প্রতিনিয়তই।
শেখ আবু নাসের হাসপাতাল বাইপাস লিংক রোড : গোয়ালখালীর বাস্তুহারা এলাকা থেকে সিটি বাইপাস পর্যন্ত ২ দশমিক ৩৭ কিলোমিটার সড়কের পাশে গড়ে উঠেছে শেখ আবু নাসের হাসপাতাল, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) সেক্টর সদর দপ্তর, নৌবাহিনীর ঘাঁটি (বানৌজা তিতুমীর), বিএনএন স্কুল এ্যান্ড কলেজ, এ্যাংকরেজ স্কুল, নৌবাহিনী ভর্তি কেন্দ্র, নাবিক কলোনি, পুলিশ লাইন, মুজগুন্নী শিশুপার্ক, ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, রায়েলমহল (অনার্স) কলেজ, নগর স্বাস্থ্যকেন্দ্রসহ সরকারি ও বেসরকারি নানা প্রতিষ্ঠান। এসব প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নগরীর বাইরে সহজ যাতায়াতের জন্য ২০০৩-০৪ অর্থবছরে শেখ আবু নাসের হাসপাতাল বাইপাস লিংক রোড। বর্তমানে খালিশপুর, দৌলতপুরসহ নগরীর পশ্চিম পাশের লোকজন নগরীতে প্রবেশ না করেই ওই সড়ক ব্যবহার করে শহরের বাইরে যেতে পারেন। তবে নির্মাণের পর সড়কটি সংস্কারে আর কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। ফলে অনেক আগেই বিটুমিন উঠে যাওয়ায় সড়কে কাদা-বালু জমে কাঁচা রাস্তার মতো হয়ে গেছে। এছাড়া রাস্তায় সৃষ্টি হওয়া গর্তে বৃষ্টির সময় জমে পরিণত হয়েছে ডোবায়। জনসাধারণকে চলাচলে চরম ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাই বলেন, ‘সংস্কারের অভাবে এ সড়ক চলাচলের অনুপযোগী হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমে সড়ক দিয়ে যেতে গেলে আটকা পড়ে গাড়ি। কোনোভাবেই যানবাহন বা পথচারী নির্বিঘœ চলাচল করতে পারছে না।’
গাড়িচালক সবুজ গাজী জানান, বর্ষা মৌসুমে গাড়ি চালিয়ে যাওয়ার সময় গর্তে চাকা আটকে যায়। অনেক সময় গাড়ি উল্টেও পড়ে। গাড়ির অনেক যন্ত্রাংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
কেডিএ’র নির্বাহী প্রকৌশলী মোরতুজা আল মামুন বলেন, ‘কাজ শেষ হওয়ার পরপরই খুলনা সিটি কর্পোরেশনের কাছে সড়ক দু’টি বুঝে নেয়ার জন্য দুইবার চিঠি দেয়া হয়। কিন্তু কোনো সাড়া মেলেনি। সর্বশেষ মে মাসের শেষের দিকে ফের চিঠি দেয়া হয়েছে। এবার আশা করা হচ্ছে সংস্কার হয়ে যাবে।’
খুলনা সিটি কর্পোরেশনের বৈষয়িক কর্মকর্তা নুরুজ্জামান তালুকদার জানান, কেডিএ’র দেয়া সড়ক বুঝে নেয়ার চিঠিতে সড়কের দৈর্ঘ্য-প্রস্থের উলে­খ নেই। সড়কের পাশে কোনো অবৈধ স্থাপনা আছে কি না, সে সম্পর্কেও সুস্পষ্ট কিছু বলা হয়নি। সড়কের পাশে ড্রেন নির্মাণ করা হয়নি। তাই এভাবে সড়ক দু’টি বুঝে নেয়া হয়নি। তবে নতুন চিঠির ব্যাপারে এখনও কোন সিদ্ধান্ত হয়নি।
গল­ামারী বাইপাস : নগরের ময়লাপোতা মোড় থেকে জিরো পয়েন্ট পর্যন্ত সড়কটি চার লেনে উন্নীত করা হচ্ছে। এ জন্য ২০২০ সালের ৮ এপ্রিল মাহবুব ব্রাদার্স নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্যাদেশ দিয়েছে সড়ক বিভাগ। এতে ব্যয় ধরা হয়েছে ৮০ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। চুক্তি অনুযায়ী চার কিলোমিটার সড়ক পুনঃনির্মাণ, পাঁচটি বক্স কালভার্ট ও দুই পাশে চার কিলোমিটার করে আট কিলোমিটার কংক্রিটের ড্রেন নির্মাণ ইত্যাদি নির্মাণ কাজ চলমান রয়েছে। 
সওজ বিভাগ খুলনার নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ আনিসুজ্জামান মাসুদ বলেন, ২০২২ সালের এপ্রিলের মধ্যে কাজ শেষ করবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ