খুলনা | সোমবার | ১০ অগাস্ট ২০২৬ | ২৬ শ্রাবণ ১৪৩৩

ঘাতক আপন খালাতো ভাই, নেপথ্যে নগদ টাকা ও অনৈতিক সম্পর্ক

খুলনায় আগুনে ঝলসানো কঙ্কালের নাকফুল দেখে গৃহবধূ রেশমা হত্যা রহস্য উন্মোচন

এন আই রকি |
০১:৪৪ এ.এম | ১০ অগাস্ট ২০২৬


২০২৫ সালের ১৮ এপ্রিল খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কের ডুমুরিয়া উপজেলায় একটি পানি বিশুদ্ধকরণ কারখানার পেছন থেকে এক অজ্ঞাত পরিচয় নারীর লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। আগুনে ঝলসে যাওয়া দেহটি রূপান্তরিত হয়েছিল কেবলই একখণ্ড কঙ্কালে। মাথার সামান্য অংশ দেখে শুধু এটুকু অনুমেয় ছিল এটি আনুমানিক ২০ থেকে ৩০ বছর বয়সী কোনো নারীর দেহ। আলামত দেখে প্রাথমিক ধারণা করা হয়, পরিকল্পিতভাবে অপরাধ ধামাচাপা দিতেই রাসায়নিক বা আগুন দিয়ে মরদেহ পুড়িয়ে এখানে ফেলে গেছে দুষ্কৃতকারীরা।
তবে থেমে থাকেনি তদন্ত। ধ্বংসস্তূপের মাঝে বেঁচে থাকা একটি নাকফুল, এক টুকরো ওড়না আর স্যান্ডেলকে সম্বল করে ঘটনার অন্তরালে পৌঁছাতে অভিযান শুরু করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। টানা চৌদ্দ মাসের নিবিড় তদন্ত, মোবাইল সিডিআর বিশে¬ষণ, থানায় জিডি অনুসরণ এবং নিখুঁত ডিএনএ পরীক্ষার পর অবশেষে উদঘাটিত হলো এই নৃশংসতার মূল রহস্য।
অনুসন্ধানে জানা যায়, অর্থলোভ ও অনৈতিক সম্পর্কের পথ ধরে খুলনার টুটপাড়া এলাকার আলতাফ হোসেনের মেয়ে গৃহবধূ রেশমা খাতুন খুন হন তাঁরই আপন খালাতো ভাই ব্যাটালিয়ন আনসার সদস্য মোঃ আবুল কালামের হাতে। পরবর্তীতে অপরাধ উন্মোচনের খবর পেয়ে বিষপান করে আত্মহত্যার পথ বেছে নেন এই ঘাতক।
একটি নাকফুল ও ডিএনএ পরীক্ষার মেলবন্ধন : লাশ উদ্ধারের পর খুলনা, সাতক্ষীরা ও যশোর অঞ্চলের সব থানায় নিখোঁজ সংক্রান্ত জিডির খোঁজে নামে পিবিআই। এরই মধ্যে রেশমার ভাই সাইফুল ইসলাম পিবিআই কার্যালয়ে এসে কঙ্কালের সাথে পাওয়া নাকফুল ও ওড়নাটি দেখে তাঁর নিখোঁজ বোনের বলে দাবি করেন। পরবর্তীতে রেশমার মা ও ভাইয়ের ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর তা পরীক্ষা করা হলে লাশের ডিএনএর সঙ্গে হুবহু মিলে যায়। একই সাথে সিডিআর পরীক্ষায় দেখা যায়, নিখোঁজের সময় রেশমার ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি ওই এলাকায় সক্রিয় ছিল। পরিচয় নিশ্চিত হলেও ঘাতকের মুখোস উন্মোচন করাটা ছিল পিবিআইয়ের জন্য এক কঠিন মনস্তাত্তি¡ক ও কারিগরি চ্যালেঞ্জ।
রহস্যের জট খুলল প্রযুক্তির ছোঁয়ায় : ঘটনার গভীরে প্রবেশ করতে মহাসড়কের ওই নির্দিষ্ট স্থানে স্বজনদের মোবাইল নেটওয়ার্কের উপস্থিতি বিশ্লে¬ষণ করতে শুরু করেন তদন্তকারীরা। দেখা যায়, ঘটনার সময়েই সেখানে অবস্থান করছিল রেশমার আপন খালাতো ভাই আবুল কালামের মোবাইল ফোন। অথচ একই আবুল কালাম নিহত রেশমার অপর ভাই সাইফুল ইসলামকে সঙ্গে নিয়ে সদর থানায় জিডি করা থেকে শুরু করে বিভিন্ন স্থানে বোনকে খুঁজে বেড়ানোর অভিনয় করে আসছিল।
তদন্তে আরও বেরিয়ে আসে, ২০২৫ সালের ১৭ এপ্রিল জমি কেনাবেচার কথা বলে রেশমাকে নিয়ে ডুমুরিয়া রেজিস্ট্রি অফিসের উদ্দেশ্যে রওনা দেন আবুল কালাম। সে সময় রেশমার কাছে ছিল নগদ ৪ লাখ টাকা। ওইদিন সন্ধ্যায় কালাম একা বাড়ি ফিরে পরিবারকে জানান, রেশমা বিদেশে চলে গেছেন। কিন্তু একই স্থানে দু’জনের মোবাইলের উপস্থিতি পিবিআইয়ের সন্দেহের তীর কালামের দিকেই নির্দেশ করে।
ঘাতকের বিষপান ও নির্মমতার সত্যতা : গত বছরের ২৮ অক্টোবর পিবিআইয়ের একটি বিশেষ টিম রাঙ্গামাটির বরইছড়ি কাপ্তাই শিলছড়ী আর্মি ক্যাম্পে অভিযান চালায় মূল আসামিকে গ্রেফতারের লক্ষ্যে। পুলিশ আসার খবর টের পেয়ে কালাম বিষপান করে আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনী ও আনসার সদস্যরা তাঁকে উদ্ধার করে রাঙ্গামাটি সদর হাসপাতালে ভর্তি করলে ৩ নভেম্বর সকালে তাঁর মৃত্যু হয়।
পিবিআইয়ের চূড়ান্ত তদন্ত নিশ্চিত করে, ১৭ এপ্রিল কালাম রেশমাকে ডুমুরিয়ায় নিয়ে যান। টাকা আত্মসাৎ করার পর ধারালো অস্ত্র দিয়ে কুপিয়ে ও দুই হাতের কব্জির রগ কেটে নৃসংশভাবে রেশমাকে হত্যা করা হয়। এরপর প্রমাণ লোপাটে মাথা ছাড়া পুরো শরীরে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ঘটনাটি ঘটিয়ে কালাম নিজের ব্যবহৃত একটি নীল রঙের ১৫০ সিসি পালসার মোটরসাইকেল নিয়ে পালিয়ে যান, যা পরবর্তীতে উদ্ধার করেছে পুলিশ।
তদন্তকারীদের প্রতিক্রিয়া : মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা পিবিআই ইন্সপেক্টর আনোয়ার হোসেন জানান, “আনসার সদস্য আবুল কালামের সাথে রেশমার পরকীয়ার সম্পর্ক ছিল। মৃত্যুর আগে রেশমার কাছে থাকা ৪ লাখ টাকার লোভ এবং এই সম্পর্কের জটিলতা থেকেই হত্যার পরিকল্পনা। অভিযুক্ত আসামি নিজেই আত্মহত্যা করায় গত ৩০ জুন আদালতে চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করা হয়েছে।”
পিবিআই খুলনা জেলা সুপার রেশমা শারমিন বলেন, “লাশটির প্রায় পুরোটাই পুড়ে কঙ্কাল হয়ে গিয়েছিল। একখণ্ড নাকফুল ও মায়ের চেনা ওড়না সম্বল করেই আমরা তদন্তের যাত্রা শুরু করি। উদ্ধার হওয়ার দুই দিন পর ডুমুরিয়া থানায় মামলা দায়ের হলে হেডকোয়ার্টার্সের নির্দেশে তদন্তভার গ্রহণ করি। যেহেতু মূল আসামি তদন্ত চলাকালে আত্মহত্যা করেছে, তাই তাঁকে অব্যাহতি দিয়ে আদালতে অন্তিম প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে। কেবল কঙ্কাল থেকে পরিচয় শনাক্ত করে সত্য উন্মোচন করা এক বিশাল চ্যালেঞ্জ ছিল, যা সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় দ্রুত সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে।”

প্রিন্ট

আরও সংবাদ