খুলনা | সোমবার | ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

নগরীর সর্বত্র রাস্তার পাশে উন্মুক্ত স্থানে খাদ্য তৈরি

ধুলোবালি জীবাণুপূর্ণ নোংরা খাবারেই ভরছে সবার পেট : দেখার কেউ নেই

শামিম আশরাফ শেলী |
০২:১১ এ.এম | ১২ অগাস্ট ২০২৬


খুলনা মহানগরীর শত শত হোটেল রেস্টুরেন্টে পরিচ্ছন্ন ও জীবাণু মুক্ত পরিবেশে যাতে খাদ্য তৈরি ও পরিবেশন নিশ্চিত হয় সেজন্য নগর কর্তৃপক্ষ স্যানিটারী অফিসার নিয়োগ দিয়েছে, অথচ পিকচার প্যালেস মোড়, ডাকবাংলা মোড়, ফেরিঘাট মোড়, সাত রাস্তা মোড়সহ নগরীর সর্বত্র রাস্তার পাশে উন্মুক্ত স্থানে খাদ্য তৈরি, মজুত ও পরিবেশন করছে রেস্টুরেন্টগুলো। নগরবাসীর প্রশ্ন, নগরীতে স্যানিটারী ব্যবস্থা বলে কিছু কি অবশিষ্ট আছে?
খুলনা মহানগরীর প্রাণকেন্দ্রসহ বিভিন্ন এলাকা সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায় বিপুল সংখ্যক হোটেল-রেস্টুরেন্ট রান্নাঘর বাদ দিয়ে রাস্তার পাশেই স্থায়ী এবং অস্থায়ী চুলা বসিয়ে খাবার তৈরি করছে। যার পাশ দিয়ে হাজার হাজার মানুষ ও যানবাহন চলাচল করছে। এতে ধুলো ও রোগজীবাণু উড়ে উড়ে ওই খাদ্যের মধ্যে মিশে যাচ্ছে এবং সাধারণ মানুষ সেই খাদ্যই গো-গ্রাসে গিলছে। অন্যদিকে এসকল রেস্টুরেন্টের ভিতরে যে রান্নাঘর এবং প্রক্ষালন স্থান আছে তার অধিকাংশই চরম নোংরা আর জীবানু যুক্ত পরিবেশের। 
নগরবাসির অভিযোগ, নগর কর্তৃপক্ষ নগরের ড্রেন পরিস্কার করার সময় ড্রেনের সকল বর্জ্য রাস্তায় তুলে রাখে। পরে সেখান থেকে বর্জ্য ট্রাকে করে নিয়ে গেলেও অনেকটাই রাস্তায় থেকে যায়। যা ধুলো হয়ে উড়তে থাকে এবং রাস্তার পাশে যে সকল রেস্টুরেন্ট খাবার তৈরি করে সেই সব খাবারের মধ্যে মিশে যায়। ফলে নগরবাসী প্রকারান্তরে এ সকল খাবারের সাথে ড্রেনের বর্জ্যও খাচ্ছে। যা স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূণর্, সম্পূর্ণ বে-আইনী ও দণ্ডনীয় অপরাধ, কিন্তু এটা দেখার কেউ নেই! 
এছাড়া সমগ্র নগরীতে আছে বিপুল সংখ্যক সস্তা ধরনের ছাপড়া হোটেল। যেখানে বিভিন্ন ধরনের তেলেভাজা খাবারসহ ভাত মাছ বিক্রি হয়। এ সকল ছাপড়া হোটেলের পরিবেশ জঘন্য নোংরা ও পুতিগন্ধময় এবং যা প্রায়ই ড্রেনের পাশে অবস্থিত। সেখানেই চলছে রান্নাবান্না সেখানেই চলছে খাওয়া দাওয়া, যেখানে পরিচ্ছন্নতার প্রবেশ নিষেধ। যদিও তাদের দাবি সেখানেও স্যানিটারী অফিসারগণ নিয়মিত পরিদর্শন করেন এবং তাদের সন্তুষ্ট করে অনুমোদনও পান।
এ সকল হোটেল-রেস্টুরেন্টের ক্রেতাদের অভিযোগ, এখানে আর যা-ই হোক নিরাপদ ও জীবাণু মুক্ত খাদ্য পাওয়া সম্ভব নয়, কারণ এরা প্রকাশ্যেই ধুলোবালি ও জীবাণুর মধ্যে খাদ্য তৈরি করছে। তা হলে কিনছেন কেন জানতে চাইলে তারা বলেন, উপায় কি খেতে তো হবে, সব জায়গায়ই একই পরিবেশ, জনগণের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখার কেউ নেই, তাই ক্রেতারা এই পরিস্থিতির কাছে জিম্মি।
রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় খাবার তৈরি হচ্ছে এতে খাবারের মধ্যে ধুলোবালি রোগের জীবাণু মিশে যাচ্ছে কি-না আর তাতে ক্রেতাদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির মুখে পড়ছে কি-না এ সকল বিষয় জানতে চাইলে নগরীর পিকচার প্যালেস মোড়ের পূর্বপাশে^র রেস্টুরেন্ট মালিক মনির হোসেন এ প্রতিবেদককে বলেন,“ এতে কোন সমস্যা নেই, আমরাতো খাচ্ছি কোন অসুবিধা হচ্ছে না।”
বিপরীত পার্শে^র হোটেল মালিক মইনুল ইসলাম বলেন, “সকলেই এভাবে তৈরি এবং বিক্রি করছে আমরাও করছি, এতে খাদ্যের মান নষ্ট হয় না এবং কোন স্বাস্থ্য ঝুঁকিও নেই।” হোটেল মালিকদের দাবি, তাদের পরিবেশ যথেষ্ট পরিস্কার পরিচ্ছন্ন আছে যা নিশ্চিত করেছেন স্যানিটারী অফিসারগণ, যারা নিয়মিত তাদের প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করেন এবং তারা তাদের ব্যবস্থাপনায় সন্তুষ্ট।
এ সকল বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক খুলনা সিটি কর্পোরেশনের একাধিক স্যানিটারী ইন্সপেক্টরের সাথে আলাপকালে তারা এ প্রতিবেদককে বলেন,“ আমরা নিয়মিত নগরীর সকল হোটেল-রেস্টুরেন্ট পরিদর্শন করি এবং নোংরা ও খোলা পরিবেশে যাতে খাবার তৈরি ও পরিবেশন না করে তার জন্য নোটিশও প্রদান করি। মাঝে মাঝে জরিমানাও করি কিন্তু তারপরও এসব বন্ধ করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। তারা সব ধরনের অবৈধ লেনদেনের কথাও অস্বীকার করেন।”
এ সকল বিষয়ে আলাপ হয় বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের জেলা খাদ্য নিরাপত্তা অফিসার মোঃ মোখলেসুর রহমানের সাথে। তিনি বলেন, “আমরা নিয়মিত নগরীর হোটেল-রেস্টুরেন্ট ছাপড়া দোকান সবই পরিদর্শন করি এবং তাদের সচেতন করার চেষ্টা করি। তারা যেন স্বাস্থ্যসম্মত পদ্ধতি অনুসরণ করে নিরাপদ ও জীবাণু মুক্ত খাদ্য তৈরি ও পরিবেশন করেন। তবে তারা আমাদের কথা না শুনলে আমাদের কিছু করার নেই , কারণ সরকার এ ব্যাপারে অপরাধিদের কোন শাস্তি দেওয়ার অধিকার আমাদের দেয়নি!”
এ সকল বিষয়ে জানতে চাইলে খুলনা ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক বলেন, “রাস্তার পাশে খোলা জায়গায় খাবার তৈরি এবং বিপণন ভোক্তার স্বাস্থ্যঝুঁকির কারণ এবং দণ্ডনীয় অপরাধ। এ ব্যাপারে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ