খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৭ জানুয়ারী ২০২২ | ১৪ মাঘ ১৪২৮

১২ বছরে ১৩৭২ কোটি টাকা ব্যয়ে ১৫ উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন

উন্নয়ন ও নানা ঘটনায় ২০২১ পার করলো মোংলা বন্দর

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
০১:২০ এ.এম | ০১ জানুয়ারী ২০২২


উন্নয়ন আর নানা ঘটনায় ২০২১ পার করেছে মোংলা বন্দর। এক সময়ের মৃত্য মোংলা সমুদ্র বন্দর আজ বিশ্ব বানিজ্যিক বাজারে সুনাম অর্জন করা এ বন্দরটি লাভ জনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে। এ বন্দরকে নতুন সাজে সাজিয়ে তুলতে ও বন্দর উন্নয়নের জন্য গত ১২ বছরে গুরুত্বপূর্ণ ১৫টি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়েছে। এছাড়াও বন্দরের কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং এবং ব্যাবসায়ীদের কার্যক্রমের সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষে বন্দরের জন্য শীর্ষ বেশ কয়েকটি প্রকল্পের অধীনে মোট ৭৫টি ইকুইপমেন্ট ক্রয় করেছেন বন্দর কর্তৃপক্ষ। আর চলতি অর্থ বছরে বন্দর উন্নয়ন ও আমদানি-রপ্তানীকারকদের ব্যবসা বান্ধব বন্দর গড়তে আরও ৯টি প্রকল্প চলমান। যা থেকে ৩টি প্রকল্পের কাজ ইতোমধ্যে শেষ হলেও বাকিগুলো চলতি অর্থ বছরের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা রয়েছে। 
তবে এ বন্দরে ঘটেছে নানা ঘটনা। বন্দরের অভ্যন্তরে আমদানিকৃত গাড়ি, দেশি-বিদেশি মূল্যবান মালামাল ও যন্ত্রাংশ চুরি, মাদকসহ নিষিদ্ধ পণ্য আমদানি করা মালামাল চুরিসহ বেশ কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। 
বন্দর সূত্রে জানা যায়, ৯০ দশকের মোংলা সমুদ্র বন্দর (ডেট পোর্ট) অর্থাৎ মৃত বন্দর হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন সরকার। সে সময় মোংলা বন্দরে কোন কোন মাসে জাহাজ শূন্য মোংলা বন্দর হিসেবে বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল ব্যবসায়িক আমদানি-রপ্তানির খবর। কাজ না থাকায় বন্দরের অনেক শ্রমিক তাদের পেশা পরিবর্তন করে অন্যত্র গিয়ে কাজ করে বেঁচে ছিল তাদের পরিবার পরিজন নিয়ে। না খেয়েও অনেক শ্রমিক অর্ধাহারে অনাহারে দিন যাপন করতেছিল এখানকার জাহাজে খালাস-বোঝাই কাজের সাথে সংশ্লিষ্ট শ্রমিকরা।   
পরে আওয়ামী সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ বন্দরকে সচল করার উদ্যোগ নেয় বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ২০০৯-২০২১ সাল পর্যন্ত এ বন্দরকে উজ্জীবিত করতে দেশের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সমুদ্র বন্দর মোংলাকে উন্নয়নে বর্তমান সরকারের অগ্রাধিকার ভিত্তিক ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়েছে। গত ১২ বছরে এসব প্রকল্পগুলো সমাপ্ত করতে সরকারের ব্যয় হয়েছে মোট ১ হাজার ৩৭২ কোটি ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা। যার ফলে বর্তমান সরকারের সময় এবং উন্নয়ন প্রকল্পের সংখ্যা হিসেবে (জিওবি অর্থায়নে) এবং বরাদ্দে নৌ-পরিবহন মন্ত্রণালয়ের দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে মোংলা সমুদ্র বন্দর। এ থেকেই মোংলা সমুদ্র বন্দরকে আর পিছনের দিকে তাকাতে হয়নি, এগিয়ে গিয়ে একটি ব্যবসা বান্ধব লাভজনক ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে মোংলা সমুদ্র বন্দর। 
এছাড়া বর্তমানে বন্দরের অভ্যন্তরে জেটি এলাকায় কন্টেইনার ও কার্গো হ্যান্ডলিং-এর সক্ষমতা বৃদ্ধির লক্ষে মোংলা বন্দরের জন্য অত্যাবশ্যকীয় যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদি সংগ্রহ শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে মোট ৭৫টি ইকুইপমেন্ট ক্রয় করা হয়েছে যা বন্দরের সক্ষমতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখছে।
মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের পরিকল্পনা প্রধান মোঃ জহিরুল হক জানান, ২০০৯ সালের মে মাস হতে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়ে মোংলা বন্দরের উন্নয়নে ১ হাজার ৩৭২ কোটি ৬৭ লাখ ৩১ হাজার টাকা ব্যয়ে মোট ১৫টি উন্নয়ন প্রকল্পের কাজ বাস্তবায়ন করা হয়েছে। এছাড়া বন্দরে ৯ দশমিক ৫ থেকে ১০ মিটার ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডলিং-এর জন্য ৭শ’ কোটি টাকা ব্যয়ে আউটার বারে ড্রেজিংয়ের কাজ সমাপ্ত করা হয়েছে এবং ৭৯৪ কোটি টাকা ব্যয়ে ইনার বারে ২৩ কিলোমিটার ড্রেজিংয়ের কাজ চলমান রয়েছে। আউটারবারে ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হওয়ায় মোংলা বন্দরের প্রথম সীমানা বঙ্গোপসাগর মোহনা অ্যাংকারেজে বয়া থেকে ইতোমধ্যে ৯ মিটারের অধিক ড্রাফটের জাহাজ হ্যান্ডেল করা সম্ভব হচ্ছে।
তবে এ সময় বিচ্ছিন্ন ভাবে ঘটেছে নানা ঘটনা। ব্যবসায়ীদের আমদানি করা মূল্যবান পণ্য জেটি এলাকা থেকে গায়েব হওয়ার মত ঘটনা রয়েছে। যেমন, ২০১৮ সালে ৪ জুন বন্দর কর্তৃপক্ষের জেটির অভ্যন্তরের ৫নং সেডে থাকা একটি প্রাডো জীপ গাড়ি চুরি করে নিয়ে যায় জনৈক এক ব্যক্তি। যার মূল্য প্রায় দেড় থেকে দুই কোটি টাকা। জেটির অভ্যন্তরে সিসি ক্যামেরা ও পর্যাপ্ত সিকিউরিটি থাকা সত্তে¡ও কন্টেইনার ভর্তি আমদানি করা মূল্যবান কাপড় কন্টেইনার খুলে নিয়ে যায় পাচারকারীরা। এছাড়া বন্দরের চ্যানেলে জাহাজে চুরি, পণ্য চুরি, মালামাল ও যন্ত্রাংশ চুরিসহ অনেক ঘটনাই ঘটেছে এ বন্দরে। কিছু কালো তালিকাভুক্ত ব্যবসায়ীরা ভুয়া কাগজপত্রে বিদেশী মদসহ নিষিদ্ধ পণ্যও আমদানির সুযোগ নিয়েছে। তবে এদের বিরুদ্ধে মামলা করেছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। 
তবে সফলতার ব্যাপারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান রিয়ার এডমিরাল মোহাম্মদ মুসা বলেন, কোভিড-১৯ নামক মহামারির মধ্যে সারাদেশে যখন ব্যবসা বাণিজ্য স্থবির হয়ে পড়েছিল তখন মোংলা সমুদ্র বন্দর লক্ষ্যমাত্রা অতিক্রম করে ২০২০-২০২১ অর্থবছরে ৯৭০টি দেশি-বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ আগমন ঘটেছে এ বন্দরে। যার মাধ্যমে ১শ’ ১৯ দশমিক ৪৫ লাখ মেট্রিকটন কার্গো, ৪৩ হাজার ৯৫৯ টিইইউজ কন্টেইনার হ্যান্ডেল করা এবং পন্য আমদানি-রপ্তানি করা সম্ভব হয়েছে এ মোংলা সমুদ্র বন্দরের মাধ্যমে। যাতে এক সময়ের লোকসানের স্থানে ৩শ’ ৪০ কোটি টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে, যা বন্দরের পূর্বের ৭০ বছরের ইতিহাসের সর্বোচ্চ রেকর্ড অর্জন করেছে পরিবেশ বান্ধব ও ব্যবসায় সাফল্যের সম্ভাবনাময় এ বন্দরটি। 
তিনি আরো বলেন, বন্দর কেন্দ্রিক অন্যান্য অবকাঠামোসহ পদ্মা সেতু নির্মিত হলে রাজধানী ঢাকার সাথে মোংলা বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ স্থাপিত হবে। যার ফলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী ও আমদানি-রপ্তানিকারক ব্যবসায়ীরা এ বন্দর ব্যবহার বহুগুণে বেড়ে যাবে। এ বিবেচনায় ভবিষ্যত চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার জন্য বন্দরকে আরো সক্ষম করে তোলার প্রয়োজনীয় সকল পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে বর্তমান সরকার ও সহায়তা করছে কর্তৃপক্ষ বলে জানায় বন্দরের এ শীর্ষ কর্মকর্তা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ