খুলনা | শনিবার | ১৫ অগাস্ট ২০২৬ | ৩০ শ্রাবণ ১৪৩৩

নিরাপত্তার হুমকিতে দক্ষিণাঞ্চলের গণমাধ্যম কর্মীরা

এসএম জাহিদ |
০২:০০ এ.এম | ১৫ অগাস্ট ২০২৬


খুলনাঞ্চলে গত তিন দশকে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের হামলায় কমপক্ষে ১ ডজন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। স¤প্রতি সাংবাদিকদের ওপর একের পর এক বর্বরোচিত হামলা, হুমকি এবং গুলি বর্ষণের ঘটনা আশঙ্কাজনক ভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে, যা স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের পেশাগত নিরাপত্তা চরম হুমকির মুখে ফেলেছে। সা¤প্রতিক মাসগুলোতে এই অঞ্চলে কর্মরত সাংবাদিকদের লক্ষ্য করে একাধিক সহিংস আক্রমণ চালানো হয়েছে।
সর্বশেষ খুলনা থেকে প্রকাশিত দৈনিক প্রবাহ অফিসে হামলা চালিয়েছে দুর্বৃত্তরা। গত রোববার দিবাগত রাত ২টার দিকে এ হামলার ঘটনা ঘটে। এ সময় দুর্বৃত্তরা পত্রিকার চিফ পেস্টারম্যান ফয়সাল আহমেদকে মারধর করে। সোমবার সকালে পুলিশ খবর পেয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে। এ নিউজ লেখা পর্যন্ত পুলিশ কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। 
গত ১৫ জুলাই খুলনা মহানগরীর জাতিসংঘ শিশু পার্কের পাশে একটি চা স্টলে বসে থাকা অবস্থায় দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড, এসএটিভি, এবং স্টার নিউজ-এর ব্যুরো প্রধানসহ ছয়জন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তরা গুলি চালায়। এই ঘটনায় অলৌকিক ভাবে তারা বড় ধরনের ক্ষতি থেকে বেঁচে গেলেও একজন সাংবাদিক সামান্য আহত হন। এপ্রিল ২০২৬-এ একদল উগ্র দুর্বৃত্ত সরাসরি খুলনা প্রেসক্লাবে প্রবেশ করে কর্মরত সাংবাদিকদের শারীরিক ভাবে লাঞ্ছিত ও অপদস্ত করে। এই ঘটনার প্রতিবাদে স্থানীয় সাংবাদিকরা খুলনা-যশোর মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ প্রদর্শন করেন।
খুলনা নগরীর জাতিসংঘ শিশুপার্কের পশ্চিম পাশে ৪ জন সাংবাদিককে লক্ষ্য করে সংঘটিত চাঞ্চল্যকর গুলিবর্ষণের ঘটনায় এখন পর্যন্ত অপরাধীদের শনাক্ত বা গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দীর্ঘসূত্রতায় ক্ষোভ ও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন খুলনায় কর্মরত সাংবাদিকরা। এ ঘটনায় জড়িত দুর্বৃত্তদের দ্রুত বিচারের আওতায় আনার দাবিতে খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়নের (এমইউজে) পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও তথ্য মন্ত্রীর কাছে স্মারকলিপি প্রদান করা হয়েছে।
সূত্রমতে, খুলনাঞ্চলে গত তিন দশকে সন্ত্রাসী ও চরমপন্থীদের হামলায় প্রায় ১২ জন সাংবাদিক হত্যাকান্ডের শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে আলোচিত হত্যাকান্ডের মধ্যে রয়েছে নহর আলী। যিনি দৈনিক অনির্বাণের ডুমুরিয়া উপজেলা প্রতিনিধি ছিলেন। ২০০১ সালের ১৮ এপ্রিল রাতে সন্ত্রাসীদের হামলায় নিহত হন তিনি। হারুন অর রশিদ ছিলেন দৈনিক পূর্বাঞ্চলের ক্রাইম রিপোর্টার। ২০০২ সালের ২ মার্চ দায়িত্ব পালন শেষে বাড়ি ফেরার পথে সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত হন। দৈনিক অনির্বাণের অপরাধ বিষয়ক প্রতিবেদক শুকুর হোসাইনকে ২০০২ সালের ৫ জুলাই অপহরণের পর গুলি করে হত্যা করা হয়। খুলনার প্রথিতযষা সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহা দৈনিক সংবাদ ও নিউ এজ এর সিনিয়র রিপোর্টার এবং বিবিসি বাংলার প্রতিনিধি। ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি খুলনা প্রেসক্লাবের অদূরে  দিবালোকে চরমপন্থীদের বোমা হামলায় নিহত হন তিনি। একুশে পদক প্রাপ্ত সাংবাদিক এবং দৈনিক জন্মভ‚মি পত্রিকার সম্পাদক হুমায়ুন কবীর বালু ২০০৪ সালের ২৭ জুন তার অফিস ও বাসভবনের সামনে বোমা হামলায় নিহত হন। এছাড়া সাহসি সাংবাদিক দৈনিক সংগ্রামের খুলনা ব্যুরো প্রধান শেখ বেলাল উদ্দিন প্রেসক্লাবের ভেতরেই পেতে রাখা বোমা বিস্ফোরনে নিহত হন। সাংবাদিক দীপঙ্কর চক্রবর্তী ২০০৪ সালে সন্ত্রাসীদের হাতে নিহত হন। ইমদাদুল হক মিলন শলুয়া প্রেসক্লাবের সভাপতি ও অনলাইন নিউজ পোর্টালের সম্পাদক ছিলেন। ২০২৫ সালের ১৮ ডিসেম্বর রাতে আড়ংঘাটার শলুয়া বাজারে সন্ত্রাসীরা মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি বর্ষণের ঘটনায় নিহত হন। খুলনাঞ্চলের এই সাংবাদিক হত্যাকান্ড গুলোর বেশির ভাগের পেছনেই সক্রিয় আন্ডার গ্রাউন্ড চরমপন্থী দল গুলোর সম্পৃক্ততা ছিল।
স¤প্রতি ঘটনাগুলোর পর খুলনা প্রেসক্লাব, খুলনা মেট্রোপলিটন সাংবাদিক ইউনিয়ন এবং খুলনা জেলা সাংবাদিক ফোরামের পক্ষ থেকে তীব্র নিন্দা জানানো হয়েছে। জাতীয় মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) খুলনায় সাংবাদিকদের ওপর এই ধরনের ক্রমাগত হামলার ঘটনায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার জোরালো দাবি জানিয়েছে। মানবাধিকার ও সুশীল সমাজ সংস্থাগুলো এসব ঘটনাকে স্বাধীন সাংবাদিকতা ও মুক্ত চিন্তার ওপর সরাসরি আঘাত বলে অভিহিত করেছে। স্থানীয় সাংবাদিকদের অভিযোগ ঘটনার দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেলেও মূল অপরাধীরা গ্রেফতার না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেশি বেপরোয়া হয়ে উঠছে। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা রক্ষা এবং সাংবাদিকদের জীবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে খুলনা অঞ্চলের সাংবাদিক সমাজ প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ এবং নিরাপদ কর্ম পরিবেশের দাবি জানিয়ে আসছে।
খুলনায় সন্ত্রাসী দ্বারা নিহত আলোচিত সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহা, হুমায়ুন কবির বালু, হারুন-অর রশীদ, শেখ বেলাল উদ্দিন ও নহর আলী। নিরাপত্তার কারণে এসব হত্যাকান্ডের মামলায় বেশির ভাগেরই বাদী হননি নিহত পরিবারের কেউ। খুলনায় পাঁচ সাংবাদিককে হত্যার বিচার শেষ হয়েছে। তবে কারা এবং কেন তাঁদের হত্যা করা হয়েছে, সেটি কেউ জানতে পারেনি। সাংবাদিক পরিবারের সদস্যরা মনে করেন, পুলিশের দুর্বল তদন্ত প্রতিবেদন ও ত্র“টিপূর্ণ অভিযোগ পত্রের কারণে হত্যা মামলার আসামিদের সর্বোচ্চ সাজা হয়নি, মূল হোতাদেরও চিহ্নিত করা যায়নি।
খুলনায় ২০০৪ সালের ১৫ জানুয়ারি সন্ত্রাসীদের বোমা হামলায় নিহত হন দৈনিক সংবাদ এর সাংবাদিক মানিক চন্দ্র সাহা। খুলনা প্রেসক্লাবের মাত্র ৫০ গজ দূরে বোমা মেরে মানিক সাহাকে হত্যার দুইদিন পর খুলনা সদর থানার পুলিশ বাদী হয়ে হত্যা মামলা করে ছিল। পরে বিস্ফোরক মামলাও দায়ের করে সদর থানা পুলিশের একজন উপ-পরিদর্শক (এসআই)। ২০১৬ সালের ৩০ নভেম্বর আদালত ১১ আসামির ৯ জনকে যাবজ্জীবন সশ্রম কারাদণ্ড দেন। একই সঙ্গে ওই ঘটনায় বিস্ফোরক দ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে দায়ের হওয়া মামলার ১০ আসামির সবাই খালাস পান। ওই রায়ে খুলনার সাংবাদিক সমাজ ও নিহত ব্যক্তির পরিবারের কেউই সন্তুষ্ট ছিল না।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ