খুলনা | শুক্রবার | ২১ অগাস্ট ২০২৬ | ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

যশোরে ‘ভুল’ নকশায় আট সেতু : স্থায়ী সমাধান ও দোষীদের সাজা জরুরি

|
১১:৫৮ পি.এম | ২০ অগাস্ট ২০২৬


যশোরের তিন উপজেলায় চারটি নদ-নদীর ওপর নির্মাণাধীন আটটি সেতুর উচ্চতা নির্ধারিত মাপের চেয়ে অনেক কম হওয়ার ঘটনাকে শুধু ‘প্রকৌশলগত ভুল’ বলে এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ নেই। এটি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের গুরুতর দায়িত্বহীনতা এবং সরকারি অর্থ ব্যবস্থাপনায় দুর্নীতির ভয়াবহ চিত্র। বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের গেজেট অনুযায়ী, নদীর সর্বোচ্চ পানির স্তর থেকে সেতুর গার্ডারের ব্যবধান কমপক্ষে ১৫ ফুট হওয়ার কথা। অথচ এসব সেতুতে কোথাও তা ৬ ফুট, কোথাও ৮ ফুট। ফলে নৌপথ বন্ধ হওয়ার পাশাপাশি নদীকে ঘিরে ব্যবসা-বাণিজ্য, কৃষি, পণ্য পরিবহন ও স্থানীয় অর্থনীতি বাধাগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিষয়টি আরও গুরুতর, কারণ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ভুলটি জানত। ২০১৮-১৯ সালে স্থানীয় সরকার ও প্রকৌশল অধিদপ্তর ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ব্যয়ে সেতুগুলোর নির্মাণ শুরু করে। নদীর ওপর সেতু নির্মাণে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্র বাধ্যতামূলক হলেও তা নেওয়া হয়নি। বিআইডব্লিউটিএ একাধিকবার চিঠি দিয়েছে, এমনকি থানায় লিখিত অভিযোগও করেছে। তারপরও কাজ বন্ধ হয়নি।
সেতুগুলো নির্মিত হচ্ছে ভৈরব, বেতনা, শ্রী ও মুক্তেশ্বরী নদীর ওপর। একটি সেতুর কাজ প্রায় শেষ। অন্য পাঁচটির অগ্রগতি ৮০-৯৫ শতাংশ, দু’টির ৬০ ও ৩২ শতাংশ। ভৈরবের তিনটির কাজ ৬০, ৮০ ও ৩২ শতাংশ; বেতনার দুটির ৮৬ ও ৯২ শতাংশ; মুক্তেশ্বরীর দু’টির ৮৪ ও ১০০ শতাংশ এবং শ্রী নদীটির ৯৫ শতাংশ। আদালতের নির্দেশে দুই বছরের বেশি সময় ধরে কাজ বন্ধ। পাঁচটি প্রকল্পের মেয়াদও শেষ।
কর্তৃপক্ষের বক্তব্য পরিস্থিতিকে আরও লজ্জাজনক করে তুলেছে। বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী বলেছেন, তিনি তখন দায়িত্বে ছিলেন না। সাবেক একজন স্বীকার করেছেন, বিআইডব্লিউটিএর অনুমোদন নেওয়া হয়নি; কারণ অনুমোদন নিলে ব্যয় ও মেয়াদ বাড়ত। নকশা শাখার কর্মকর্তা বলেছেন, তখনকার কর্মকর্তাদের দায় আছে, কিন্তু তাঁরা অবসরে চলে গেছেন এবং এখন সেতুগুলো শেষ করা ছাড়া উপায় নেই। এমন যুক্তি দায়িত্ব এড়ানোরই নামান্তর। নদী, নৌপথ ও নির্ধারিত উচ্চতার মতো মৌলিক বিষয় নকশায় বিবেচনা করতে না পারলে দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রকৌশলীদের প্রকৌশল জ্ঞানই-বা কী কাজে লাগল?
২০২৪ সালের মে মাসে হাইকোর্ট যথাযথ নীতিমালা মেনে সেতুগুলো নির্মাণ এবং সাময়িকভাবে কাজ বন্ধের নির্দেশ দেন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা ছয় মাসের মধ্যে নীতিমালা মেনে কাজ করার লিখিত প্রতিশ্র“তিও দেন। কিন্তু সেই প্রতিশ্র“তি বাস্তবায়িত হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাইয়ে এলজিইডির প্রকৌশলীরা আটটি সেতু পরিদর্শন করে নকশা সংশোধনের তথ্য সংগ্রহ করেন। পরিকল্পনা হচ্ছে ক্রেন দিয়ে গার্ডার তুলে পিলারের উচ্চতা বাড়িয়ে আবার পাটাতন বসানো। অথচ গত আড়াই বছরে বিআইডব্লিউটিএর ছাড়পত্রের জন্য কোনো আবেদনই করা হয়নি।
এখন প্রশ্ন, এতগুলো কর্মকর্তা, প্রকৌশলী ও তদারকি ব্যবস্থা থাকা সত্তে¡ও কীভাবে ছাড়পত্র ছাড়াই প্রকল্প বাস্তবায়িত হলো? বিআইডব্লিউটিএর আপত্তির পরও কেন কাজ চলল? আদালতের নির্দেশ বাস্তবায়নে এত দেরি হলো কেন? সরকারের উচিত দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত করে নকশা অনুমোদন, দরপত্র, তদারকি এবং আপত্তির পরও কাজ চালিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রত্যেকের দায়িত্ব নির্ধারণ করা। অবহেলা, অনিয়ম বা ক্ষমতার অপব্যবহারের সঙ্গে যাঁরা জড়িত, তাঁদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। সরকারি অর্থ অপচয়ের দায়ও নির্ধারণ করতে হবে।
সেতু ভেঙে ফেললে ৪১ কোটি ৭১ লাখ টাকা ক্ষতি হবে-এটি সত্য। আবার ভুল নকশার সেতু রেখে দিলে নদী ও নৌপথের দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি আরও বড় হবে। এ ক্ষেত্রে একই সঙ্গে সম্পদের অপচয় ও জনদুর্ভোগের বিষয়টি বিবেচনায় নিতে হবে। যশোরের আটটি সেতুর স্থায়ী সমাধান এবং দায়ী ব্যক্তিদের জবাবদিহি নিশ্চিত করাই এখন সরকারের দায়িত্ব।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ