খুলনা | শুক্রবার | ২১ অগাস্ট ২০২৬ | ৫ ভাদ্র ১৪৩৩

ইনসাফ ও ন্যায়বিচার : সমাজ বিনির্মাণে ইসলামের শাশ্বত শিক্ষা

ড. মুহাম্মদ বেলায়েত হুসাইন |
১২:৪২ এ.এম | ২১ অগাস্ট ২০২৬


মানব সভ্যতার ইতিহাসে ন্যায়বিচার একটি জাতির সভ্যতা, নৈতিকতা ও মানবিকতার অন্যতম প্রধান মানদন্ড। যে সমাজে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠিত থাকে, সেখানে মানুষের অধিকার, নিরাপত্তা ও মর্যাদা সুরক্ষিত থাকে। পক্ষান্তরে, যেখানে বিচারব্যবস্থায় পক্ষপাত, স্বজনপ্রীতি ও ক্ষমতার প্রভাব প্রবেশ করে, সেখানে মানুষের আস্থা নষ্ট হয় এবং সমাজের নৈতিক ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়ে। ইসলামের অন্যতম প্রধান শিক্ষা হলোÑঅপরাধীর পরিচয় নয়, বরং সত্য ও ন্যায়ের ভিত্তিতেই বিচার সম্পন্ন হতে হবে।
ইসলামের সোনালী ইতিহাসে ন্যায়বিচারের এমন কিছু অনন্য ও প্রোজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রয়েছে, যা কাল থেকে কালান্তর মানুষকে ইনসাফের পথে পরিচালিত করে আসছে। এসব ঘটনা কেবল অতীতের কোনো স্মারক নয়, বরং মানবসমাজের জন্য চিরন্তন পথনির্দেশনা। আমিরুল মুমিনীন হযরত উমর ইবনুল খাত্তাব রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের একটি ঐতিহাসিক ঘটনা ন্যায়বিচারের সেই মহান আদর্শেরই মূর্ত প্রতীক। একদিন এক যুবতী দরবারে উপস্থিত হয়ে এক গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করল। সে জানাল, এক প্রভাবশালী যুবক তার ওপর অন্যায় অত্যাচার চালিয়েছে এবং সে এর উপযুক্ত বিচার প্রার্থনা করছে। গভীর মনোযোগ ও দায়িত্ববোধের সাথে অভিযোগটি যাচাই করার পর হযরত উমর রাযিয়াল্লাহু আনহু জানতে পারলেন, অভিযুক্ত যুবক আর কেউ নন, স্বয়ং তাঁরই প্রিয় পুত্র আবু শাহমা। নিজ সন্তানের অপরাধের কথা জানার পরও তিনি এক মুহূর্তের জন্যও ইনসাফের মানদন্ড এদিক-ওদিক করেননি। পিতৃস্নেহ, পারিবারিক আবেগ কিংবা রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার মর্যাদাকে তিনি মুহূর্তের মধ্যে সত্যের মুখোমুখি বিসর্জন দেন। তিনি অনুধাবন করেছিলেন যে, শাসকের ঘর বা প্রভাবশালীদের অপরাধ যদি বিচারিক আওতার বাইরে থেকে যায়, তবে সাধারণ মানুষের মনে ন্যায়ের প্রতি চিরকালের মতো অনাস্থা তৈরি হবে। তাঁর কাছে সত্য ও ন্যায় ছিল পৃথিবীর যেকোনো আত্মীয়তার সম্পর্কের চেয়েও অধিক মূল্যবান ও পবিত্র।এই ঘটনা ইসলামের ন্যায়বিচারের মূলনীতিকে স্পষ্ট করে দেয়Ñঅন্যায়কারী যে-ই হোক, সত্য ও প্রমাণের সামনে তার কোনো পরিচয় ঢাল হতে পারে না।
পবিত্র কুরআনে কারীমায় মহান আল্লাহ তা’য়ালা ঘোষণা করেছেন, “নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ তা’য়ালা তোমাদের নির্দেশ দেন যে, তোমরা আমানত তার হকদারদের কাছে পৌঁছে দেবে এবং যখন মানুষের মধ্যে বিচার করবে, তখন ন্যায়বিচার করবে।” (সুরা নিসা: ৫৮)আরও বলা হয়েছে, “যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায়সঙ্গত কথা বলবে, যদিও তা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধে যায়।” (সুরা আনআম: ১৫২)
জুলুম হলো সত্যের সীমা অতিক্রম করে অন্যের অধিকার হরণ করা। আর ন্যায়বিচার হলো প্রত্যেককে তার প্রাপ্য অধিকার প্রদান করা এবং সত্যের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা। এখানে ব্যক্তিগত ভালোবাসা, শত্র“তা, বংশমর্যাদা, সম্পদ কিংবা ক্ষমতার কোনো প্রভাব থাকার সুযোগ নেই।
এই আদর্শ শুধু কথার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং ইসলামের প্রথম যুগের মহান ব্যক্তিরা তা বাস্তব জীবনে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর জীবনের একটি ঘটনা তার উজ্জ্বল প্রমাণ। একবার হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর একটি বর্ম হারিয়ে যায়। পরে তিনি সেটি এক ইয়াহুদী ব্যক্তির কাছে দেখতে পান এবং নিজের বর্ম দাবি করে কাজী শুরাইহের আদালতে মামলা করেন। তিনি সাক্ষী হিসেবে নিজের পুত্র হযরত হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহু এবং তাঁর আযাদকৃত গোলাম কাম্বারকে উপস্থিত করেন। কিন্তু বিচারক হযরত হাসান রাযিয়াল্লাহু আনহুর সাক্ষ্য গ্রহণ করলেন না। কারণ পিতার পক্ষে পুত্রের সাক্ষ্য গ্রহণযোগ্য নয়। প্রয়োজনীয় সাক্ষ্যের অভাবে হযরত আলী রাযিয়াল্লাহু আনহুর পক্ষে রায় দেওয়া সম্ভব হলো না। অথচ তিনি ছিলেন মুসলিম বিশ্বের সর্বোচ্চ দায়িত্বশীল ব্যক্তি। তিনি বিচারকের সিদ্ধান্ত বিনয়ের সঙ্গে মেনে নিলেন। কারণ তাঁর কাছে ব্যক্তিগত মর্যাদার চেয়ে ন্যায়বিচারের মর্যাদা ছিল অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
ন্যায়ের এই মহান শিক্ষা এসেছে রসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের আদর্শ থেকে। তাঁর প্রতিষ্ঠিত সমাজে ধনী-গরিব, বংশ-মর্যাদা বা সামাজিক অবস্থানের ভিত্তিতে আইনের কোনো পার্থক্য ছিল না। তৎকালীন আরবের সম্ভ্রান্ত গোত্র বনী মাখযুমের এক নারী চুরি করলে রাসূলুল্লাহ সল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইসলামী বিধান অনুযায়ী তার শাস্তির সিদ্ধান্ত দেন। শাস্তি মওকুফের জন্য সুপারিশ করা হলে তিনি বলেন, পূর্ববর্তী জাতিগুলো ধ্বংস হয়েছিল এ কারণে যে, তারা সম্ভ্রান্ত ব্যক্তির অপরাধ ক্ষমা করত এবং দুর্বল ব্যক্তির ওপর শাস্তি প্রয়োগ করত। তিনি আরও বলেন, আমার কন্যা ফাতিমাও যদি এমন অপরাধ করত, তাহলেও তার ক্ষেত্রেও একই বিধান কার্যকর হতো। (সহিহ বুখারী)
ইতিহাসের পাতা থেকে উঠে আসা এই ঘটনাগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন বা খন্ডিত অধ্যায় নয়; বরং এগুলো একই শাশ্বত আদর্শের চিরন্তন ও ধারাবাহিক প্রকাশ। সেই আদর্শের মূলকথা হলোÑসত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠায় কোনো ধরনের ভয়, আবেগ, দলীয় স্বার্থ বা অন্ধ পক্ষপাতিত্বের বিন্দুমাত্র স্থান থাকতে পারে না। সমাজের উচ্চাসনে আসীন কোনো প্রভাবশালী ব্যক্তি কিংবা রাষ্ট্রের কর্ণধার যখন নৈতিক পদস্থলন বা অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত হন, তখন তাঁর সামাজিক অবস্থান বা প্রতিপত্তি যেন বিচারের গতিপথকে একচুলও রুদ্ধ করতে না পারে। একটি রাষ্ট্র বা প্রতিষ্ঠানের প্রকৃত শক্তি ও উৎকর্ষ নিহিত থাকে তাদের নিজস্ব বলয়ের ভেতরের অপরাধীকেও জবাবদিহিতার কাঠগড়ায় দাঁড় করানোর সৎসাহসের মধ্যে।
সামাজিক শান্তি ও রাষ্ট্রীয় স্থায়িত্ব রক্ষায় ন্যায়বিচারের ভ‚মিকা অতুলনীয়। যে রাষ্ট্রে আইনের শাসন নির্বাসিত হয়, সে রাষ্ট্রে অশান্তি ও বিশৃঙ্খলা অনিবার্য হয়ে ওঠে। পক্ষান্তরে, ইনসাফের সুবাতাস বইলে সমাজের প্রতিটি স্তরে স্বস্তি নেমে আসে। অপরাধী যতই প্রভাবশালী হোক না কেন, আইনের ঊর্ধ্বে কেউ নয়Ñএই বার্তাটি যখন বাস্তবে রূপায়িত হয়, তখন সাধারণ মানুষের মনে রাষ্ট্র ও বিচারব্যবস্থার প্রতি গভীর আস্থা জন্ম নেয়। এই আস্থাই একটি শক্তিশালী ও কল্যাণমুখী রাষ্ট্রের মূল ভিত্তি। নীতি ও আদর্শের এই সুদৃঢ় বুনিয়াদ প্রমাণ করে যে, ন্যায়বিচার কেবল অতীতের কোনো সোনালী গৌরবগাথা নয়, বরং বর্তমান সমাজকে সব ধরনের অন্যায়, বৈষম্য ও কলুষতা থেকে মুক্ত করে একটি নিরাপদ ও মানবিক পৃথিবী গড়ে তোলার একমাত্র অপরিহার্য শক্তি। মহান আল্লাহ তা’য়ালা আমাদের সকলকে সকল প্রকার পক্ষপাতিত্ব ও অন্যায় থেকে মুক্ত রেখে জীবনের সর্বস্তরে সত্য ও ইনসাফ প্রতিষ্ঠার তৌফিক দান করুন। আমিন। 
লেখক : বায়োকেমিস্ট, মৎস্য অধিদপ্তর, খুলনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ

ইসলাম

প্রায় ২ মাস আগে

ইসলাম

প্রায় ২ মাস আগে