খুলনা | শনিবার | ২২ অগাস্ট ২০২৬ | ৬ ভাদ্র ১৪৩৩

র‌্যাবের বদলে এসআরবি : নতুন নামে পুরোনো কাঠামো বহালের যুক্তি কী

|
১২:৩৬ এ.এম | ২২ অগাস্ট ২০২৬


র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বাংলাদেশের সা¤প্রতিক ইতিহাসে সবচেয়ে বিতর্কিত বাহিনীগুলোর একটি। গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যা, নির্যাতন এবং গোপন বন্দিশালা পরিচালনার মতো গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে বাহিনীটির বিরুদ্ধে। ২০২৪ সালের গণ-অভ্যুত্থানের পর জাতিসংঘ, গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশন এবং দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংগঠনগুলোর পক্ষ থেকে র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি ও সুপারিশ করা হয়েছিল। এ রকম পরিপ্রেক্ষিতে বর্তমান সরকার র‌্যাব ‘বিলুপ্ত’ করে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন’ বা এসআরবি গঠনের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই একটি প্রশ্ন সামনে এসেছে এটি কি সত্যিই র‌্যাবের বিলুপ্তি, নাকি কেবল নতুন নামে পুরোনো কাঠামোর ধারাবাহিকতা?
মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’-এর খসড়া পর্যালোচনা করলে দ্বিতীয় সম্ভাবনাটিই বেশি জোরালো বলে মনে হয়। কারণ, র‌্যাবের জনবল, ক্ষমতা, কর্তৃত্ব, সুবিধা, তহবিল, সম্পত্তি, হিসাব, নথি ও অন্যান্য সম্পদ এসআরবিতে স্থানান্তরিত হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও নতুন ইউনিটের সদস্য হিসেবে গণ্য হবেন। এমনকি র‌্যাবের দায়দায়িত্ব, চুক্তি এবং চলমান মামলাও এসআরবির নামে অব্যাহত থাকবে; অর্থাৎ আইনগতভাবে একটি প্রতিষ্ঠান বিলুপ্ত হলেও তার প্রাতিষ্ঠানিক উত্তরাধিকার প্রায় অবিকল বহাল থাকছে।
এখানে সরকারের সিদ্ধান্তের সঙ্গে তাদের অতীত রাজনৈতিক অঙ্গীকারেরও একটি স্পষ্ট অসংগতি দেখা যায়। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপি র‌্যাব বিলুপ্ত করার দাবি তুলেছিল। এখন ক্ষমতায় এসে দলটি এমন একটি নতুন কাঠামোর দিকে যাচ্ছে, যেখানে নাম বদলালেও পুরোনো বাহিনীর জনবল, সম্পদ ও ক্ষমতার বড় অংশই একই থেকে যাচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যুক্তি দিয়েছেন, সাইবার অপরাধ, মানব পাচার, সংঘবদ্ধ অপরাধ, মাদক ও অন্যান্য নতুন ধরনের অপরাধ মোকাবিলায় বিশেষায়িত সক্ষমতা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে একটি দক্ষ বিশেষ ইউনিট থাকতে পারে এবং থাকা প্রয়োজনও হতে পারে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, নতুন বাহিনী গঠনের প্রয়োজনীয়তা কি পুরোনো বিতর্কিত কাঠামো অক্ষুণœ রাখার যৌক্তিক কারণ হতে পারে?
লক্ষণীয় হলো, এসআরবির ক্ষমতা কমছে না; বরং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা বিস্তৃত হচ্ছে। নতুন ইউনিটকে তল­াশি, জব্দ ও গ্রেফতারের ক্ষমতা দেওয়ার পাশাপাশি ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের ক্ষেত্রও বাড়ানো হয়েছে। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসআরবি তদন্ত করতে পারবে। অতীতে যে বাহিনীর ক্ষমতার কেন্দ্রীভবন এবং জবাবদিহির অভাব নিয়ে প্রশ্ন ছিল, তাদের উত্তরসূরি প্রতিষ্ঠানের হাতে আরও বিস্তৃত ক্ষমতা তুলে দেওয়ার আগে কঠোর ও স্বাধীন নজরদারি কাঠামো নিশ্চিত করা জরুরি ছিল। অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠন নতুন আইনের একটি ইতিবাচক সংযোজন হতে পারত। কিন্তু কমিটির পাঁচ সদস্যের চারজনই যখন সরকার, পুলিশ ও সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কর্মকর্তা, তখন এর স্বাধীনতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
উদ্বেগের বিষয় হলো, র‌্যাবের মতো এসআরবিতেও সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণের সুযোগ বহাল রাখা হয়েছে। গুম-সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সুপারিশ ছিল, কোনো নতুন বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা হলে তা প্রশিক্ষিত পুলিশ সদস্যদের নিয়েই করা উচিত। কিন্তু নতুন খসড়ায় সেই সুপারিশ আমলে নেওয়া হয়নি। র‌্যাবের নাম মুছে দিয়ে এসআরবি লেখা সহজ; কিন্তু একটি বাহিনীর সংস্কৃতি, জবাবদিহির কাঠামো ও ক্ষমতা প্রয়োগের পদ্ধতি বদলানো অনেক কঠিন। সরকার যদি সত্যিই একটি নতুন সূচনা করতে চায়, তাহলে আইনে জবাবদিহি ও স্বচ্ছতার বিষয়টি আরও স্পষ্ট করতে হবে, পুরোনো কাঠামো বদলাতে হবে এবং সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যদের প্রেষণের সুযোগ বন্ধ করতে হবে। তা না হলে এ প্রশ্ন থেকেই যাবে র‌্যাব সত্যিই বিলুপ্ত হলো, নাকি শুধু নতুন নাম নিয়ে ফিরে এল?

 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ