খুলনা | রবিবার | ২৩ অগাস্ট ২০২৬ | ৭ ভাদ্র ১৪৩৩

আমন চাষে অনিশ্চয়তা : সার সিন্ডিকেট থেকে কি কৃষকের মুক্তি নেই

|
১২:১৮ এ.এম | ২৩ অগাস্ট ২০২৬


আমন মৌসুমে কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না, অথচ বেশি দামে তাঁদের সার কিনতে হচ্ছে এমন সংবাদ নতুন শঙ্কা ও উদ্বেগ তৈরি করার জন্য যথেষ্ট। কেননা আমন উৎপাদনের সঙ্গে খাদ্যনিরাপত্তার প্রশ্নটি নিবিড়ভাবে জড়িত। বৈরী আবহাওয়া ও ডিজেল-সংকটের কারণে এ বছর বোরোর উৎপাদন কাক্সিক্ষত লক্ষ্যমাত্রায় পৌঁছাতে পারেনি। জুলাইয়ে টানা অতি ভারী বৃষ্টি ও বন্যায় চট্টগ্রাম, সিলেট ও উত্তরবঙ্গে বিস্তীর্ণ অঞ্চলে আমনের বীজতলা ও আমন চারার ক্ষতি হয়েছিল। এতে আমন ধানের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে কম হওয়ার শঙ্কা এমনিতেই তৈরি হয়েছে। এর ওপর যদি সারসংকটে আমনের উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হয়, খাদ্যনিরাপত্তার ওপর তার প্রভাব পড়তে বাধ্য।
খবর জানাচ্ছে, রাজশাহী ও যশোরে কৃষকেরা পাশের পরিবেশকদের (ডিলার) কাছ থেকে সার পাচ্ছেন না। গ্রাম থেকে দূরের পরিবেশকদের কাছে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়িয়ে সার মিললেও সেটা চাহিদামাফিক নয়। কোথাও ইউরিয়া সার পাওয়া যাচ্ছে তো ডিএপি ও টিএসপি সার পাওয়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগ কৃষকের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে পরিবেশকেরা তাঁদের কাছে সার বিক্রি করছেন। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হচ্ছে, পরিবেশকেরা যখন সার নেই বলে কৃষকদের ফিরিয়ে দিচ্ছেন, তখন সরকারি ভর্তুকির সার খোলাবাজার থেকেই তাঁদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। 
শুধু রাজশাহী আর যশোর নয়, সার নিয়ে সারা দেশেই কমবেশি একই ধরনের সংকটে পড়েছেন কৃষকেরা। গ্যাস ও জ্বালানিসংকটের কারণে দেশে সার উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। আবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্র যুদ্ধের কারণে সার আমদানিতে চাপ ও খরচও বেড়েছে। এ কারণে সারের চাহিদার বিপরীতে কিছুটা কম সরবরাহ করা হচ্ছে বলে রাজশাহী কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তরের ভাষ্য থেকে জানা যাচ্ছে। এই ঘাটতিটা কোনোভাবেই সংকটময় পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে না। সরকার নির্ধারিত পরিবেশকেরা ভর্তুকির সার বাইরে কালোবাজারে বিক্রি করছেন বলেই আমন ফলাতে কৃষকেরা প্রয়োজনীয় সার পাচ্ছেন না।
এক এলাকার সার অন্য এলাকায় পাচার, অবৈধ মজুত ও কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় ভ্রাম্যমাণ আদালত দু’টি জেলায় কয়েকজন পরিবেশককে জরিমানা করেছেন। কৃষি স¤প্রসারণ অধিদপ্তর বলছে, অনিয়মের অভিযোগ পেলে তাঁরা ব্যবস্থা নিচ্ছেন। প্রশ্ন হচ্ছে, কৃষি উৎপাদন ও কৃষিপণ্যের দাম স্বাভাবিক রাখতে সরকার ভর্তুকি মূল্যে সার দেয়, সেই সার পরিবেশকেরা ঠিকমতো কৃষকদের দিচ্ছেন কি না, সেটা তদারক করার দায়িত্ব কার? সারের কৃত্রিম সংকট তৈরি করার শাস্তি জরিমানাই কি যথেষ্ট?
জ্বালানিসংকটে দেশের অর্থনীতি যখন বড় চাপে, তখন সারের কৃত্রিম সংকট যাঁরা তৈরি করছেন, তাঁরা খাদ্যনিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছেন। ফলে এই অপরাধকে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। সার নিয়ে সিন্ডিকেটের কাছে কৃষকদের এই জিম্মিদশা চলছে বছরের পর বছর। সারের পরিবেশকেরা রাজনৈতিক ও সামাজিকভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাঁরা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যান। কৃষি, কৃষক ও খাদ্যনিরাপত্তার স্বার্থেই সার সিন্ডিকেটের অবসান হওয়া জরুরি।
কৃষকেরা ঋণ করে ফসল ফলাবেন, প্রয়োজনীয় সার, বীজ, সেচ, কীটনাশক না পাওয়ায় তাঁদের উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে অথচ ফসল বিক্রি করার সময় তাঁরা দাম পাবেন না, এই দুষ্টচক্র থেকে কৃষি ও কৃষককে অবশ্যই বের করে আনতে হবে। এর জন্য সবার আগে দরকার কৃষক নীতি ও পরিকল্পনা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ