খুলনা | বৃহস্পতিবার | ২৭ জানুয়ারী ২০২২ | ১৪ মাঘ ১৪২৮

শিক্ষার্থী আবরার থেকে শিক্ষক সেলিম

বুয়েট ও কুয়েট ক্যাম্পাসে ছাত্র রাজনীতির বলি ২৯ শিক্ষার্থী!

সোহাগ দেওয়ান |
০১:০৮ এ.এম | ০৭ জানুয়ারী ২০২২


বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট) এবং খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট)’র দু’টি মৃত্যুর ঘটনায় ২৯ জন শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ শেষ হয়ে গেছে। বুয়েটে সহপাঠী আবরারকে হত্যার দায়ে গত ৮ ডিসেম্বর ২০ শিক্ষার্থীকে ফাঁসি ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। অপর দিকে কুয়েটের অধ্যাপক ড. মোঃ সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় এই বিশ্ববিদ্যালয়ের চার শিক্ষার্থীকে ৫ জানুয়ারি আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। এই দু’টি মৃত্যুর পেছনেই রয়েছে ক্যাম্পাসের ছাত্র রাজনীতি।
বুয়েটের আবরার হত্যাকান্ডে আদালতে ফাঁসি, যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত ২৫ শিক্ষার্থীই ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মী ছিলেন। এছাড়া কুয়েটে আজীবন বহিষ্কার হওয়া ৪ জনের মধ্যে ক্যাম্পাস ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদকও রয়েছেন। বাকীরাও এ ছাত্র সংগঠনের অনুসারী বলে জানা গেছে। এছাড়া ১৭ শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন মেয়াদের বহিষ্কার করেছে কুয়েট প্রশাসন। মেধাবী এ সকল শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ শেষ, পাশাপাশি তাদের বাবা-মায়ের আশা আকাক্সক্ষারও কবর রচিত হয়েছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ করার জোর দাবি করছেন অভিভাবকরা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেশ কয়েকজন অভিভাবক সরকারের কাছে জোর দাবি জানিয়ে বলেন, অনেক পরিশ্রম করে ছেলে- মেয়েকে তিল তিল করে গড়ে তুলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত আনতে হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় পড়ুয়া ওই সকল শিক্ষার্থীদের নিয়ে বাবা মায়েদের অনেক স্বপ্ন লুকানো থাকে। ছেলে-মেয়েকে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ডিসি, এসপি ও ম্যাজিস্ট্রেট করার স্বপ্ন দেখে সব অভিভাবক। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ছাত্র রাজনীতির কারনে অনেকের সেই স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে যায়। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের দাবি জানান এ সকল অভিভাবকরা।
এ বিষয়ে সরকারি-বেসরকারি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের বেশ কয়েকজন শিক্ষকের সাথে কথা বললে অধিকাংশ শিক্ষকই ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের পক্ষে মতামত দেন। তবে কেউ কেউ বলেন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছাত্র রাজনীতি চলমান থাকারও প্রয়োজন রয়েছে। তবে এক্ষেত্রে সরকারের পক্ষ থেকে কিছু সুনির্দিষ্ট নির্দেশনা, নীতিমালা জুড়ে দিতে হবে। শুধু তাই নয় সে সকল নির্দেশনা ও নীতিমালা অনুসরনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে শক্তিশালী হতে হবে। তাহলেই বুয়েট ও কুয়েটে ঘটে যাওয়া ঘটনার পুনরাবৃত্তি হবে না।
প্রসঙ্গত : ২০১৯ সালের ৭ অক্টোবর বুয়েটের মেধাবী ছাত্র আবরারফাহাদকে পিটিয়ে হত্যা করে ওই ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগ নেতা-কর্মীরা। প্রতিপক্ষ রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনের সদস্য মনে করে তাকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। শেরে বাংলা হলের সিঁড়ি থেকে আবরারের মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। রাত দুইটা থেকে আড়াইটার দিকে এ হত্যার ঘটনা ঘটে। মরদেহ উদ্ধার করা হয় ভোরে। হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আবরার ফাহাদের বাবা বরকত উল­াহ পরদিন চকবাজার থানায় একটি মামলা করেন। সারাদেশের মানুষ বিচারের দাবিতে ফুঁসে ওঠে। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় বুয়েট কর্তৃপক্ষ প্রতিষ্ঠানটির ২৬ জন ছাত্রকে স্থায়ীভাবে বহিষ্কার করেন। সেখানে বুয়েট ছাত্রলীগের ১৯ জন নেতা-কর্মীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করা হয়। কুষ্টিয়ার ছেলে আবরার ফাহাদ বুয়েটের ইলেকট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিলেন। আবরার ফাহাদ হত্যাকাণ্ডের পর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ব্যাপক ছাত্র বিক্ষোভ হয়।
অবশেষে গত ৮ ডিসেম্বর ২০ শিক্ষার্থীকে ফাঁসি ও ৫ জনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ডাদেশ দিয়েছে আদালত। মামলায় দণ্ডপ্রাপ্ত ২২ আসামী কারাগারে রয়েছেন। বাকী তিনজন পলাতক রয়েছেন।
অপর দিকে গত ৩০ নভেম্বর খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) শিক্ষক অধ্যাপক ড. মোঃ সেলিম হোসেনের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। মৃত্যুর পর অভিযোগ ওঠে, কুয়েটে শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ কয়েকজন ছাত্র তাদের মনোনীত প্রার্থীকে ডাইনিং ম্যানেজার করার জন্য হল প্রভোস্ট ড. সেলিম হোসেনকে নিয়মিত হুমকি দিয়ে আসছিলেন। এরই ধারাবাহিকতায় ৩০ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সাদমান নাহিয়ান সেজানের নেতৃত্বাধীন ছাত্ররা ক্যাম্পাসের রাস্তা থেকে ড. সেলিম হোসেনকে জেরা করা শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে তারা শিক্ষককে ধরে নিয়ে তার ব্যক্তিগত কক্ষে (তড়িৎ প্রকৌশল ভবন) প্রবেশ করেন। সিসি টিভি ফুটেজে দেখা যায়, তারা আনুমানিক আধা ঘণ্টা ওই শিক্ষকের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক করেন। এরপর শিক্ষক সেলিম দুপুরে খাবার খেতে ক্যাম্পাস সংলগ্ন বাসায় যান। বিকেল ৩টার দিকে স্ত্রী লক্ষ্য করেন তিনি বাথরুম থেকে বের হচ্ছেন না। পরে দরজা ভেঙে তাকে উদ্ধার করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।
এদিকে, মৃত্যুর সঠিক কারণ উদঘাটনে দাফনের ১৫ দিন পর গত ১৫ ডিসেম্বর সকালে কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার বাগুলাট ইউনিয়নের বাঁশগ্রাম কবরস্থান থেকে ড. সেলিমের লাশ উত্তোলন করা হয়। এরপর মেডিক্যাল বোর্ডের সিদ্ধান্তে ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য লাশ ঢাকায় পাঠানো হয়। ১৬ ডিসেম্বর রাতে লাশ কুষ্টিয়া পৌঁছানোর পর ওই একই কবরে দাফন করা হয়।
সবশেষ অধ্যাপক ড. মোঃ সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (কুয়েট) শাখা ছাত্রলীগের সাধারণ সম্পাদক সাদমান নাহিয়ান সেজানসহ চার শিক্ষার্থীকে আজীবন বহিষ্কার করা হয়েছে। বুধবার  দুপুরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী আনিছুর রহমান ভুঁঞা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
লেকট্রিক্যাল এ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিং (ইইই) বিভাগের অধ্যাপক ড. সেলিম হোসেনের মৃত্যুর ঘটনায় তদন্ত প্রতিবেদনের আলোকে ৭৯তম সিন্ডিকেট সভায় এই সিদ্ধান্ত হয়। এতে সভাপতিত্ব করেন উপাচার্য প্রফেসর ড. কাজী সাজ্জাদ হোসেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ