খুলনা | সোমবার | ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে নতুন চার্জ দিতে হবে বাংলাদেশকে

খবর প্রতিবেদন |
০১:২৬ এ.এম | ২৪ অগাস্ট ২০২৬


বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে গ্রিড পরিচালনা ও বিদ্যুৎ লেনদেনের হিসাব-নিকাশ নিষ্পত্তির জন্য বাংলাদেশের ওপর নতুন করে সেটেলমেন্ট নোডাল এজেন্সি (এসএনএ) চার্জ আরোপ করতে যাচ্ছে ভারত। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের বিপরীতে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে বর্ধিত এই চার্জ দিতে হবে। বিদ্যুতের মূল দাম (ট্যারিফ) থেকে আলাদা হিসেবে যুক্ত হবে এই এসএনএ চার্জ। গ্রিড পরিচালনা, শিডিউলিং, মিটারিং, বিদ্যুতের হিসাব-নিকাশ ও আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির ব্যয় মেটাতে এই চার্জ নেওয়া হবে।
এ বিষয়ে ভারতের রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্য প্রতিষ্ঠান এনটিপিসি বিদ্যুৎ ব্যাপার নিগম লিমিটেড (এনভিভিএন) ও বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডের (বিপিডিবি) মধ্যে এসএনএ চুক্তি সই করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। ১৮ আগস্ট বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে এই চুক্তি করার বিষয়ে মতামত চেয়ে অর্থ বিভাগে চিঠি দেওয়া হয়েছে।
অর্থ বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম না প্রকাশের শর্তে বলেন, ভারত শুরুতে প্রতি ইউনিট বিদ্যুতে ১ ভারতীয় পয়সা হারে এই চার্জ দাবি করেছিল। পরে বিপিডিবি দরকষাকষি করে চার্জের হার প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি বা আধা পয়সায় নির্ধারণ করেছে।
ওই কর্মকর্তা আরও বলেন, ভারতের বিদ্যুৎ বিষয়ক আইন অনুযায়ী এই চুক্তি করতে হবে। চুক্তি স্বাক্ষর বিলম্বিত হলে ভারত থেকে ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানি ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, চার্জের পরিমাণ ছোট হলেও ভারত থেকে দীর্ঘমেয়াদে বড় পরিমাণ বিদ্যুৎ আমদানির কারণে এর মোট আর্থিক প্রভাব বড় হবে। তিনিও নাম না প্রকাশের শর্তে কথা বলেন। নেপাল ও ভুটানও একই ধরনের এসএনএ চার্জ দেয়
বিদ্যুৎ কর্মকর্তাদের তথ্যানুযায়ী, এসএনএ চুক্তির আওতায় প্রতি ইউনিটে শিডিউলড বিদ্যুতের জন্য ০.০০৫ ভারতীয় রুপি এসএনএ চার্জ প্রস্তাব করা হয়েছে।
বিপিডিবির লিখিণ অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে ভারতের সেন্ট্রাল ইলেকট্রিসিটি রেগুলেটরি কমিশনের (সিইআরসি) কাছে এসএনএ চার্জ নির্ধারণের এই প্রস্তাব দেওয়া হয়। প্রস্তাবিত এই চার্জ নির্ধারণের ক্ষেত্রে ভুটান ও নেপালের সঙ্গে ভারতের বিদ্যুৎ বাণিজ্যে বর্তমানে প্রযোজ্য চার্জের হার বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।
চিঠিতে বলা হয়েছে, ভারতের সঙ্গে ভুটান ও নেপালের আগে থেকেই এসএনএ চুক্তি রয়েছে এবং বিদ্যুৎ আমদানির ক্ষেত্রে ০.০০৫ ভারতীয় রুপি হারে এসএনএ চার্জ করছে। বাংলাদেশের জন্যও একই হার প্রস্তাব করা হয়েছে।
চুক্তির আওতায় ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পুরো সক্ষমতায় নিরবচ্ছিন্নভাবে আমদানি হলে, এক ঘণ্টায় ১১ লাখ ৬০ হাজার ইউনিট বিদ্যুৎ আমদানি হবে। প্রতি ইউনিটে ০.০০৫ রুপি হারে এর জন্য এসএনএ চার্জ দিতে হবে ৫ হাজার ৮০০ রুপি। 
বিদ্যুতের প্রতি ইউনিট বলতে এক কিলোওয়াট-ঘণ্টা বোঝায়। এক ইউনিট বিদ্যুৎ মানে হলো এক হাজার ওয়াটের কোনো বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম বা অ্যাপ্লায়েন্স টানা এক ঘণ্টা চালালে যে পরিমাণ শক্তি খরচ হয়। ১ মেগাওয়াট সমান ১ হাজার কিলোওয়াট।
এসএনএ চার্জ কেন দিতে হবে ; এসএনএ চার্জ মূলত বিদ্যুতের দাম নয়; এটি আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ বাণিজ্যের গ্রিড-অপারেশন ও আন্তঃসীমান্ত বিদ্যুৎ লেনদেন নিষ্পত্তির খরচ। 
বিদ্যুৎ বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে বিদ্যুৎ বাণিজ্যে গ্রিড-সংক্রান্ত চার্জ নিষ্পত্তি সহজ করতে ভারতের সিইআরসি এই এসএনএ ব্যবস্থা চালু করেছে। 
সিইআরসি বিধিমালা অনুযায়ী, এসএনএ প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে বিদ্যুৎ লেনদেনের সময়সূচি সমন্বয়, গ্রিড-সংক্রান্ত চার্জ, নির্ধারিত সরবরাহের তুলনায় কম-বেশি বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ডেভিয়েশন চার্জ, রিএ্যাক্টিভ এনার্জি চার্জ ও সংশ্লিষ্ট অর্থনৈতিক নিষ্পত্তিতে ভ‚মিকা পালন করে।
ভারতের আঞ্চলিক গ্রিডে বাংলাদেশকে একটি আলাদা কন্ট্রোল এরিয়া হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আন্তঃদেশীয় বিদ্যুৎ আমদানির জন্য মিটারিং, এনার্জি এ্যাকাউন্টিং ও সেটেলমেন্টের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা রয়েছে। 
ফলে বিদ্যুৎ কেনার মূল মূল্য বা ট্যারিফের বাইরে গ্রিড ব্যবহারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এ ধরনের চার্জকে এসএনএ চার্জ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
ভারত থেকে বাংলাদেশে কী পরিমাণ বিদ্যুৎ আসে : বাংলাদেশ দীর্ঘদিন ধরেই ভারত থেকে বিদ্যুৎ আমদানি করছে। বর্তমানে ভারতের সঙ্গে বিভিন্ন চুক্তির আওতায় বাংলাদেশে মোট ২ হাজার ৬৫৬ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থা রয়েছে।
এর মধ্যে এনভিভিএনের মাধ্যমে এনটিপিসি কেন্দ্র থেকে ২৫০ মেগাওয়াট, দামোদর ভ্যালি কর্পোরেশন থেকে ৩০০ মেগাওয়াট, ত্রিপুরা স্টেট ইলেকট্রিসিটি কর্পোরেশন থেকে ১৬০ মেগাওয়াট, পিটিসি ইন্ডিয়ার মাধ্যমে সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়ার কেন্দ্র থেকে ২০০ মেগাওয়াট ও সেম্বকর্প এনার্জি ইন্ডিয়া থেকে আরও ২৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আসে। এই পাঁচটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের ১ হাজার ১৬০ মেগাওয়াট বিদ্যুতের জন্য এসএনএ চার্জ বিষয়ক চুক্তি হচ্ছে। 
এর বাইরে আদানি পাওয়ারের ঝাড়খÐের গড্ডা বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ১ হাজার ৪৯৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে বিপিডিবির। বিদ্যুৎ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, আদানির সঙ্গে বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিতে এই চার্জ সম্পৃক্ত রয়েছে। ফলে আলাদা করে চুক্তি করার দরকার নেই।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় ভারত থেকে আমদানি করা বিদ্যুৎ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে গ্যাসের সংকট, জ্বালানি আমদানির ব্যয় ও দেশীয় বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদন সীমাবদ্ধতার কারণে বাংলাদেশের চাহিদা পূরণে ভারতের বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা দেখা দিয়েছে।
নতুন এই চুক্তি কার্যকর হলে ভারত থেকে আমদানিকৃত বিদ্যুতের মূল মূল্যের পাশাপাশি এসএনএ চার্জও বাংলাদেশে বিদ্যুৎ আমদানি ব্যয়ের একটি অংশ হিসেবে যুক্ত হবে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ