খুলনা | সোমবার | ২৪ অগাস্ট ২০২৬ | ৮ ভাদ্র ১৪৩৩

কাঁদলেন পুলিশ কমিশনার, বললেন ‘তার বয়সী আমারও এক ছেলে আছে’

বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় শিক্ষক গণপতিসহ পরিবারের চারজনকে হত্যা

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪১ এ.এম | ২৪ অগাস্ট ২০২৬


বাড়ির ছাদে ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের অবসরপ্রাপ্ত শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী জুয়েল, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে হত্যা করা হয়েছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এ ঘটনায় অভিযুক্ত দুইজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রোববার দুপুরে নিজ কার্যালয়ে রংপুর মেট্রোপলিটনের পুলিশের কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে এ তথ্য জানান। ঘটনাটি কীভাবে ঘটেছিল, সে ব্যাপারে গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে ব্রিফিং করার সময় গলা জড়িয়ে আসে তার। একপর্যায়ে আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে ফেলেন তিনি। কান্নাজড়িত কণ্ঠে হত্যাকাণ্ডের বিস্তারিত তুলে ধরেন তিনি।
তিনি জানান, নগরের কামালকাছনা এলাকার মাছুয়াপাড়ায় এক পরিবারের চার জনকে হত্যার ঘটনায় দুই যুবককে আটক করেছে পুলিশ। ইয়াবা সেবনে বাধা দেওয়ায় রংপুর জিলা স্কুলের সাবেক শিক্ষক গণপতি চক্রবর্তী, তার স্ত্রী ও দুই সন্তানকে পরিকল্পিতভাবে হত্যা করে তারা। পরে হত্যার ঘটনা ভিন্ন খাতে নিতে ঘরের জিনিসপত্র ছড়িয়ে রেখে ডাকাতির নাটক সাজানোর চেষ্টা করা হয়। 
গ্রেফতারকৃতরা হলেন নগরীর মাছুয়াপাড়া এলাকার কানুদাসের ছেলে মুগ্ধ দাস (২৩) ও বিনয় চন্দ্র দাসের ছেলে সিদ্ধার্থ দাস (১৯)। 
এর আগে শনিবার (২২ আগস্ট) রাত ১১টার দিকে রংপুর নগরীর মাছুয়াপাড়ার একটি বাসা থেকে অবসরপ্রাপ্ত স্কুলশিক্ষক গণপতি চক্রর্বুী জুয়েল (৬৫), তার স্ত্রী প্রীতিলতা চক্রবর্তী ভোলা (৫০), স্নাতকোত্তর শ্রেণির শিক্ষার্থী মেয়ে আগামী চক্রবর্তী প্রার্থী (২৫) এবং পঞ্চম শ্রেণি পড়ুয়া ছেলে আয়ুস চক্রবর্তী প্রিয়মের (১২) মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ কমিশনার মোহাম্মদ আবদুল মাবুদ বলেন, দুইজন খুনি মুগ্ধ ও সিদ্ধার্থ পাশের বিল্ডিংয়ের ওপর দিয়ে উনাদের ছাদে আসে। ছাদে আসে বৃহস্পতিবার দিবাগত শেষ রাতে। এই দু’জন ছাদে বসে ইয়াবা সেবন করছিল। শব্দ পেয়ে গণপতি চক্রবর্তী ছাদে গিয়ে আড্ডা দেওয়ার বিষয়ে জিজ্ঞাসা করলে পরিচয় গোপন রাখার জন্য তার গলায় থাকা গামছা পেঁচিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তার চিৎকার শুনে সিঁড়ি দিয়ে ওঠার সময় প্রীতিলতা চক্রবর্তীকেও গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। এরপর মায়ের চিৎকারে এগিয়ে আসা মেয়ে প্রার্থী চক্রবর্তীকেও গামছা ও রশি দিয়ে গলায় পেঁচিয়ে হত্যা করা হয়। খুনিরা জানিয়েছে-প্রার্থী চক্রবর্তী মারা যাচ্ছিল না, প্রায় চার-পাঁচ মিনিট লাগে তার প্রাণ যাওয়ার ক্ষেত্রে। সেই সময় তারা রশি দিয়ে তার গলায় এবং মুখে পেঁচিয়ে ধরে। সর্বশেষে ঘুমন্ত অবস্থায় শিশু প্রিয়মকে কাপড় পেঁচিয়ে ও বালিশ চাপা দিয়ে হত্যা করা হয়। 
তিনি জানান, হত্যাকানেডর পর অভিযুক্তরা বাসার একটি বাথরুমে গোসল করে, ডাইনিং টেবিলে বসে খেজুর ও অবশিষ্ট ইয়াবা সেবন করে। এরপর জুমার নামাজের সময় রাস্তাঘাট ফাঁকা হলে তারা কিছু স্বর্ণালংকার নিয়ে বাসা থেকে বের হয়ে যায় এবং সেগুলো নিকটবর্তী একটি মন্দিরের পেছনে পরিত্যক্ত জায়গায় লুকিয়ে রাখে। অভিযুক্তদের দেখানো মতে সেসব আলামত জব্দ করা হয়েছে।
পুলিশ কমিশনার বলেন, তদন্তকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার জন্য অভিযুক্তরা ইচ্ছাকৃতভাবে ঘরের জিনিসপত্র এলোমেলো করে রাখে, যাতে পুলিশ এটিকে ডাকাতি বলে মনে করে। এছাড়া আঙুলের ছাপ যাতে না থাকে সেজন্য বাসার দু’টি মোবাইল ফোন ডিটারজেন্ট মিশ্রিত পানিতে ভিজিয়ে রাখা হয় বলেও জানান তিনি। 
হত্যাকাণ্ডের বিচার চাইলেন গণপতি চক্রবর্তীর সহকর্মীরা : রোববার সকালে রংপুর জিলা স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবুল কালাম আজাদের নেতৃত্বে কয়েকজন শিক্ষক ঘটনাস্থলে যান। প্রধান শিক্ষক জানান, গণপতি চক্রবর্তী জিলা স্কুলের জনপ্রিয় শিক্ষক ছিলেন। তিনি চলতি বছরের জানুয়ারি মাসে এলপিআরে গেছেন। তার ও পরিবারের সবার মৃত্যুতে আমরা গভীরভাবে শোকাহত। আমরা এই হত্যাকাণ্ডের বিচার চাই। 
যা বললেন স্থানীয় এমপি ও জনপ্রতিনিধিরা : সকাল সাড়ে ৯টায় রংপুর-৩ আসনে জামায়াতের এমপি মোঃ মাহবুবুর রহমান বেলাল, মহানগর জামায়াতের আমির এটিএম আযম খান দলের নেতাকর্মীদের নিয়ে ওই শিক্ষকের বাসায় যান। এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে এমপি বলেন, ‘এক পরিবারের চার জনকে হত্যার মাধ্যমে প্রমাণিত হলো রংপুরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম অবনতি ঘটেছে। অবিলম্বে খুনিদের গ্রেফতার করে দ্রুত বিচার করতে হবে।
দুপুরে রংপুর জেলা বিএনপি’র আহŸায়ক জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলাম ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে সাংবাদিকদের বলেন, ‘যারাই জড়িত থাকুক না কেন, গ্রেফতার করে আইনের আওতায় আনতে হবে।’

প্রিন্ট

আরও সংবাদ