খুলনা | মঙ্গলবার | ২৫ অগাস্ট ২০২৬ | ৯ ভাদ্র ১৪৩৩

গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে তিল পরিমাণ ছাড়ও দেওয়া হবে না : ব্রিফিংয়ে গোলাম পরওয়ার

খবর প্রতিবেদন |
০২:৩৬ এ.এম | ২৫ অগাস্ট ২০২৬


গণভোটের রায়ের প্রশ্নে সরকারের (আইনমন্ত্রীর) অনড় অবস্থানের বিপরীতে জামায়াতের স্পষ্ট অবস্থান পরিষ্কার করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি বলেন, জনগণের ৭০ শতাংশ ভোট ‘হ্যাঁ’-তে পড়েছে। এই রায় বাস্তবায়নে ১১ দলীয় ঐক্য ও জামায়াত কোনো নমনীয়তা দেখাবে না। এই মুহূর্তে গণভোটের রায় বাস্তবায়নের চেয়ে বড় কোনো ইস্যু নেই। জনগণের ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে ‘তিল পরিমাণ ছাড়’ দেওয়া হবে না। সংসদ ব্যর্থ হলে জামায়াত জনগণের কাছেই ফিরে যাবে। সোমবার দুপুরে জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মুবিনিময় সভা শেষে আয়োজিণ সংবাদ ব্রিফিংয়ে এ কথা বলেন তিনি।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর গত ছয় মাসের সংসদীয় পথচলায় এই প্রথম দেশের শীর্ষস্থানীয় জাতীয় সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে উন্মুক্ত মতবিনিময় সভায় মিলিত হয়েছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃত্ব। ১১ দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে জামায়াতে ইসলামীর ভ‚মিকা, র্বুমান জাতীয় সংকট এবং ‘জুলাই সনদের’ ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটের রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে দলটির অনড় অবস্থান এই মুবিনিময়ের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল।
সংবাদ সম্মেলনে সভার বিস্তারিত তুলে ধরে দলটির সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার বলেন, বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে একটি শক্তিশালী ও গঠনমূলক বিরোধী দলের অনুপস্থিতি দীর্ঘদিনের গণতান্ত্রিক সংকটকে ঘনীভ‚ত করেছে। এই প্রেক্ষাপটে জামায়াতে ইসলামী জাতীয় রাজনীতিতে এক নতুন ধারার সূচনা করতে চায়। সিনিয়র পলিটিক্যাল করেসপন্ডেন্ট হিসেবে লক্ষ্য করা গেছে, দলটি প্রথাগত সহিংস ও অস্থিতিশীল রাজনীতির বিপরীতে ‘ইনসাফভিত্তিক’ সংসদীয় চর্চায় মনোনিবেশ করছে।
সেক্রেটারি জেনারেল অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরোয়ার জামায়াতের ‘গঠনমূলক রাজনীতি’র বিষয়ে ব্যাখ্যা করে বলেন, বিরোধী দল মানেই কেবল বিরোধিতার খাতিরে বিরোধিতা নয়। জামায়াতে ইসলামী তথা ১১ দলীয় ঐক্যের মূল নীতি হলো— সরকারের জনকল্যাণমূলক ও ভালো কাজে পূর্ণ সহযোগিতা করা এবং জনস্বার্থবিরোধী ও মন্দ কাজের গঠনম‚লক প্রতিবাদ করা। অতীতে দেশের বিরোধী রাজনীতির যে নেতিবাচক ও ব্যর্থ প্রথা ছিল, তা ভেঙে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও গণতন্ত্র উত্তরণে জামায়াত বদ্ধপরিকর। এই কৌশলগত অবস্থান দেশের গণতন্ত্রকে একটি শক্তিশালী ভিত্তির ওপর দাঁড় করাবে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
মুবিনিময় সভায় সম্পাদকদের পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন সম্পর্কে তিনি বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে রাজনৈতিক দল ও গণমাধ্যমের কার্যকর মিথস্ক্রিয়া অপরিহার্য। এদিনের মুবিনিময় সভায় উপস্থিত সম্পাদকরা জামায়াতে ইসলামীর সংসদীয় ও রাজনৈতিক ভ‚মিকার ওপর তাদের পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। সভায় জামায়াতের আমিরের আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদপত্রের সম্পাদক ও স্বনামধন্য সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন।
তিনি বলেন, স্বাধীনতার ৫৪ বছরের ইতিহাসে এই প্রথম কোনো বিরোধী দলকে ‘ভালো কাজে সমর্থন ও মন্দের প্রতিবাদ’ এমন ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালন করতে দেখে সম্পাদকরা এটিকে রাজনীতির এক ইতিবাচক বির্বুন হিসেবে সভায় অভিহিত করেছেন।
তিনি বলেন, উপস্থিত সম্পাদকরা পরামর্শ দিয়েছেন যে, জনগণের দাবি আদায়ে রাজপথের কর্মসূচি প্রয়োজন হলেও তা যেন কোনোভাবেই প‚র্বের মতো অসহিষ্ণু, অস্থিতিশীল বা সহিংস পথে না যায়। তারা দেশ ও জনগণের স্বার্থে জামায়াতকে শান্ত ও নিয়মতান্ত্রিক ধারায় অটল থাকার আহŸান জানান। দীর্ঘ ছয় মাস পর সম্পাদকদের সাথে এমন আনুষ্ঠানিক ও খোলামেলা আলোচনার সুযোগ তৈরি হওয়াকে তারা সাধুবাদ জানান এবং এর ধারাবাহিকতা রক্ষার ওপর জোর দেন।
গোলাম পরওয়ার বলেন, সম্পাদকদের এই ইতিবাচক মূল্যায়ন জামায়াতে ইসলামীকে ভবিষ্যতে আরও দায়িত্বশীল ভ‚মিকা পালনে উৎসাহিত করবে।
অতীতে সংসদে কার্যকর বিরোধী দলের অভাব এবং জনগণের কন্ঠস্বর রোধ হওয়া একটি গভীর জাতীয় সংকট। সেই জায়গায় সংসদে জামায়াতে ইসলামীর তথা ১১ দলীয় ঐক্যের সংসদ সদস্যদের প্রতি বিমাতাসুলভ আচরণ করা হচ্ছে। উন্নয়নমূলক কাজের বরাদ্দ এবং বিলি-বণ্টনে বিরোধী দলীয় সদস্যদের অধিকার ক্ষুণœ করা হচ্ছে। পার্লামেন্ট ফ্লোরে কথা বলার সুযোগ সীমিত করা, আইন প্রণয়ন এবং জনগুরুত্বপূর্ণ নোটিশ গ্রহণের ক্ষেত্রে স্পিকার বা ট্রেজারি বেঞ্চের আচরণ ‘ইনসাফপূর্ণ’ নয় বলে সভায় সম্পাদকদের অবগত করেছে জামায়াত।
এ ছাড়া, বিদ্যুৎ ও গ্যাসের তীব্র সংকট, নিত্যপণ্যের অসহনীয় মূল্যবৃদ্ধি এবং প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় সরকারের ব্যর্থতার চিত্র সম্পাদকদের সামনে তুলে ধরা হয়।
তিনি বলেন, ‘জুলাই সনদের’ ভিত্তিতে অনুষ্ঠিত গণভোটে দেশের ৭০ শতাংশ মানুষ ‘হ্যাঁতে ভোট দিয়ে’ যে রায় দিয়েছে, তা বাস্তবায়নে সরকার গড়িমসি করছে। আইনমন্ত্রী গণভোটের ৪টি বিষয়ের মধ্যে সাড়ে ৩টিতে একমত হলেও বাকি অর্ধেক ইস্যুতে অমত পোষণ করায় সংকট সৃষ্টি হয়েছে। জামায়াত স্পষ্ট করেছে যে, জনগণের এই ঐতিহাসিক রায় বাস্তবায়নের প্রশ্নে তারা ‘তিল পরিমাণ ছাড়’ দেবে না। এসব সংকট সমাধানে এবং জনগণের সামনে প্রকৃত সত্য তুলে ধরতে জামায়াত সম্পাদকদের কলম ও লেখনীর মাধ্যমে সহযোগিতা কামনা করেছে।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি বলেন, সম্পাদকদের একাংশের অনুপস্থিতির মধ্যে গণমাধ্যমের সঙ্গে আমাদের দূরত্বের কোনো বিষয় নেই। অনেক সম্পাদক এসেছেন, যারা আসতে পারেননি, তারা টেলিফোনে কারণ জানিয়েছেন। এই মতবিনিময়ই সুসম্পর্কের প্রমাণ।
সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আপনাদের লং মার্চ, সভা, সমাবেশসহ আন্দোলনের কোনো ভিত্তি নেই। এমন প্রশ্নের জবাবে গোলাম পরওয়ার বলেন, যারা এ কথা বলেন, তাদের রাজনৈতিক বিশ্লেষণের ক্ষমতা নেই। তারা কেবল সরকারকে খুশি করতে ‘চাটুকারিতা’ করছেন। বর্তমানে ‘গণভোটের রায়’ দেশের প্রধান ইস্যু।
জনমত গঠন ও রাজপথের কর্মসূচি অব্যাহত রাখার অংশ হিসেবে ১১ দলীয় ঐক্য নতুন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে। ৫ তারিখ সকাল ৭টায় ঢাকার শাপলা চত্বর থেকে চট্টগ্রাম অভিমুখে এক বিশাল লং মার্চ ও গাড়িবহর যাত্রা করবে।
কর্মসূচির উদ্দেশ্য সম্পর্কে জামায়াত সেক্রেটারি বলেন, গণভোটের রায় কার্যকর করা এবং জনগণের অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে এই কর্মসূচি পালন করা হবে। কর্মসূচির রুট বরাবর সাধারণ মানুষকে এতে স্বতঃস্ফ‚র্ত অংশগ্রহণের আহŸান জানানো হয়েছে। এই কর্মসূচি সফল করতে জামায়াত গণমাধ্যমকর্মী ও সর্বস্তরের জনগণের দৃঢ় সহযোগিতা কামনা করেছে।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি ও সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম খান, মাওলানা আব্দুল হালিম, ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ও জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি এ এইচ এম হামিদুর রহমান আযাদ, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, সেক্রেটারি শফিকুল ইসলাম মাসুদ, ঢাকা মহানগর উত্তর জামায়াতের আমির সেলিম উদ্দিন, সেক্রেটারি রেজাউল করিমসহ অন্যান্য নেতারা।
এর আগে, সোমবার (২৪ আগস্ট) দুপুর ১২টা থেকে দুপুর ২টা পর্যন্ত দুই ঘন্টাব্যাপী রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধী দলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রের সম্পাদকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় অংশ নেন জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান। সভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডাঃ শফিকুর রহমান ছাড়াও দলের শীর্ষ পর্যায়ের নেতারা উপস্থিত রয়েছেন। 
সভায় প্রথম আলোর নির্বাহী সম্পাদক সাজ্জাদ শরিফ, ডেইলি স্টারের মাহফুজ আনাম, সময়ের আলোর সৈয়দ শাহ নেওয়াজ করিম, নয়া দিগন্তের সালাহ উদ্দিন বাবর, বাণিজ্য প্রতিদিনের গিয়াস উদ্দিন, যায়যায়দিনের শফিক রেহমান, দেশ রূপান্তরের মুস্তাফিজ শফি, খবরের কাগজের মোস্তফা কামাল, বণিক বার্তার দেওয়ান হানিফ মাহমুদ, ডেইলি ওয়াদার শফিকুল আলম, আজকের পত্রিকার কামরুল হাসান, ঢাকা মেইলের হারুন জামিল, প্রতিদিনের বাংলাদেশের মারুফ কামাল খান সোহেল, ইনকিলাবের এ এম এম বাহাউদ্দীন, আমার দেশের মাহমুদুর রহমান, মানবকন্ঠের শহীদুল ইসলাম, আগামীর সময়ের মোস্তফা মামুন, ভোরের ডাকের কে এম বেলায়েত হোসেন, কালবেলার সন্তোষ শর্মা, ইত্তেফাকের তাসমিমা হোসেন, মানবজমিনের মতিউর রহমান চৌধুরী, ডেইলি ইভিনিং নিউজের এবিএম সেলিম আহমেদ, দৈনিক এদিনের নির্বাহী সম্পাদক খন্দকার মোজাম্মেল হক উপস্থিত ছিলেন।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ