খুলনা | শনিবার | ২৯ অগাস্ট ২০২৬ | ১৪ ভাদ্র ১৪৩৩

শুরুতেই ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকার প্রকল্প তৈরি হবে ৬০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান

ভারতকে সরিয়ে মোংলা বন্দর উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ, সহায়তায় চীন

মাহমুদ হাসান, মোংলা |
০১:৫০ এ.এম | ২৯ অগাস্ট ২০২৬


ভারতকে সরিয়ে চীনের সহায়তায় মোংলা বন্দর উন্নয়নে মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করতে যাচ্ছে সরকার। ইতোমধ্যে মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীন বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। এতে তৈরি হবে ৬০ হাজার লোকের কর্মসংস্থান। এরই মধ্যে চীন সরকারের সহায়তায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন দু’টি জেটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। তবে ভারতের ঋণে মোংলা বন্দরে আপাতত কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে না। ভারত সরকারের নাম করে যে সকল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল তাও বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা।
জানা গেছে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম মোংলা সমুদ্র বন্দরের উন্নয়নে বিশাল এক পরিকল্পনা নিয়ে প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেকটাই তৎপর ছিল। মোংলা বন্দরে চীনা আধিপত্য ঠেকানোর পাশাপাশি বঙ্গোপসাগরে নিজেদের কৌশলগত শক্ত অবস্থান ধরে রাখতে বাংলাদেশে বন্দর কেন্দ্রিক ব্যবসা বাণিজ্য বাড়ানোর মাধ্যমে নিজেদের অঙ্গরাজ্যগুলোতে সহজে পণ্য পরিবহনের পরিকল্পনা নিয়ে মোংলা বন্দরে বড় বিনিয়োগে আগ্রহী হয় দেশটি। কিছু বিনিয়োগও করেছিল ভারত সরকার। আর সেই অনুযায়ী রোডম্যাপ তৈরি করে কার্যক্রম শুরু করা হয়েছিল। কিন্তু ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ভারতের সেই উন্নয়ন পরিকল্পনা বেশি দূর আর অগ্রসর হতে পারেনি। আ’লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বতী সরকারের আমলেও প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে বাণিজ্যিক এবং কূটনৈতিক সম্পর্ক খুব একটা সফলতার মুখ দেখেনি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র থেকে জানা যায়, আ’লীগ সরকারের আমলে ভারতীয় তৃতীয় এলওসির আওতায় ২০২০ সালের জানুয়ারিতে ছয় হাজার ১৪ কোটি ৬১ লাখ টাকা ব্যয়ে ‘আপগ্রেডেশন অব মোংলা পোর্ট’ শীর্ষক প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল ভারতীয় পণ্য নৌপথে এ বন্দরে এনে সড়কপথে দেশটির অন্য অঞ্চলে নেওয়ার জন্য অবকাঠামো সুবিধা বাড়ানো। প্রকল্পের আওতায় গভীর সমুদ্রবন্দরের সক্ষমতা বাড়ানো, সমুদ্র, নদী, সড়ক ও রেলপথ নেটওয়ার্ক তৈরি করার কথা ছিল এই প্রকল্পের মাধ্যমে। মোংলা বন্দরের এ উন্নয়নের নাম করে দেশটি চার হাজার ৪৫৯ কোটি টাকা ঋণ দিতেও সম্মত হয়েছিল। এরই মধ্যে প্রকল্পের আওতায় পরামর্শক খাতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে। কিন্তু কৌশলগত কারণে সময়মতো ভারত তার প্রতিশ্র“তি অনুযায়ী সেই ঋণ ছাড় করেনি। এর পর থেকেই বন্দর উন্নয়ন, অগ্রগতি আর অবকাঠামোগত কার্যক্রম ঝিমিয়ে পড়ে।
চলতি বছরের ১৮ ফেব্র“য়ারি বিএনপি সরকার দেশ পরিচালনার দায়িত্ব নেয়। এর পরপরই মোংলা বন্দরের সকল উন্নয়মূলক প্রকল্প, অবকাঠামোগত কার্যক্রম ও আমদানি-রপ্তানির চিত্র পাল্টে যায়। বিএনপি সরকার রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার দায়ীত্ব নেয়ার পর প্রথম রাষ্ট্রীয় সফরে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান মালয়েশিয়া এবং চীন সফর করেন। সফরে বাংলাদেশে বিনিয়োগের জন্য চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং-এর সাথে বৈঠক করেন এবং বাংলাদেশের মোংলা বন্দরকে বিশে^র বানিজ্যিক বাজারে একটি আধুনিক বন্দরে রুপান্তিত করার পরিকল্পনা করেন। এছাড়াও চীনের সরকারি বেসরকারি কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে আলোচনার মাধ্যমে বাংলাদেশে চীনা বিনিয়োগের দ্বার উন্মোচিত হয়। এসময় বেশ কয়েকটি চুক্তি স্বাক্ষর হয়। এসকল চুক্তির আওতায় মোংলা বন্দরের পাশে ১১০ একর জমিতে ইকোনোমিক জোন তৈরি করার বিষয়ে দুই পক্ষ একমত হয়। 
নৌ পরিবহন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, দুই দেশের চুক্তি অনুযায়ী চলতি বছরের অক্টোবরে মোংলা ইকোনমিক জোনের প্রথম ধাপের কাজ শুরু করবে চীন। এটি সমাপ্ত হলে প্রথমেই দক্ষিন-পশ্চিমাঞ্চলে প্রায় ২৫ হাজার মানুষের কর্মসংস্থান তৈরি হবে মোংলা বন্দরের ইকোনমিক জোনে। পরবর্তীতে পর্যাক্রমে ইকোনমিক জোনের পরিধি বাড়ানো হলে ৬০ মানুষের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে।
এব্যাপারে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ জানায়, এরই মধ্যে চীন সরকারের সহায়তায় ৪ হাজার ৬৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নতুন দু’টি জেটি নির্মাণ করার পরিকল্পনা হাতে নেয়া হয়েছে। নতুন জেটি নির্মাণ হলে বন্দরে বেশি সংখ্যক জাহাজ আগমনের পাশাপাশি আমদানি রপ্তানি বহুগুণে বেড়ে যাবে, বৃদ্ধি পাবে বন্দরের রাজস্ব। বন্দর কর্তৃপক্ষের আশা করছে এবছরেই জেটি দু’টির নির্মাণ কাজ শুরু করা যাবে।
সব মিলিয়ে মোংলা বন্দরের যোগাযোগ ব্যবস্থায় আমূল পরিবর্তন আনতে মোংলা নদীর ওপর সেতু নির্মাণের বিষয়ে গত ১৬ আগস্ট মোংলায় একটি জনসমাবেশে নৌ পরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম ঘোষনা করেন, দ্রুততম সময়ের মধ্যে মোংলা নদীর ওপর ১০ম বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সেতু নির্মাণ করা হবে এবং মোংলা-খুলনা মহাসড়ককে ৪ লেনে উন্নীতকরণসহ বন্দর উন্নয়নে একটি বড় মহাপকিল্পনা করছে বর্তমান সরকার। বন্দর সংশ্লিষ্টরা জানান, মোংলা বন্দর আধুনিকায়নে চীন বড় অঙ্কের টাকা বিনিয়োগ করতে যাচ্ছে। ভারতের ঋণে মোংলা বন্দরে আপাতত কোন উন্নয়ন প্রকল্প গ্রহণ করা হচ্ছে না। ভারত সরকারের নাম করে যে সকল প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল তাও বন্ধ হওয়ার সম্ভাবনা বলে জানায় সংশ্লিষ্টরা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ