খুলনা | মঙ্গলবার | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৭ ভাদ্র ১৪৩৩

তিন মাসের অবরোধের সুফল মিলছে

সুন্দরবনে সজিবতা ফিরেছে প্রাণ প্রকৃতিতে দেখা মিলছে বাঘ-কুমিরের

এস এস সোহান, বাগেরহাট |
০১:৪৮ এ.এম | ০১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের চাঁদপাই রেঞ্জের আন্ধারমানিক টহল ফাঁড়ির সামনে রাজারমত হাঁটছে বনের রাজা রয়েল বেঙ্গল টাইগার। কিছুক্ষণ এদিক ওদিক করে চলে যায় বনের গভীরে। ২৪ জুলাই দুপুরে এ দৃশ্য ক্যামেরাবন্দি করেন বনকর্মীরা। এর দুই দিন পরে ২৬ জুলাই সকালে শরণখোলা রেঞ্জের কচিখালী অভয়ারণ্য এলাকায় নদী সাঁতরে একটি বাঘকে বনে প্রবেশ করতে দেখা যায়। বনকর্মীরা বাঘ দেখে আবেগে উল্লাস করেন। পাশাপাশি এই বাঘের ছবিও ক্যামেরা বন্দি করেন তারা। 
এর কিছুদিন পরে আগস্টের প্রথম দিকে ঢাংমারি নদী পার থেকে একটি ছাগলকে ধরে খেয়ে ফেলে বিশালাকৃতির কুমির। কুমিরের ছাগল শিকারের দৃশ্য স্থানীয় এক ব্যক্তি মুঠোফোনে ধারণ করেন। এটি ছড়িয়ে পড়লে বেশ আলোচনার সৃষ্টি হয়।
বাঘ-কুমিরের পাশাপাশি আর বনের কটকা, জামতলাসহ বিভিন্ন দেখা মিলছে হরিণের ঝাঁক। ঘুরে বেড়াতে দেখা গেছে বন্য শুকর, বানরসহ বিভিন্ন পশুকে। বন্য প্রাণিদের এমন বিচরণকে সুন্দরবনের অভ্যন্তরে তিন মাস জেলে বাওয়ালী, বনজীবী ও দর্শনার্থী বন্ধের সুফল হিসেবে মনে করছেন বন সংশ্লিষ্টরা।
বন বিভাগের দাবি টানা তিন মাস অবরোধের ফলে বনে বন্য প্রাণিদের চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে। নির্দিষ্ট এলাকার বাইরেও বিভিন্ন প্রাণির উপস্থিতি পাওয়া গেছে। এর পাশাপাশি বনে বেড়েছে সুন্দরী, গেওয়া, কেওড়া, বাইন, ছইলাসহ বিভিন্ন উদ্ভিদের ঘনত্ব।
বন কর্মকর্তা আব্দুল্লাহ আল মামুন বলেন, বন্ধের সময় সুন্দরবনে আসলে বন্য প্রাণিদের উপস্থিতি স্বাভাবিকের থেকে অনেক বেশি বলে টের পাওয়া গেছে। শুক্রবার সকালে নিয়মিত টহলের সময় বাঘের শরীরের গন্ধ টের পেয়েছি। হয়ত কিছুক্ষণ আগেই গেছে। 
বনরক্ষী শামীম বলেন, বন্ধের সময় জোয়ার ও ভাটা হিসেব করে আমরা ২৪ ঘন্টাই টহল দিয়ে থাকি। তবে এই সময়ে শুকর, হরিণ, শাপের দেখা পাওয়া যায়। আর বনের মধ্যে খালেও মাছ বেড়েছে। ট্রলার চলার ডেউয়ে চিংড়ি, দাতিনাসহ বিভিন্ন মাছ লাফালাফি করে। এটা স্বাভাবিক সময়ে অত বেশি দেখা যায় না। তবে অবরোধের এই সময়ে সুন্দরবনে জেলে, বাওয়ালী, বনজীবী ও পর্যটকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ থাকলেও অপরাধিরা সুযোগ খোঁজে বনে প্রবেশের। এ কারণে অবরোধের এই সময়ে বন অপরাধের শঙ্কা বেশি থাকে। বন অপরাধীদের রুখে দিতে এই সময়ে স্বাভাবিকের তুলনায় টহল জোরদার করা হয়েছিল বলে বলে জানান শরণখোলা রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক মোঃ শরিফুল ইসলাম।
তিনি বলেন, অবরোধ কার্যক্রম বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকের তুলনায় টহল জোরদার ও স্মার্ট টহল কার্যক্রম মাসে ৭ দিনের স্থানে ২০ দিন করা হয়েছিল। এছাড়া জোয়ার-ভাটার উপর ভিত্তি করে ২৪ ঘন্টা টহল দেওয়া হয়েছে, যার ফলে বন অপরাধও কমেছে বিগত বছরগুলোর তুলনায়। 
তিনি আরও বলেন, সুন্দরবনের বনজ সম্পদ, জীববৈচিত্র, বন্য প্রাণি ও মাছসহ জলজ্ব প্রাণির প্রজনন সুরক্ষায় তিন মাসের নিষেধাজ্ঞা ৩১ আগস্ট রাতে শেষ হচ্ছে। ১ সেস্টেম্বর থেকে বনে প্রবেশ করবেন দর্শনার্থী ও বনজীবিরা। দৃশ্যমান হয়েছে অবরোধ কার্যক্রমের সুফল। সুন্দরবনে ফিরেছে সজিবতা, সেই সাথে দেখা মিলছে বাঘ, কুমির, হরিণ, বানরসহ বিভিন্ন প্রাণির। সুন্দরবনকে টিকিয়ে এমন অবরোধের প্রয়োজনীয় রয়েছে বলে মনে করেন এই বন কর্মকর্তা।
এদিকে নিষেধাজ্ঞা শেষ হওয়ায় সুন্দরবনে মাছ ধরতে যাওয়ার জন্য নৌকা ও জাল মেরামতসহ সব ধরণের প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে উপকূলের জেলেরা। যেহেতু তিন মাস কেউ মাছ ধরেনি এবার পর্যাপ্ত মাছ পাবে এমন প্রত্যাশা সুন্দরবনের জেলেদের।
শরণখোলা উপজেলার জেলে মাসুম খান বলেন, নৌকা ও জাল প্রস্তুত করেছি। দু-একদিনের মধ্যেই সুন্দরবনে যাব। যেহেতু তিন মাস কেউ মাছ ধরেনি আশা করি এবার ভাল মাছ পাব। 
অন্যদিকে ভ্রমণ পিপাসুদের স্বাগত জানাতে পর্যটকবাহী জাহাজ, ট্রলার, নৌযান এবং ট্যুর অপারেটরগুলো তাদের সকল প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে। ট্যুর ব্যবসায়ীদের আশা অনুকূল পরিবেশ থাকলে এবার বাড়বে সুন্দরবনমুখী পর্যটকের সংখ্যা। 
সুন্দরবন পূর্ব বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা-ডিএফও মোঃ রেজাউল করিম চৌধুরী জানান, “মাছের প্রজনন মৌসুম থাকায় তিন মাস সুন্দরবন বন্ধ রাখা হয়। এর ফলে সুন্দরবনের বিভিন্ন খালে আমরা মাছের ব্যপক উপস্থিতি দেখা গেছে। শুধু মাছ নয়, বন্য প্রাণিগুলোও এই সময়ে স্বাচ্ছন্দে ঘুরে বেড়ায়। প্রচুর হরিণের ঝাঁক ও বাঘ কিন্তু দেখা যাচ্ছে। খাল পাড়ে এসে বসে থাকছে বাঘ, আমি নিজেও বাঘের ছবি তুলেছি। সব মিলিয়ে এই অবরোধের যে সুফল রয়েছে, তা আমরা পেয়েছি।”
পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী ড. শেখ ফরিদুল ইসলাম বলেন, টানা তিন মাস বন্ধের সময় বনের প্রাণ-প্রকৃতি একটা দীর্ঘ বিরতি পেয়েছে। এখানে বন্য প্রাণি ও মাছের প্রজনন বৃদ্ধি পাওয়ার পাশাপাশি প্রাণ প্রকৃতির মধ্যে নতুনত্ব এসেছে। সবকিছু মিলিয়ে বন্য প্রাণি ও বন এই সময়ে অনেক ভাল ছিল। বনের প্রাণ প্রকৃতি ও অভয়ারণ্য সুরক্ষা করেই সুন্দরবনের কর্মপরিবেশ চালাতে হবে। বিশেষ করে যারা পর্যটক ও বনজীবীদের বনের নিয়ম কানুন মেনে বনে যাওয়ার আহŸান জানান তিনি।
সুন্দরবন পূর্ব ও পশ্চিম বন বিভাগে ১৪টি পর্যটন কেন্দ্র রয়েছে যেখানে প্রতিবছর কয়েক লক্ষ মানুষ ভ্রমণ করেন। এছাড়া বন বিভাগকে নির্দিষ্ট পরিমাণ ফি দিয়ে বছরের বিভিন্ন সময় অর্ধলক্ষ বনজীবি মাছ, গোলপাতা ও মধু আহরণ করে থাকেন। ২০২১ সাল থেকে প্রতিবছর এই সময়ে সুন্দরবন রক্ষা ও প্রাণিদের প্রজনন নিশ্চিত করতে বন বিভাগ এ নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়ন করে আসছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ