খুলনা | বৃহস্পতিবার | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩

‘লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে দেশে বিশেষ অভিযান শুরু হচ্ছে’

সুন্দরবনের পুনর্বাসিত দস্যুরা অপরাধে জড়িয়ে পড়েছেন : ব্রিফিংয়ে র‌্যাব ডিজি

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০২:০৮ এ.এম | ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত করতে একের পর এক আত্মসমর্পণ করানো হলেও অনেকে পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকান্ডে জড়িয়ে পড়েছেন। মঙ্গলবার নতুন করে ৫৯ জন দস্যু র‌্যাবের কাছে আত্মসমর্পণ করেন। তাদের মধ্যে আটজন রয়েছেন, যারা আগেও আত্মসমর্পণ করেছিলেন। এই আটজন আত্মসমর্পণের পর পুনর্বাসিত হয়েও অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ফিরে যান। বুধবার বেলা সাড়ে ১১টায় খুলনায় র‌্যাব-৬ কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান র‌্যাপিড এ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক মোঃ আহসান হাবীব পলাশ। আগের দিন মঙ্গলবার সুন্দরবনের ৫৯ জন বনদস্যুর আত্মসমর্পণ, অস্ত্র উদ্ধার, খুলনাসহ সারাদেশে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে এ প্রেস ব্রিফিংয়ের আয়োজন করা হয়।
চব্বিশের আন্দোলন চলাকালে পুলিশসহ বিভিন্ন বাহিনীর লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধারে সারাদেশে বিশেষ অভিযান শুরু করবে র‌্যাব। অস্ত্র উদ্ধারে ইতিমধ্যেই র‌্যাবকে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংস্থাটির মহাপরিচালক। অস্ত্র উদ্ধারে তথ্য প্রদানকারীদের পুরস্কার প্রদানের পাশাপাশি নাম-পরিচয় গোপন রাখা হবে। অলরেডি কাজ শুরু হয়েছে বলে মন্তব্য করেন র‌্যাব প্রধান।
আত্মসমর্পণ করা ৫৯ জনের মধ্যে বড় জাহাঙ্গীর বাহিনীর ১৬ জন, আনরুল বাহিনীর ১৩ জন, আফজাল ওরফে দুলাভাই বাহিনীর ১৫ জন, আফতার বাহিনীর আটজন এবং মিজান বাহিনীর সাতজন রয়েছেন।
সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকায় অভিযান চালিয়ে বিপুল অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার করেছে র‌্যাব। উদ্ধার করা হয়েছে ৫৯টি আগ্নেয়াস্ত্র, ৫৪১ রাউন্ড তাজা গুলি, ১৪টি খালি কার্তুজ ও সাতটি ওয়াকিটকি। উদ্ধার হওয়া অস্ত্রের মধ্যে রয়েছে চারটি শটগান, ৪৭টি ওয়ান শ্যুটার গান, চারটি পাইপগান, তিনটি এয়ারগান এবং একটি পয়েন্ট ২২ বোর রাইফেল।
র‌্যাব বলছে, সুন্দরবনের জলদস্যু ও বনদস্যু দমনে র‌্যাব, কোস্ট গার্ড, স্থানীয় প্রশাসন, নৌপুলিশ ও বন বিভাগের সমন্বয়ে ‘অপারেশন রি-স্টার্ট, পিস ইন সুন্দরবন’ নামে বিশেষ অভিযান চলছে। গণ ২ মার্চ থেকে ধারাবাহিকভাবে এ অভিযান চালানো হচ্ছে। 
২০১৬ সাল থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত আত্মসমর্পণকারী ৩২৮ জন দস্যুর মধ্যে ৩০ জন পুনরায় অস্বাভাবিক জীবনে ফিরে গেছেন। এর মধ্যে উপস্থিত আত্মসমর্পণকারী ৮ জন রয়েছেন।
র‌্যাব মহাপরিচালক আহসান হাবীব পলাশ জানান, সুন্দরবনে বর্তমানে চার থেকে পাঁচটি দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এসব বাহিনীর সদস্যদের অপরাধের পথ ছেড়ে স্বাভাবিক জীবনে ফেরানোর চেষ্টা চলছে।
অতীতে আত্মসমর্পণকারীদের মধ্য থেকে অপরাধমূলক কর্মকান্ডে পুনরায় জড়িয়ে পড়ার বিষয়ে তিনি বলেন, এ পর্যন্ত সুন্দরবনের ৩১৮ জন দস্যু আত্মসমর্পণ করেছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জন পুনরায় অপরাধমূলক কর্মকান্ডে ফিরে গেছে। আত্মসমর্পণকারীদের একটি অংশ পুনর্বাসনের সুযোগ পাওয়ার পরও কেন আবার অপরাধে ফিরছে, সেটিই এখন নতুন করে ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তার ভাষ্য, সামাজিক চাপ, রাজনৈতিক কারণ, সচেতনতার অভাব, স্বাভাবিক জীবনে ফিরতে অনীহা এবং হয়রানির ভয়, এসব কারণে কেউ কেউ আবার অপরাধে জড়িয়ে পড়ছে। তিনি বলেন, আমরা ১০০ শতাংশ তো আর আনতে পারব না। যেহেতু আমরা তাদের সার্বক্ষণিক নজরদারি করতে পারি না। আর কিছু বাস্তব সীমাবদ্ধতাও থাকে।
আত্মসমর্পণকারীদের বিষয়ে নজরদারি নেই, এমনটি নয় বলেও জানান র‌্যাব মহিপরিচালক। তিনি বলেন, র‌্যাবের গোয়েন্দা নজরদারি অব্যাহত রয়েছে। আত্মসমর্পণের পর কেউ আবার অপরাধে জড়াচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে।
তবে অতীতের অভিজ্ঞতা থেকে এবার পুনর্বাসন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করার ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে জানিয়ে আহসান হাবীব পলাশ বলেন, আত্মসমর্পণকারীদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে আগের চেয়ে ভালো পুনর্বাসন ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগ শুরু হয়েছে। এ বিষয়ে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে আলোচনা চলছে।
আত্মসমর্পণকারীদের অহেতুক মামলা ও হয়রানি নিয়ে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, সুনির্দিষ্ট অভিযোগ বা প্রমাণ ছাড়া কাউকে আটক কিংবা মামলা দেওয়া উচিত নয়। ভবিষ্যতে আত্মসমর্পণকারীরা যাতে অহেতুক হয়রানির শিকার না হন, সে বিষয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের সতর্ক করা হয়েছে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা জোরদারে সেখানে একটি র‌্যাব ব্যাটালিয়ন গঠন করার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন আহসান হাবীব পলাশ। তিনি বলেন, বর্তমানে সুন্দরবন এলাকায় কোস্ট গার্ডের একটি ক্যাম্প রয়েছে। সুন্দরবনবাসী চাইলে সেখানে র‌্যাবের একটি ব্যাটালিয়ন গঠনের জন্য সরকারের কাছে আবেদন করা যেতে পারে।
এ সময় দেশব্যাপী বিশেষ অভিযান শুরু করার কথাও জানান র‌্যাব মহাপরিচালক। তিনি বলেন, র‌্যাবের নেতৃত্ব ও নির্দেশনায় পুলিশসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী যৌথভাবে এ অভিযান পরিচালনা করবে। এর কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে এ বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য জানানো হবে।
অভিযানে তথ্য দিয়ে সহযোগিতার জন্য গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষের প্রতি আহŸান জানিয়ে তিনি বলেন, তথ্যদাতাদের পরিচয় গোপন রাখা হবে। তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করেই আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করবে।
সুন্দরবনকে দস্যুমুক্ত রাখতে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অব্যাহত থাকবে বলে জানিয়েছেন র‌্যাব মহাপরিচালক। একই সঙ্গে উপক‚লীয় মানুষের নিরাপত্তা, বনজীবীদের জীবন-জীবিকা এবং দেশের মূল্যবান প্রাকৃতিক সম্পদ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে বলেও জানান তিনি।
আহসান হাবীব পলাশ আরও বলেন, ‘সামাজিক-রাজনৈতিক কারণ ও হয়রানি হওয়ার ভয় ইত্যাদি কারণে তাঁরা অপরাধ কর্মকাÐে ফিরে যান। এ ছাড়া কিছু মানুষের অপরাধ প্রবণতা থাকে। তবে সার্বিকভাবে র‌্যাবের সাফল্য উল্লেখযোগ্য। যাঁরা আত্মসমর্পণ করেছেন বা করবেন, তাঁদের স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে গণবার যে আর্থিক ব্যবস্থা ছিল, তার থেকে আরও কার্যকর ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছি। যাঁরা স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসবেন, তাদের পুনর্বাসনের ব্যবস্থা কার্যক্রম অব্যাহত থাকবে।’
র‌্যাবের মহাপরিচালক আরও বলেন, ‘সুন্দরবনে শান্তি ফিরিয়ে আনাই আমাদের লক্ষ্য। আমরা সন্ত্রাসী-অপরাধীদের সম্পর্কে খোঁজ খবর রাখছি। অপরাধীদের অর্থ জোগানদাতা, আশ্রয়-প্রশ্রয়দাতাদের কেউই পার পাবে না।’
খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি মারাত্মক খারাপের বিষয়টি নজরে আনা হলে র‌্যাবের ডিজি বলেন, খুলনার আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি উন্নয়নের বিষয়ে কাজ করছি। ইতিমধ্যেই সরকারের কাছ থেকে বিশেষ নির্দেশনা পেয়েছি। সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ