খুলনা | শনিবার | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২১ ভাদ্র ১৪৩৩

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাব, জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে

বিশ্ব খাদ্যবাজারে নতুন ঝুঁকি, বাড়ছে দাম : জাতিসংঘের প্রতিবেদন

খবর প্রতিবেদন |
০১:৩৪ এ.এম | ০৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের পাতে খাবারের খরচ আবারও হু হু করে বাড়ছে। প্রকৃতি আর মানুষের তৈরি নানা সংকট একসঙ্গে মাথাচাড়া দিয়ে ওঠায় আন্তর্জাতিক বাজারে খাদ্যপণ্যের দাম এক লাফে বেশ অনেকটা বেড়ে গেছে।  
জলবায়ু পরিবর্তন, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা ও সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তার মধ্যে বিশ্ববাজারে আবারও বেড়েছে খাদ্যপণ্যের দাম। আগস্টে জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) খাদ্যপণ্যের মূল্যসূচক জুলাইয়ের তুলনায় ২ দশমিক ৫ পয়েন্ট বেড়ে ১৩৩ দশমিক ৩ পয়েন্টে পৌঁছেছে। শুক্রবার প্রকাশিত এফএওর প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানায়, আগস্টে খাদ্যশস্য, ভোজ্যতেল, চিনি, মাংস ও দুগ্ধজাত পণ্যের দাম বেড়েছে।
এফএও বলছে, ইউরোপে তীব্র দাবদাহ ও খরা, এশিয়ায় সম্ভাব্য এল নিনোর প্রভাব এবং ইউক্রেন ও ইরানকে ঘিরে যুদ্ধ ও বাণিজ্যিক অস্থিরতা কৃষিপণ্যের সরবরাহে অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
আগস্টে খাদ্যশস্যের মূল্যসূচক ২ দশমিক ২ শতাংশ বেড়ে ২০২৪ সালের মে মাসের পর সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে। ভোজ্যতেলের মূল্যসূচক বেড়েছে শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ, যা ২০২২ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ। চিনির মূল্যসূচক বেড়েছে ১১ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ২০২৫ সালের জুনের পর সর্বোচ্চ।
জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) জানিয়েছে, আবহাওয়া খারাপ হওয়া এবং কৃষ্ণসাগর অঞ্চলে যুদ্ধ বেড়ে যাওয়ার কারণে সবজির তেল থেকে শুরু করে চাল-গম সবকিছুর জোগানে বড় ধাক্কা লেগেছে। ফলে গত আগস্ট মাসে বিশ্ববাজারে খাবারের দাম ২০২২ সালের শেষের দিকের পর সবচেয়ে উঁচুতে গিয়ে ঠেকেছে।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর যুদ্ধের দাপটে কৃষি বাজার এখন দিশেহারা। ইউরোপজুড়ে চলছে রেকর্ড তাপদাহ আর খরা, যার দরুন মাঠের পর মাঠ ফসল শুকিয়ে কাঠ হয়ে যাচ্ছে। আবার এশিয়ায় ‘এল নিনো’ নামের চরম গরম আবহাওয়ার চোখরাঙানি তৈরি হয়েছে। 
অন্যদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ সাড়ে চার বছরে গড়ালেও কৃষ্ণসাগরে নতুন করে হামলা বাড়ায় সেখান থেকে গম বা শস্য অন্য দেশে পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। এর ওপর যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের টানাপোড়েনের কারণে জমিতে দেওয়ার সার ঠিকমতো সরবরাহ করা যাচ্ছে না। সব মিলিয়ে শস্যের বাজার যেমন তিন বছরের মধ্যে সবচেয়ে মহার্ঘ্য হয়ে উঠেছে, তেমনি চিনির দামও গত এক বছরের হিসাব ভেঙে ওপরে উঠেছে।
পরিসংখ্যানের খাতা খুলে দেখলে দেখা যায়, আগস্ট মাসে শস্যের দাম তো বেড়েছেই, সেই সাথে রান্নার তেল, চিনি, মাংস এমনকি দুধ বা মাখনের মতো দুগ্ধজাত পণ্যের দরও চড়া ছিল। তবে সবচেয়ে বেশি যে জিনিসে আগুন লেগেছে, তা হলো চিনি। শুধু আগস্ট মাসেই চিনির দাম প্রায় ১২ শতাংশের মতো লাফ দিয়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বেশি চিনি উৎপাদনকারী দেশ ব্রাজিলে উৎপাদনে টান পড়া আর ইউরোপ-এশিয়ায় খারাপ আবহাওয়াই এর প্রধান কারণ। রান্নার তেলের দামও চার বছরের মধ্যে সবচেয়ে উঁচুতে উঠেছে।
জাতিসংঘের খাদ্য সংস্থার প্রধান অর্থনীতিবিদ মাক্সিমো তোরেরোর মতে, আগস্টে খাবারের দাম বাড়াটা আসলে বিশ্ববাসীর জন্য একটা বড় সতর্কবার্তা। জলবায়ুর ধাক্কা, যুদ্ধের উত্তেজনা আর পণ্য পরিবহনের পথ বন্ধ হয়ে যাওয়া, এই তিনটি বিপদ যখন একসাথে হাত মেলায়, তখন বাজারে খাবারের অভাব তৈরি হওয়াটাই স্বাভাবিক।
জলবায়ু পরিবর্তনের ধাক্কা, ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং বাণিজ্য ও পরিবহনব্যবস্থা ব্যাহত হওয়ায় সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা বাড়ছে।
এদিকে, ২০২৬ সালে বিশ্বে মোট শস্য উৎপাদনের পূর্বাভাস ৩ দশমিক ৪ মিলিয়ন মেট্রিক টন কমিয়ে ২ দশমিক ৯৮০ বিলিয়ন টন করেছে এফএও। নতুন পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০২৫ সালের তুলনায় চলতি বছর বৈশ্বিক শস্য উৎপাদন ২ শতাংশ কমতে পারে।
সংস্থাটি বলছে, ২০১৮ সালের পর বার্ষিক শস্য উৎপাদনে এটি সবচেয়ে বড় পতন হতে পারে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে শস্য সরবরাহে বিঘœ এবং ইরানকে ঘিরে সংঘাতের কারণে সারের সরবরাহে চাপ বৈশ্বিক খাদ্যবাজারের ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে তুলছে।
অন্যদিকে, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের প্রভাবে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ায় খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষ করে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি পরিবহনপথ হরমুজ প্রণালী ঘিরে অনিশ্চয়তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে। এ পথে বিশ্ববাজারে বিপুল পরিমাণ তেল সরবরাহ হয়।
হরমুজ প্রণালীতে অস্থিরতা দীর্ঘস্থায়ী হলে জ্বালানি সংকট আরও তীব্র হতে পারে, যার প্রভাব পড়বে খাদ্যবাজারেও। এতে খাদ্য আমদানিনির্ভর দেশগুলোতে বাড়তে পারে মূল্যস্ফীতির চাপ।
বিশ্লেষকদের আশঙ্কা, সংঘাত দ্রুত প্রশমিত না হলে জ্বালানি ও খাদ্যপণ্যের সরবরাহব্যবস্থায় আরও চাপ তৈরি হবে। এর ফলে বৈশ্বিক খাদ্য নিরাপত্তা নতুন করে হুমকির মুখে পড়তে পারে।
জাতিসংঘ অন্য একটি প্রতিবেদনে আরও একটি দুঃসংবাদ দিয়েছে। তারা আগে ধারণা করেছিল এ বছর বিশ্বজুড়ে প্রচুর শস্য ফলবে, কিন্তু আবহাওয়ার পরিস্থিতি দেখে সেই হিসাব থেকে আরও ৩৪ লাখ টন শস্যের কথা বাদ দেওয়া হয়েছে। যদিও এই বছর যা ফসল ফলবে তা ইতিহাসের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, তবুও গত বছরের তুলনায় হিসাব করলে ২০১৮ সালের পর এত বড় ধরনের উৎপাদন ঘাটতি পৃথিবী আর দেখেনি। একের পর এক সংকটে বিশ্বজুড়ে খাদ্য নিরাপত্তার যে অন্ধকার মেঘ জমছে, তা এখন কাটানোই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। 
সূত্র: রয়টার্স।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ