খুলনা | সোমবার | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৩ ভাদ্র ১৪৩৩

স্যাকমো অমিতের অপচিকিৎসায় মৃত্যু শয্যায় চিতলমারীর লাভলী

মোবাইলে আলো জ্বেলে ৩ ঘন্টাব্যাপী অপারেশনের অভিযোগ বেঁচে নেই নবজাতক, কেটে ফেলেছে জরায়ু, মূত্রথলি

এস এস সোহান ও এস এস সাগর, বাগেরহাট |
০২:২১ এ.এম | ০৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বাগেরহাটের চিতলমারীতে মোবাইলে আলো জ্বেলে প্রায় ৩ ঘন্টা ধরে লাভলী ঘরামী (২৯) নামের এক প্রসূতির অস্ত্রোপচার (অপারেশন) করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টি সেন্টারের স্যাকমো অমিত মন্ডলের বিরুদ্ধে ওই রোগীর স্বজনেরা এ অভিযোগ তুলেছেন। স্বজনদের অভিযোগ অমিত মন্ডলের অপচিকিৎসায় লাভলী ঘরামী এখন মৃত্যু শয্যায়। অস্ত্রপচার করতে গিয়ে লাভলী ঘরামীর জরায়ু কেটে ফেলা হয়েছে এবং মূত্রথলি ছিদ্র করেছে। বেঁচে নেই তাঁর নবজাতকটি। সে আর কোন দিন মা হতে পারবেন না। 
লাভলী ঘরামী উপজেলার চরবানিয়ারী রানাপাড়া গ্রামের শমরেস ঘরামীর স্ত্রী। তবে হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম ও স্যাকমো অমিত মন্ডল সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। লাভলী ঘরামীর স্বামী শমরেস ঘরামী জানান, তার স্ত্রী তৃতীয় বারের মত ৯ মাসের অন্তঃসত্তা ছিলেন। চিকিৎসার জন্য তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক ডাঃ সজল কান্তি বিশ্বাসকে দেখান। রোগীর প্লাসেন্টা প্রিভিয়ার কারনে চিকিৎসক সজল কান্তি বিশ্বাস তাকে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। অস্ত্রপচারের পর রোগীর যে সকল সাপোর্টের প্রয়োজন তা অন্য কোথাও নেই। পরবর্তীতে তিনি খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতারের গাইনী ও প্রসূতি বিশেষজ্ঞ সার্জন মোসাঃ পারুল আক্তারে কাছে গেলে তিনিও একই পরামর্শ দেন। কিছুদিন পর শমরেসের স্ত্রী অসুস্থ হলে স্থানীয় হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারে নিয়ে যান। ওই ক্লিনিকের স্যাকমো অমিত মন্ডল লাভলী ঘরামীকে তাদের ক্লিনিকে ৫০ হাজার টাকার চুক্তিতে অস্ত্রোপচারের পরামর্শ দেন। কথা ছিল বাইরে থেকে অভিজ্ঞ চিকিৎসক এনে অস্ত্রোপচার করাবেন। কিন্তু ২৭ জুলাই সন্ধ্যায় অমিত, রুপম ও ক্লিনিকের রফিক তার স্ত্রীকে অস্ত্রোপচার করার জন্য অপারেশন থিয়েটারে নিয়ে যান। এ সময় তিনি ক্লিনিকে অন্য কাউকে দেখতে পাননি। অস্ত্রোপ্রচারকালে বিদ্যুৎ চলে গেলে জেনারেটর চালু না হওয়ায় তারা মোবাইলের আলো জ্বেলে তার স্ত্রীকে অপারেশন করেন। তার স্ত্রীর অপারেশন শেষে হতে প্রায় ৩ ঘন্টা সময় লাগে। পরববর্তীতে তাদের একটি পুত্র সন্তান হয়। নবজাতক অসুস্থ হলে তাকে গোপালগঞ্জ আইসিইউতে পাঠানো হয়। ৭ দিন পর নবজাতকটি মারা যায়। অস্ত্রোপচারের পর থেকে তার স্ত্রীর অনবরত প্রসাব ঝরতে থাকে। ২ আগস্ট তার স্ত্রীকে নিয়ে বাড়িতে আসেন। ৩ আগস্ট স্ত্রী অসুস্থ হয়ে পড়লে তাকে পুনরায় হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের ভর্তি করেন। পরের দিন ক্লিনিক কর্তৃপক্ষ লাভলী ঘরামীকে খুলনার একটি ক্লিনিকে ভর্তি করেন। সেখান থেকে তারা খুলনা মেডিকেল কলেজের সহকারী অধ্যাপক চিকিৎসক ডাঃ সজল কান্তি বিশ্বাসকে দেখান ও খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিষেশায়িত হাসপাতালের চিকিৎসক এস এম হুমায়ুন কবীর অপুর পরামর্শমতে পরীক্ষা নিরীক্ষা করান। পরীক্ষায় অপচিকিৎসার কারনে লাভলী ঘরামীর জরায়ু কাটা হয়েছে এবং মুত্রথলি ছিন্দ্র হয়েছে বলে ধরা পড়েছে। দীর্ঘ ৩৮ দিন চিকিৎসার পর রবিবার (৬ সেপ্টেম্বর) শমরেস ঘরামী তার স্ত্রীকে নিয়ে চরবানিয়ারী রানাপাড়া গ্রামে ফিরেছেন। তার স্ত্রী বর্তমানে মৃত্যু শয্যায়। তাদের প্রাঙ্গন (১২) ও পৃথা ঘরামী (৬) নামের দু’টি সন্তান রয়েছে। শমরেস ঘরামী এই অপচিকিৎসাকারীদের বিচার দাবি করেছেন। 
অসুস্থ লাভলী ঘরামী কাতরকন্ঠে বলেন, ‘আমার অপারেশন তিন ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে করা হয়েছে। আমি দেখেছি, অমিত মন্ডলই আমার অপারেশন করেছেন। সেখানে কোনো ডাক্তারকে দেখিনি। আমার ছোট ছোট সন্তান রয়েছে। আমি এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার চাই।’
তবে অভিযোগ অস্বীকার করে হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের স্যাকমো অমিত মন্ডল বলেন, ‘আমি ওই রোগীর কোনো অপারেশন করিনি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন। ওই সিজারের অপারেশন করেছেন ডাঃ নাসির উদ্দিন।’ 
হাবিবা ক্লিনিক এন্ড বারিশ ডায়াগনস্টিক সেন্টারের পরিচালক সাব্বির আহম্মেদ রুপম অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার ক্লিনিকে সবকিছু নিয়ম অনুযায়ী চলছে। এখানে কোনো ধরনের অনিয়ম নেই।’
চিকিৎসক নাসির উদ্দিন মুঠোফোনে বলেন, ‘আমি গাড়ির ভিতরে আছি। গাড়ি থেকে নেমে আমি আপনাকে পরে ফোন দিব। তবে রোগীর সুস্থতার জন্য আমি এবং ক্লিনিক মালিক সহযোগিতা করব। আপনি অস্ত্রোপচার করেছেন কি না এমন প্রশ্নে তিনি ফোন কেটে দেন।’
এ ব্যাপারে জানতে খুলনা শহীদ শেখ আবু নাসের বিশেষায়িত হাসপাতালের চিকিৎস এ এস এম হুমায়ুন কবীর অপুকে বার বার ফোন দিলেও যোগযোগ করা সম্ভব হয়নি।
তবে চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা চিকিৎসক শর্মী রায় বলেন, ‘এ  ধরনের কোন অভিযোগ আমি পাইনি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করব। একজন মেডিকেল এ্যাসিস্ট্যান্ট ব্যবস্থাপত্রে নিজের নামের আগে ডাঃ লিখতে পারেন না।’ 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ