খুলনা | বৃহস্পতিবার | ১০ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৬ ভাদ্র ১৪৩৩

শরণখোলায় মাদ্রাসা অধ্যক্ষের বিরুদ্ধে ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের পানির ট্যাংকি বিক্রির অভিযোগ

নিজস্ব প্রতিবেদক, বাগেরহাট |
১১:৫৯ পি.এম | ০৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বাগেরহাটের শরণখোলায় ঘূর্ণিঝড় আশ্রয় কেন্দ্রের পানির ট্যাংকি অনিয়ম করে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওঃ আব্দুল ওহাবের বিরুদ্ধে। সুপেয় পানির সংকট নিরসনে আশ্রয়কেন্দ্রে নির্মিত পানির ট্যাংকি বিক্রি করায় তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। 
২০০৭ সালে প্রলয়ঙ্করী ঘূর্ণিঝড় সিডরে ক্ষতিগ্রস্ত উপকূলীয় এলাকার মানুষের জন্য একটি বিশেষ ত্রাণ ও অবকাঠামোগত উন্নয়ন প্রকল্প ‘ফায়েল খায়ের’ (Fael Khair) কর্মসূচির নেয়া হয়। ২০১৪ সালের মার্চে স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টার নির্মাণ করে দেয় ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংকের সহায়তায়। তখন থেকে ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার শিক্ষাকার্যক্রম পরিচালনা হয়ে আসছে ওই আশ্রয় কেন্দ্রে। স্থানীয় সূত্র জানায়, দুর্যোগকালীন সময়ে আশ্রয়কেন্দ্রে আসা মানুষের সুপেয় পানির সংকট নিরসনে দু’টি পানির ট্যাংকি নির্মাণ করে দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছোট ট্যাংকিটি কিছু দিন পূর্বে মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওঃ আব্দুল ওহাব অন্যত্রে বিক্রি করে দেয়। এর কিছুদিন পর পাথরের তৈরি পানির রিজার্ভ বড় ট্যাংকি ৬০ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেয় অধ্যক্ষ। ট্যাংকিটি প্রায় ২০ দিন ধরে ড্রিল মেশিন দিয়ে ৩-৪ জন শ্রমিক এক তৃতীয়াংশ ভেঙে নিতে পারেনি। কোনো ধরনের কর্তৃপক্ষের অনুমোদন কিংবা রেজুলেশন ছাড়াই অধ্যক্ষ এটি বিক্রি করে দেন। পানির ট্যাংকিটি এভাবে সরিয়ে নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে।  
সরেজমিনে দেখা যায়, স্কুল-কাম-সাইক্লোন শেল্টারে পরিচালিত ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার নিচে পানি সংরক্ষণের জন্য পাথরের তৈরি রিজার্ভ ট্যাংকির বেশ কিছু অংশ ভেঙে ফেলা হয়েছে। ভাংগা পাথরের অংশ পাশেই স্তুপ করে রাখা হয়েছে। সেখানে কয়েকজনের সাথে কথা বলে জানা গেছে, বেশ কিছুদিন ধরে ১০ হাজার লিটার পানি ধারণ ক্ষমতা সম্পন্ন কংক্রিটের ট্যাংকি ভেঙে ফেলা হচ্ছে। কি কারণে ভাঙা হচ্ছে জানতে চাইলে তারা কিছুই জানেন না বলে জানান।  
নুরানী মাদ্রাসার শিক্ষক আবু দাউদ বলেন, দুর্যোগকালীন সময়ে যখন সুপেয় পানির সংকট হবে তখন এই ট্যাংকির ভালো পানি ব্যবহার করতে পারবে। তার জন্য বিশাল আকারের একটি ট্যাংকি তৈরী করেছিল। কেন ভাঙছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ স্যার যানে। 
ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার ইংরেজী বিভাগের প্রভাষক আবু খায়ের বলেন, পানির ট্যাংকিটি ব্যবহার হচ্ছে না, ক্লাস রুম তৈরী করার জন্য এটা ভেঙে ফেলা হচ্ছে। তবে কমিটির সিদ্ধান্ত কিনা তা আমার জানা নেই, তবে কমিটির লোকজন জানেন। 
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক স্থানীয় বাসিন্দা জানান, ঘূর্ণিঝড় বা যেকোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আশ্রয়কেন্দ্রে সুপেয় পানির তীব্র সংকট তৈরি হয়। পানির ট্যাংকিটি বিক্রি করে দিয়ে অধ্যক্ষ সাধারণ মানুষের সাথে চরম অন্যায় করেছেন। আমরা এই ঘটনার সঠিক তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”  
ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওঃ আব্দুল ওহাব বলেন, কমিটির অনুমোদন নিয়ে রেজুলেশন করে ভেঙে ফেলা হচ্ছে। বিক্রি করার বিষয়টি তিনি অস্বীকার করেন। বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠান ফায়েল খায়ের কর্তৃপক্ষ বিষয়টি জানেন কিনা জানতে চাইলে অধ্যক্ষ বলেন, বেশ কিছুদিন আগে কর্তৃপক্ষের ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম আলী শাহ এখানে পরিদর্শনের এসে ভাঙার নির্দেশনা দিয়েছেন। 
ধানসাগর নলবুনিয়া আলিম মাদ্রাসার ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি আব্দুল জলিল আনোয়ারী বলেন, ভাঙার বিষয়টি নিয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ডেকেছেন। যদি নিয়ম বহির্ভূতভাবে ভাঙা হয় এবং স্থানীয়দের জন্য প্রয়োজন হয় তাহলে আবার নির্মাণ করে দেওয়া হবে। 
উন্নয়ন প্রকল্প ফায়েল খায়ের (ইসলামী উন্নয়ন ব্যাংক) ইঞ্জিনিয়ার ইব্রাহীম আলী শাহ বলেন, এগুলো তো ভেঙে ফেলার কথা নয়। কেন ভাঙা হয়েছে, সেটিও আমি জানি না। তবে অকার্যকর হলেই যে সেটি ভেঙে ফেলতে হবে, বিষয়টি এমন নয়। এটা ভেঙে ফেলার কোন অনুমতি আমাদের এখান থেকে দেওয়া হয়নি। এধরনের স্থাপনা ভাঙতে হলে সংশ্লিষ্ট আইডিবি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে আগে অনুমতি নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে। অথচ সেটি ভেঙে ফেলার বিষয়টি আমি আপনার কাছ থেকেই এখন জানতে পারছি। তিনি বলেন, ২০২৫ সালের জুন মাসে আমি পরিদর্শনে গিয়েছিলাম। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা ভেঙে ফেলার অনুমতি দেওয়ার প্রশ্নই আসে না। মূলত বৃষ্টির পানি সংগ্রহ করে সংরক্ষণ এবং পরবর্তীতে তা পরিশোধনের মাধ্যমে খাওয়ার উপযোগী করার লক্ষেই এসব পানির ট্যাংকি নির্মাণ করা হয়েছিল। উপকূলীয় অঞ্চলে সুপেয় পানির সংকট বিবেচনায় নিয়ে ইসলামী ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (আইডিবি) অধীনে ৩৫টি সাইক্লোন সেন্টারে এ ধরনের বৃষ্টির পানি সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। তাই এসব স্থাপনার গুরুত্ব অনেক বেশি। বিশেষ করে উপকূলীয় এলাকায় যেখানে সুপেয় পানির সংকট রয়েছে, সেখানে বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ করে ব্যবহার করার এই ব্যবস্থা মানুষের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। 
বাগেরহাটের শরণখোলা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রেজোয়ান ইফতেকার বলেন, আমি তাদের ডেকে ছিলাম। তারা আমাকে জানিয়েছে ম্যানেজিং কমিটির সিদ্ধান্তে রেজুলেশন করে ভেঙে ফেলা হয়েছে। তবে বিষয়টি আরও ক্ষতি দেখা হবে বলে জানান তিনি।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ