খুলনা | শনিবার | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৮ ভাদ্র ১৪৩৩

বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন, অ্যাপল ব্র্যান্ডের ট্যাব ৫৭টি ল্যাপটপ, সিপিইউ, মনিটর, পুরোনো কিবোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ

চট্টগ্রামে ৬৩ বিদেশি গ্রেফতার : কম্বোডিয়া-চীনসহ ছয় দেশের চক্রের অনলাইন প্রতারণার ছক

খবর প্রতিবেদন |
১২:৫৪ এ.এম | ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬


অনলাইন প্রতারণার গুরুত্বপূর্ণ একটি মাধ্যম হলো হোয়াটসঅ্যাপ। সেই অ্যাপটিকে হাতিয়ার বানিয়ে চট্টগ্রাম অঞ্চলে ঘাঁটি গেড়ে আর্থিক প্রতারণার নানা রকমের ছক কষছে বিদেশি একটি জালিয়াত চক্র। ওই চক্রে আছে কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনাম, চীনসহ পাঁচ-ছয়টি দেশের নাগরিক। নিজেদের দেশে টিকতে না পেরে প্রতারণার ‘আস্তানা’ হিসেবে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে তারা।
চট্টগ্রাম নগরের খুলশিতে দেড় মাস আগে দুবাইপ্রবাসী এক ব্যক্তির আটতলা ভবন ভাড়া নিয়ে সেটিকে রীতিমতো ‘সার্ভার ও ওয়ার্কস্টেশন’ বসিয়েছিল তারা। প্রতারণা ও জালিয়াতির মাধ্যমে অবৈধভাবে অর্থ আত্মসাৎ, আইনানুগ কর্তৃত্ববহির্ভূত ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অপরাধ সংঘটিত করে আসছিল তারা। কিন্তু শেষ রক্ষা হয়নি। গোপন সংবাদ পেয়ে বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) রাতে ওই বাড়ি থেকে পাকিস্তান, ভিয়েতনাম, লাওসসহ বিভিন্ন দেশের ৬৩ জন নাগরিককে গ্রেফতার করেছে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশের (সিএমপি) কাউন্টারটেরোরিজম ইউনিট ও খুলশী থানা-পুলিশ। গ্রেফতার বিদেশি নাগরিকদের মধ্যে ৩৫ জন লাওসের, পাকিস্তানের ২১ জন, চীনের ৫ জন এবং নেপাল ও ভিয়েতনামের ১ জন করে নাগরিক রয়েছেন।
তথ্যসূত্র বলছে, দেশজুড়ে অনলাইন জালিয়াতির ঘটনা দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। দেশি-বিদেশি প্রতারকেরা সাধারণ মানুষকে ফাঁদে ফেলার জন্য প্রতিনিয়ত নতুন নতুন কৌশল বের করছে। সেসব কৌশলের মধ্যে রয়েছে ভুয়া ফোন কল থেকে শুরু করে ফিশিং লিংক। এমনকি, ভুয়া হুমকিও দেওয়া হচ্ছে। অপরাধীদের নয়া অস্ত্র ‘হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ স্ক্যাম’। কীভাবে এই নয়া জালিয়াতির মাধ্যমে গ্রাহকদের ব্যাংক এ্যাকাউন্ট ফাঁকা করে দিচ্ছে জালিয়াতরা?
সাইবার বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হোয়াটসঅ্যাপ বা অনুরূপ মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে একটি ছবি পাঠিয়ে মানুষকে নিশানা করার কৌশল খুঁজে পেয়েছে সাইবার অপরাধীরা। 
এর আগে গত ৪ সেপ্টেম্বর রাতে কক্সবাজারের হিমছড়ির মেরিনা বিচ ভিলা রিসোর্ট থেকে একই চক্রের পাঁচ চীনা ও এক তাইওয়ানের নাগরিককে গ্রেফতার করে পুলিশ। তাদের কাছ থেকে আলামত হিসেবে ১ হাজার ৯৩৮টি আইফোনসহ বিভিন্ন ইলেকট্রনিক সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। তাদের বিরুদ্ধে রামু থানায় হওয়া সাইবার সুরক্ষা আইনে মামলা দায়ের হয়েছে। মামলায় আরও চারজনের নাম উলে­খ করা হয়েছে। তবে ওই চারজন পলাতক। এ ছাড়া আরও ৩০০ চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিককে অজ্ঞাতনামা আসামি করা হয়েছে।
এদিকে চট্টগ্রাম নগর পুলিশ জানিয়েছে, গ্রেফতার হওয়া ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক খুলশী থানার কৃষ্ণচূড়া আবাসিক এলাকার ৪ নম্বর সড়কের মামুন নামে এক দুবাই প্রবাসীর বাড়ি ভাড়া নিয়ে দেড় মাস ধরে তারা এই সাইবার অপরাধের আস্তানা গড়ে তুলেছিল। বাংলাদেশে অবস্থান করে বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে ঢুকে ও ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা এবং অবৈধ ই-ট্রানজেকশনের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাৎ করাই ছিল তাদের মূল লক্ষ্য। খুলশীর আটতলা ভবন থেকে ৬৩ জন বিদেশি নাগরিক গ্রেফতারের বিষয়ে শুক্রবার  বিকেলে সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলন করেছে নগর পুলিশ কর্তৃপক্ষ।
এতগুলো বিদেশি নাগরিক একসঙ্গে একটি ভবনে কীভাবে অবস্থান করছিলেন এবং তাদের ভিসার মেয়াদ আছে কি না, তা জানতে পারেনি পুলিশ। কারণ গ্রেফতার কারও কাছেই পাসপোর্ট পাওয়া যায়নি।
সংবাদ সম্মেলনে সিএমপির অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ক্রাইম এ্যান্ড অপারেশনস) মুহাম্মদ ফয়সাল আহম্মেদ বলেন, ‘তারা মূলত বিভিন্ন ওয়েবসাইট হ্যাক করে। এরপর বিভিন্ন জনকে অনলাইন জুয়া খেলার অফার দেয় এবং চাকরির ভুয়া ফাঁদ তৈরি করে। লাওস, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামে স্ক্যামারদের বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান চলায় তারা সেখানে কাজগুলো করতে না পেরে বাংলাদেশকে বেছে নিয়েছে। এখানে তারা প্রতারণার ফাঁদ পাতা মাত্র শুরু করেছিল। আমরা তাদের যত কম্পিউটার ও ল্যাপটপ পেয়েছি, কোর্টের আদেশের পরিপ্রেক্ষিতে সেগুলোর ফরেনসিক রিপোর্ট এলে কার কার সঙ্গে তারা প্রতারণা করেছে, সেই বিষয়গুলো পুরোপুরি উঠে আসবে।’
পাসপোর্ট না থাকার বিষয়ে নগর পুলিশের উক্ত কর্মকর্তা বলেন, ‘আমরা জানতে পেরেছি তাদের পাসপোর্টগুলো এক বাংলাদেশির কাছে জমা রাখা আছে। স্থানীয় ওই ব্যক্তির সহযোগিতাতেই তারা এই বাসাটা ভাড়া নিয়েছে। তাকে আমরা খুঁজছি। পাসপোর্টধারীকে যদি আমরা গ্রেফতার করতে পারি, তাহলে আমরা মূল জায়গায় যেতে পারব এবং তারা বৈধ নাকি অবৈধভাবে দেশে অবস্থান করছে, তা যাচাই করা যাবে।’
গ্রেফতারকৃতদের প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদ করে সিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, আসামিরা দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশের বিভিন্ন স্থানে ভাড়া বাসায় অবস্থান করে অনলাইনভিত্তিক বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে প্রবেশ এবং বিভিন্ন ওয়েবসাইট ব্যবহার করে প্রতারণা ও অপরাধমূলক কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছিল। বাংলাদেশে তাদের অপরাধমূলক কার্যক্রম নির্বিঘ্নে এবং নিরাপদে পরিচালনার জন্য বিভিন্ন ধরনের লজিস্টিক সহায়তা প্রদানকারী দেশীয় ও বিদেশি সহযোগী রয়েছে। এই চক্রের আরও কিছু সদস্য চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থান করছে। জব্দকৃত আলামত: বিভিন্ন ব্র্যান্ডের ১৩৪টি মোবাইল ফোন, অ্যাপল ব্র্যান্ডের একটি ট্যাব, ৫৭টি ল্যাপটপ, একটি সিপিইউ, একটি মনিটর, একটি পুরোনো কিবোর্ডসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম।
এদিকে কক্সবাজারের একটি রিসোর্ট থেকে গত ৪ সেপ্টেম্বর গ্রেফতার হওয়া ছয় বিদেশি নাগরিকের হেফাজতে থাকা আরও ৭০০ আইফোন বৃহস্পতিবার  জব্দের কথা উলে­খ করে কক্সবাজার জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ ও অভিযান) মোহাম্মদ অহিদুর রহমান শুক্রবার বিকেলে দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘কক্সবাজারে যে ছয়জন বিদেশি নাগরিক গ্রেফতার হয়েছেন তারা আন্তর্জাতিক প্রতারক চক্র। নিজেদের ভুয়া পরিচয় দিয়ে ইন্টারনেট ও ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে প্রতারণার মাধ্যমে মানুষের কাছ থেকে অর্থ, ব্যক্তিগত তথ্য ও অনলাইন এ্যাকাউন্টের নিয়ন্ত্রণসহ বিভিন্ন সুবিধা হাতিয়ে নেয়।’
কক্সবাজার জেলা পুলিশের এই কর্মকর্তা জানান, চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের বিরুদ্ধে করা মামলাটি তদন্তভার পুলিশের অপরাধ দমন বিভাগ সিআইডিকে দেওয়া হয়েছে। তবে আজ-কালের মধ্যে তারা (সিআইডি) মামলার ডকেট বুঝে নেবেন।
কক্সবাজার পুলিশের দাবি, পর্যটকদের থাকার জন্য ব্যবহৃত রিসোর্টটির আড়ালে একটি কম্পিউটার ল্যাব  তৈরি করা হয়েছিল। সেখান থেকে অনলাইনভিত্তিক আর্থিক প্রতারণামূলক কর্মকান্ড (স্ক্যাম) পরিচালিত হতো। তবে ২ হাজার ৬৩৮টি আইফোন কী কাজে ব্যবহার করা হতো, কোন প্ল্যাটফর্মে সেগুলো ব্যবহার করা হয়েছে বা এর সঙ্গে কারা যুক্ত, এসব বিষয় নিশ্চিত হতে আলামতগুলোর ফরেনসিক পরীক্ষা শেষে জানা যাবে বলে জানিয়েছেন চীনা ও তাইওয়ানের নাগরিকদের বিরুদ্ধে করা মামলার বাদী রামু থানার পুলিশ পরিদর্শক মিন্টু দত্ত।
এদিকে হোয়াটসঅ্যাপে অচেনা নম্বর থেকে আসা ছবি ডাউনলোড করলেই সাইবার প্রতারণার শিকার হওয়ার আশঙ্কা আছে বলে মন্তব্য করে সিএমপির এক কর্মকর্তা জানান, ছবি ডাউনলোড করলেই আপনার এ্যাকাউন্ট থেকে লাখ লাখ টাকা উধাও হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। নতুন এই প্রতারণা পদ্ধতিকে হোয়াটসঅ্যাপ ইমেজ স্ক্যাম বলা হয়।
সিআইডি চট্টগ্রাম অফিসের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা জানান, দেশের ৭০ থেকে ৭৫ শতাংশ মোবাইল ব্যবহারকারী বিভিন্ন মাধ্যমে আসা ভুয়া মেসেজে ক্লিক করেন। তারপরই অ্যাকাউন্ট হ্যাক কিংবা আর্থিক ক্ষতির মতো ঘটনা ঘটছে। তবে কয়েকটি বিষয় মাথায় রাখলেই কিন্তু এই ধরনের বিপদ এড়িয়ে চলা যায়। এর মধ্যেই অনলাইনে জালিয়াতির নতুন পন্থা খুঁজে বের করেছে হ্যাকাররা। 
বিশেষজ্ঞরা জানাচ্ছেন, হোয়াটসঅ্যাপ বা অনুরূপ মেসেজিং অ্যাপের মাধ্যমে একটি ছবি পাঠিয়ে মানুষকে নিশানা করার কৌশল খুঁজে পেয়েছে সাইবার অপরাধীরা। প্রথমে একটি অচেনা নম্বর থেকে গ্রাহকের ফোনে একটি ‘ইমেজ’ বা ছবি পাঠিয়ে দেয় প্রতারকেরা। অসাবধানতার বশে যদি সেই ছবি একবার ডাউনলোড হয়ে যায়, ব্যস! এক নিমেষেই এ্যাকাউন্ট থেকে টাকা হাতিয়ে নিতে পারে অপরাধীরা।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ