খুলনা | রবিবার | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

৩০ শতাংশ রোগী ভুগছেন বাতের কষ্টে, চিকিৎসা খরচ মেটাতে পরিবারের হিমশিম

খবর প্রতিবেদন |
০১:০৯ এ.এম | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬


বাংলাদেশে বাতরোগ আশঙ্কাজনক ভাবে বেড়ে যাওয়ায় এর চিকিৎসার ব্যয়ভার মেটাতে গিয়ে বহু পরিবারকে হিমশিম খেতে হচ্ছে। একদিকে চিকিৎসার পেছনে ধারাবাহিক খরচ, অন্যদিকে আক্রান্ত ব্যক্তির কর্মক্ষমতা কমে যাওয়ায় দেশের অনেক পরিবারই ‘ক্রমাগত দারিদ্র্যের’ মুখে পড়ছে। অসংক্রামক ব্যাধির ঝুঁকির তালিকায় বাতরোগ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও এটি এখনো উপেক্ষিত। শনিবার রাজধানীর শহীদ আবু সাঈদ ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন সেন্টারে প্রফেসর নজরুল রিউমাটোলজি ফাউন্ডেশন এ্যান্ড রিসার্চ (পিএনআরএফআর) ট্রাস্ট আয়োজিত ‘১০ম রোগী শিক্ষা কার্যক্রম ও ১ম বৈজ্ঞানিক সম্মেলন’ এ বিশেষজ্ঞরা এসব তথ্য তুলে ধরেন।
সম্মেলনে উপস্থাপিত বিভিন্ন গবেষণার তথ্য তুলে ধরে বিশেষজ্ঞরা জানান, ২০১৫ সালে জাতীয় পর্যায়ের মাসকুলোস্কেলিটাল (গঝক) গবেষণা অনুযায়ী দেশের ১৮ বছর বা তার বেশি বয়সী প্রাপ্তবয়স্কদের ৩০.৪ শতাংশ বাতরোগে আক্রান্ত। এদের মধ্যে ২৪.৮ শতাংশ মানুষ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার হন এবং ২৪.৪ শতাংশ বছরের কোনো না কোনো সময় কাজের ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন। এর আগে আঞ্চলিক কোপকর্ড (COPCORD) সার্ভেতেও ২৬.৩ শতাংশ মানুষের হাড় ও পেশীর ব্যথায় ভোগার প্রমাণ পাওয়া যায়।
এ ছাড়া এশীয় জনমিতি ও আন্তর্জাতিক অস্টিওপোরোসিস ফাউন্ডেশনের (ওঙঋ) তথ্য অনুযায়ী, দেশে অস্টিওপোরোসিসের প্রাদুর্ভাব ১৬.৭ শতাংশ (প্রায় দুই কোটি ১৫ লাখ মানুষ) এবং ২০২৬ সাল নাগাদ ৫০ বছর বা তদূর্ধ্ব নারীদের ৪০ শতাংশই (প্রায় ৬৫.৬ লাখ) এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকিতে রয়েছেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) বরাতে তারা আরও জানায়, দেশে মোট মৃত্যুর প্রায় ৭১ শতাংশই অসংক্রামক ব্যাধিতে (এনসিডি) ঘটে। কিন্তু অসংক্রামক ব্যাধি সংক্রান্ত জাতীয় নীতিমালায় দীর্ঘমেয়াদি পঙ্গুত্ব সৃষ্টিকারী এই বাতরোগ এখনো উপেক্ষিত। পাশাপাশি প্রায় ১৭ কোটি মানুষের এই দেশে বিশেষজ্ঞ রিউম্যাটোলজিস্টের সংখ্যাও অত্যন্ত সীমিত।
অনুষ্ঠানে বাতব্যাথা সংক্রান্ত তথ্য-উপাত্ত নিয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন পিএনআরএফআর ট্রাস্টের ভাইস চেয়ারম্যান ও শমরিতা মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডাঃ নীরা ফেরদৌস।
তিনি জানান, বাতের চিকিৎসা ব্যয় এবং আক্রান্ত ব্যক্তির আয় বন্ধ হয়ে যাওয়া-এই দ্বিগুণ আর্থিক বোঝা পরিবারগুলোকে নিঃস্ব করে দিচ্ছে। রিউমাটয়েড আর্থ্রাইটিসে বছরে ৪০ হাজার থেকে পাঁচ লাখ টাকা এবং স্পন্ডাইলোআর্থ্রাইটিসে ৪০ হাজার থেকে ছয় লাখ টাকা পর্যন্ত খরচ হতে পারে। এ ছাড়া হাঁটু প্রতিস্থাপনে দেড় লাখ থেকে চার লাখ টাকা এবং হিপ ফ্র্যাকচারের অস্ত্রোপচারে এক লাখ ৮০ হাজার থেকে তিন লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় হয়।
দেশে বাতরোগের প্রকোপ ও করণীয় নিয়ে পিএনআরএফআর ট্রাস্টের চেয়ারম্যান ও বাতব্যথা বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডাঃ মোঃ নজরুল ইসলাম বলেন, সঠিক সময়ে নির্ণয় ও উপযুক্ত চিকিৎসার অভাবে বহু বাতের রোগী স্থায়ী পঙ্গুত্ব বরণ করছেন; যা কর্মক্ষম মানুষের কাজের ক্ষমতা কেড়ে নেওয়ার পাশাপাশি পরিবারগুলোকে অর্থনৈতিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।
তিনি আরও বলেন, রোগীদের অসচেতনতা, চিকিৎসা ব্যয়ের সামর্থ্যের অভাব এবং প্রয়োজনীয় বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও সুসংগঠিত স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানের স্বল্পতাই বাত রোগের সুচিকিৎসার প্রধান বাধা।
ডায়াবেটিস বা উচ্চ রক্তচাপের মতো এই রোগকেও দীর্ঘমেয়াদে নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব জানিয়ে তিনি চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া যথেচ্ছ ব্যথানাশক ওষুধ খাওয়ার বিষয়ে কঠোরভাবে সতর্ক থাকতে বলেছেন। একইসঙ্গে তিনি সুস্থ ও স্বাভাবিক জীবনের জন্য নিয়মতান্ত্রিক জীবন যাপন, সুষম খাদ্য গ্রহণ, নিয়মিত ব্যায়াম, যথাসময়ে ভ্যাকসিন নেওয়া ও চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ সেবনের প্রতি জোর দেন এবং এসব রোগীর চিকিৎসায় সরকারি ব্যবস্থার পাশাপাশি বড় পরিসরে বেসরকারি উদ্যোগ গ্রহণেরও আহŸান জানান।
পিএনআরএফআর ট্রাস্টের কথা তুলে ধরে তিনি জানান, বর্তমানে এই ট্রাস্টের সদস্য সংখ্যা প্রায় ৫৫০ জন। ট্রাস্ট থেকে এ পর্যন্ত দুস্থ রোগীদের ওষুধ, পরীক্ষা ও স্কলারশিপ বাবদ এক কোটি টাকারও বেশি মানবিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।
রোগীদের সুবিধার্থে ‘সাপোর্ট সেন্টার বুথ’ স্থাপন এবং বিশেষ ‘সার্ভিস কার্ড’ চালুর ঘোষণা দেন তিনি। এ ছাড়া ভবিষ্যতে দেশে একটি পূর্ণাঙ্গ ‘রিউমাটোলজি ইনস্টিটিউট’ গড়ে তোলার লক্ষ্যের কথাও ব্যক্ত করেন এই বাতরোগ বিশেষজ্ঞ।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ