খুলনা | রবিবার | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ২৯ ভাদ্র ১৪৩৩

প্রেমভিত্তিক নাটক-সিনেমা নিষিদ্ধ চেয়ে এবার হাইকোর্টে রিট

খবর প্রতিবেদন |
০৩:১১ পি.এম | ১৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় ও সামাজিক বিশৃঙ্খলা রোধের যুক্তি দেখিয়ে দেশে কেবল প্রেম ও রোমান্সনির্ভর সিনেমা-নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচার পুরোপুরি বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট দায়ের করা হয়েছে।

রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী মো. মাহমুদুল হাসান মামুন জনস্বার্থে এই রিট আবেদনটি (পিআইএল) দায়ের করেন।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব, তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ের সচিব, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব এবং বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন বোর্ডের চেয়ারম্যানকে রিটে বিবাদী করা হয়েছে।

তবে যিনি প্রেমনির্ভর কনটেন্ট নিষিদ্ধ চেয়ে আইনি লড়াইয়ে নেমেছেন, সেই আইনজীবীর নিজের ফেসবুক প্রোফাইলেই বিভিন্ন রোমান্টিক সিনেমার প্রশংসা করে দেওয়া পুরোনো পোস্ট ঘিরে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে তুমুল সমালোচনা চলছে। এর আগে গত মাসে তিনি এ বিষয়ে আইনি নোটিশ পাঠালে বিনোদন অঙ্গনের সাতটি সংগঠন যৌথভাবে এর প্রতিবাদ জানিয়েছিল।

আইনি নোটিশ ও বিনোদন অঙ্গনের প্রতিবাদ
ঘটনার সূত্রপাত গত ২৭ আগস্ট। যুবসমাজের নৈতিক অবক্ষয় রোধ এবং সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষার দাবিতে প্রেমনির্ভর নাটক-সিনেমা নির্মাণ ও সম্প্রচার বন্ধের জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট তিন সচিব ও চলচ্চিত্র সেন্সর বোর্ডের (বর্তমান সার্টিফিকেশন বোর্ড) চেয়ারম্যান বরাবর আইনি নোটিশ পাঠান আইনজীবী মাহমুদুল হাসান মামুন।

নোটিশের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এ নিয়ে ব্যাপক সমালোচনা শুরু হয়। ক্ষোভ প্রকাশ করেন অভিনয়শিল্পী ও নির্মাতারা। দেশ-বিদেশে থাকা বাংলাদেশি তারকা ও সাধারণ দর্শকরাও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে একে ‘হাস্যকর’ বলে আখ্যা দেন।

পরদিন ২৮ আগস্ট টেলিভিশন ও বিনোদন শিল্পসংশ্লিষ্ট সাতটি সংগঠন এক যৌথ প্রতিবাদলিপিতে গভীর উদ্বেগ ও বিস্ময় প্রকাশ করেছে।

প্রতিবাদলিপিতে সংগঠনগুলোর নেতারা বলেন, কোনো নির্দিষ্ট বিষয়বস্তু নিয়ে আপত্তি বা অভিযোগ থাকলে সংশ্লিষ্ট আইন, বিধিমালা ও প্রচলিত নিয়ন্ত্রক কাঠামোর আওতায় তার প্রতিকার করার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু একটি সম্পূর্ণ সৃজনশীল মাধ্যমের নির্দিষ্ট কোনো ধারার নির্মাণ বন্ধের উদ্যোগ টেলিভিশন শিল্পের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত অসংখ্য মানুষের কর্মসংস্থান ও সৃজনশীল কার্যক্রমকে প্রশ্নের মুখে ফেলতে পারে।

রোমান্টিক নাটক বা সিনেমা নির্মাণ সামগ্রিকভাবে বন্ধ করার দাবি সৃজনশীল শিল্পের বিকাশের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয় উলে­খ করে তারা বলেন, দায়িত্বশীল ও মানসম্মত কনটেন্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা তারা স্বীকার করেন। টেলিভিশন শিল্পের সৃজনশীল স্বাধীনতা এবং দেশের বিনোদন ও সংস্কৃতি অঙ্গনের স্বাভাবিক কার্যক্রম নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর ভূমিকাও প্রত্যাশা করেন তারা।

আইনজীবীর পুরোনো পোস্টে স্ববিরোধিতা
নোটিশ পাঠানোর পরপরই ওই আইনজীবীর সামাজিক মাধ্যমের পুরোনো কার্যকলাপ বুমেরাং হয়ে দাঁড়ায়। নেটিজেনরা তার ফেসবুক ঘাঁটতে গিয়ে দেখেন, প্রেমনির্ভর সিনেমা তিনি নিজেও নিয়মিত দেখেন এবং প্রকাশ্যে তার প্রশংসাও করেছেন।

জানা যায়, গত ৫ আগস্ট এক পোস্টে তিনি নিজেই ভারতীয় সিনেমা ‘রাধে শ্যাম’ দেখার কথা জানিয়েছিলেন। সিনেমাটিকে তিনি বর্ণনা করেছিলেন ‘জটিল প্রেমের গল্প’ বলে। এর আগে ২০২৫ সালের ৯ মে আরেকটি পোস্টে তিনি হলিউডের রোমান্টিক ফ্যান্টাসি সিনেমা ‘স্টারডাস্ট’ দেখার কথা জানান। এ ছাড়া ‘দ্য ট্যুরিস্ট’ সিনেমা দেখার তথ্যও তার প্রোফাইলে পাওয়া যায়।

যিনি নিজে প্রকাশ্যে রোমান্টিক সিনেমা উপভোগ করেছেন এবং প্রশংসা করেছেন, তার মুখেই আবার গোটা একটি ধারা নিষিদ্ধের দাবি কতটা বিশ্বাসযোগ্য— তার এই দ্বৈত অবস্থান ও স্ববিরোধিতা নিয়ে এখন তুমুল আলোচনা চলছে।

হাইকোর্টে রিট ও আইনি যুক্তি
আইনি নোটিশ পাঠানোর পর বিবাদীদের কাছ থেকে কার্যকর প্রশাসনিক পদক্ষেপ না পাওয়ায় অবশেষে রোববার (১৩ সেপ্টেম্বর) হাইকোর্টে রিট করেন ওই আইনজীবী।

রিট আবেদনে অভিযোগ করা হয়েছে, বর্তমান চলচ্চিত্র ও নাটক শিল্পে কেবলমাত্র প্রেম এবং মাত্রাতিরিক্ত রোমান্টিক কনটেন্টের অবাধ সম্প্রচার সমাজে মারাত্মক নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। মূলধারার গণমাধ্যমে পরকীয়া, বিবাহবহির্ভূত সম্পর্ক, ব্যভিচার এবং ধর্ষণের মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত স্বাভাবিক ও মহিমান্বিত করে উপস্থাপন করা হচ্ছে। এর ফলে যুবসমাজ ও শিক্ষার্থীরা পড়াশোনা ও ক্যারিয়ার থেকে বিচ্যুত হচ্ছে এবং সমাজের ঐতিহ্যবাহী নৈতিক কাঠামো ভেঙে যাওয়ায় সামাজিক বিশৃঙ্খলা তৈরি হচ্ছে।

রিটে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম হিন্দুস্তান টাইমস, ডেইলি সাবাহ এবং দ্য নিউইয়র্ক টাইমসের গবেষণাধর্মী প্রতিবেদনের বরাত দিয়ে বলা হয়েছে, লাগামহীন রোমান্টিক ও উসকানিমূলক সিনেমা যুবসমাজের মনস্তাত্তি¡ক বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে এবং নারীদের প্রতি সহিংসতা বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে।

আইনজীবী মামুন রিটে যুক্তি দিয়েছেন, সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদে বাক ও ভাব প্রকাশের স্বাধীনতার কথা বলা হলেও তা শালীনতা বা নৈতিকতার স্বার্থে আইনের দ্বারা আরোপিত যুক্তিসঙ্গত বাধানিষেধ সাপেক্ষে। জননৈতিকতা ধ্বংসকারী কনটেন্ট সংবিধানের ৩৯ অনুচ্ছেদের সুরক্ষা পেতে পারে না। এ ছাড়া সংবিধানের ২১(১) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী আইন মানা ও শৃঙ্খলা রক্ষা নাগরিকের কর্তব্য এবং ২৩ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী জাতীয় সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য সংরক্ষণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব।

এ ছাড়া ‘বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সার্টিফিকেশন আইন, ২০২৩’ এর ৫(২) এবং ৮(১) ধারা এবং ‘ক্যাবল টেলিভিশন নেটওয়ার্ক পরিচালনা আইন, ২০০৬’ এর ১৯ ও ২০ ধারা অনুযায়ী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সামাজিক মূল্যবোধের পরিপন্থি সম্প্রচার নিষিদ্ধ করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও বিবাদীরা তা পালনে ব্যর্থ হয়েছেন বলে রিটে উলে­খ করা হয়।

কেবলমাত্র প্রেমভিত্তিক কনটেন্ট নিষিদ্ধের পাশাপাশি যুবসমাজের মেধা বিকাশে বিজ্ঞান, শিক্ষা, ইতিহাস, মুক্তিযুদ্ধ এবং প্রতিরক্ষাভিত্তিক চলচ্চিত্র ও নাটক নির্মাণ এবং সম্প্রচারে সংশ্লিষ্টদের প্রতি বাধ্যতামূলক নির্দেশনা জারির আরজি জানানো হয়েছে রিটে।

আগেও ছিলেন আলোচনায়
বিতর্কিত আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার ক্ষেত্রে মাহমুদুল হাসান মামুন নতুন নন। এর আগে গত ৫ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় আয়োজিত ‘মঙ্গল শোভাযাত্রা’ স্থায়ীভাবে বন্ধের নির্দেশনা চেয়ে হাইকোর্টে রিট করেছিলেন। তার দাবি ছিল, এটি সংখ্যাগরিষ্ঠ জনগোষ্ঠীর ধর্মীয় স্বাধীনতায় আঘাত করে। ওই রিটে সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়, ধর্ম মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, ঢাকার জেলা প্রশাসক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও চারুকলা অনুষদের ডিনকে বিবাদী করা হয়।

এরপর গত ২৬ এপ্রিল তিনি রাষ্ট্রপতির কাছে চিঠি পাঠিয়ে দাবি করেন, রাষ্ট্রের মৌলিক কাঠামো ভাঙার অভিযোগে তৎকালীন জাতীয় সংসদকে অযোগ্য ঘোষণা করে ভেঙে দেওয়া হোক।

প্রিন্ট

আরও সংবাদ