খুলনা | সোমবার | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৫ আশ্বিন ১৪৩৩

অবসরে যেতে না যেতেই পৃথিবী থেকে অবসরে গেলেন অধ্যক্ষ অজিত সরকার

কৃষ্ণ গোপাল সেন, রূপসা |
১২:৫৬ এ.এম | ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬


জীবনের দীর্ঘ কর্মমুখর পথচলা শেষে মানুষ যখন একটুখানি শান্ত ছায়ায় জিড়িয়ে নেওয়ার স্বপ্ন দেখে, তখনই নিয়তির এক নির্মম আঘাতে সবকিছু স্তব্ধ হয়ে গেল। মাত্র দু’টি মাস জীবনের দীর্ঘ ক্লান্তিকর দায়িত্বভার সমর্পণ করে তিনি পা রেখেছিলেন অবসরের নিভৃত আঙিনায়। কিন্তু পার্থিব এই অবসর তাঁকে খুব বেশিদিন ধরে রাখতে পারল না; মায়ার সমস্ত বন্ধন ছিন্ন করে তিনি পাড়ি জমালেন অনন্তলোকের চিরন্তন অবসরে। চলে গেলেন রূপসার শিক্ষাকাশের এক উজ্জ্বলতম নক্ষত্র, কাজদিয়া সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সদ্য সাবেক ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অজিত কুমার সরকার।
গত ১৫ সেপ্টেম্বরের সকালটি ছিল আর দশটি দিনের চেয়ে আলাদা, স্মৃতির টানে কলেজ প্রাঙ্গণে ছুটে এসেছিলেন তিনি। যে বিদ্যাপীঠের ধূলিকতায় মিশে আছে তাঁর জীবনের সোনালী দিনগুলো, সেই প্রাঙ্গণে প্রিয় সহকর্মী ও শুভানুধ্যায়ীদের সঙ্গে কিছুটা সময় কাটিয়ে এক চিলতে আড্ডার তৃষ্ণা মেটাতে বের হয়েছিলেন চায়ের দোকানের উদ্দেশ্যে। কিন্তু কে জানত, সেই পথচলাই তাঁর জীবনের শেষ পদচিহ্ন হয়ে থাকবে! রাস্তা পার হওয়ার মুহূর্তে একটি বেপরোয়া ইজিবাইকের প্রচণ্ড ধাক্কায় মারাত্মক জখম হয়ে রাজপথে লুটিয়ে পড়েন তিনি।
শুরু হয় জীবন ও মৃত্যুর এক নির্মম লড়াই। প্রথমে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, সেখান থেকে অবস্থার অবনতি হলে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল এবং সর্বশেষ উন্নত চিকিৎসার আশায় ঢাকার বেসরকারি ইম্পালস হাসপাতালে তাঁকে স্থানান্তর করা হয়। কিন্তু সহস্র মানুষের প্রার্থনা আর চিকিৎসকদের সমস্ত প্রচেষ্টাকে ব্যর্থ করে দিয়ে রোববার সন্ধ্যা ৭টা ১০ মিনিটে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করলেন তিনি। সবাইকে শোকের সাগরে ভাসিয়ে, ছাত্র-শিক্ষক ও অগণিত গুণগ্রাহীকে ফাঁকি দিয়ে তিনি চলে গেলেন না-ফেরার দেশে।
অধ্যক্ষ অজিত কুমার সরকার কেবল একজন প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষকই ছিলেন না, তিনি ছিলেন বিনম্রতা, মানবতা ও সুরুচির এক অনন্য বাতিঘর। দীর্ঘ শিক্ষকতা জীবনে কিংবা ব্যক্তিগত পরিচয়ের পরিমণ্ডলে তাঁর ওপর কেউ ক্ষুব্ধ হয়েছেন বা বিরূপ মনোভাব পোষণ করেছেন এমন নজির রূপসার বুকে মেলা ভার। সদা হাস্যোজ্জ্বল এই মানুষটির স্বভাবই ছিল হাসিমুখে কথা বলা। পরকে আপন করে নেওয়ার এক অদ্ভুত জাদু জানতেন তিনি; কাউকে বিন্দুমাত্র আঘাত দিয়ে কথা বলা ছিল তাঁর স্বভাববিরুদ্ধ। মার্জিত আচরণ, নম্রতা, প্রখর মেধা আর সরল জীবনের এক অপূর্ব মেলবন্ধন ছিলেন এই সাদা মনের মানুষটি। দায়িত্ব পালনে তিনি ছিলেন পাথরের মতো অবিচল, নিষ্ঠাবান ও আপসহীন এক ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিত্ব।
রূপসা উপজেলার গোয়াড়া গ্রামের কৃতী সন্তান অজিত কুমার সরকারের শিকড় প্রোথিত ছিল শিক্ষার গভীর ঐতিহ্যে। পিতা হরেন্দ্রনাথ সরকারের স্নেহছায়ায় বেড়ে ওঠা এই গুণী মানুষটি ছাত্রজীবন থেকেই ছিলেন অসামান্য মেধার অধিকারী। ১৯৮১ সালে বাহিরদিয়া মাধ্যমিক বিদ্যালয় থেকে কৃতিত্বের সাথে এসএসসি এবং ১৯৮৩ সালে ঐতিহ্যবাহী সরকারি ব্রজলাল (বিএল) কলেজ থেকে এইচএসসি সম্পন্ন করেন। এরপর একই প্রতিষ্ঠান থেকে ১৯৮৫ সালে অর্থনীতিতে সম্মান (অনার্স), রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অত্যন্ত কৃতিত্বের সাথে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর এবং পরবর্তীতে ইংরেজি বিভাগেও সফলতার সাথে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
১৯৯৫ সালে কাজদিয়া সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে প্রভাষক হিসেবে যোগদানের মধ্য দিয়ে শুরু হয় তাঁর জ্ঞান বিতরণের মহাযজ্ঞ। অর্থনীতির জটিল তত্ত¡গুলো যেমন তিনি সহজ-সরল ভাষায় বুঝিয়ে দিতেন, তেমনি ইংরেজি ভাষার ওপর তাঁর ছিল অগাধ পাণ্ডিত্য। ফলে অর্থনীতির পাশাপাশি গভীর মমতা নিয়ে শিক্ষার্থীদের ইংরেজির পাঠও দিতেন তিনি। ২০২৩ সাল থেকে তিনি বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষের গুরুদায়িত্ব কাঁধে তুলে নেন। অধ্যক্ষের পদে দায়িত্ব পালনের সময় নানা ঘাত-প্রতিঘাত, প্রাতিষ্ঠানিক বাধা-বিপত্তি ও বিপুল ত্যাগ-তিতিক্ষা তাঁকে নীরবে সইতে হয়েছে, কিন্তু প্রতিষ্ঠান ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে তিনি কখনো নিজের আদর্শ থেকে বিচ্যুত হননি। অবশেষে চলতি বছরের মাত্র দুই মাস পূর্বে তিনি তাঁর দীর্ঘ গৌরবোজ্জ্বল শিক্ষকতা জীবন থেকে অবসর গ্রহণ করেন।
ব্যক্তিগত জীবনে তিনি রেখে গেছেন তাঁর শোকস্তব্ধ সহধর্মিণী ও স্নেহের দুই কন্যা সন্তানকে। যে পরিবারটি ছিল তাঁর সুখের ঠিকানা, আজ সেখানে কেবলই বুকফাটা হাহাকার আর অশ্র“জল। এই শূন্যতা কোনো সান্ত্বনায় ভরিয়ে দেওয়ার মতো নয়। সমগ্র রূপসাবাসী আজ তাদের একজন আপন অভিভাবককে হারিয়ে গভীর শোকে মুহ্যমান।
আজ সকাল ১০টায় তাঁর প্রাণের বিদ্যাপীঠ কাজদিয়া সরকারি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে তাঁর মরদেহ নিয়ে আসা হবে শেষ শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার অঞ্জলি নিবেদনের জন্য। যে প্রাঙ্গণ মুখরিত থাকত তাঁর কোমল কণ্ঠস্বরে, সেখানে কাল কেবলই থাকবে তাঁর নিথর দেহ আর অগণিত ভক্ত-শিষ্যের চোখের জল। শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে তাঁর জন্মমাটি গোয়াড়া গ্রামের চিরচেনা শ্মশানঘাটেই সম্পন্ন হবে শেষকৃত্য; পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যাবেন তিনি। দেহের বিনাশ হলেও একজন আদর্শ শিক্ষকের মৃত্যু নেই। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সহস্র শিষ্যের হৃদয়ে, রূপসার বাতাস জুড়ে আর এক অনাবিল হাসিমুখের অমলিন স্মৃতিতে। প্রিয় অধ্যক্ষ অজিত কুমার সরকার, অনন্তলোকে আপনার আত্মা পরম শান্তিতে বিরাজ করুক।
 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ