খুলনা | মঙ্গলবার | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ৭ আশ্বিন ১৪৩৩

খুলনায় ৬ষ্ঠ উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলন

শিশুদের সঙ্গে নিয়েই জলবায়ু অর্থায়ন পরিকল্পনার আহবান

নিজস্ব প্রতিবেদক |
০৫:৪৭ পি.এম | ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬

 

জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় শিশুদের জন্য আলাদা করে পরিকল্পনা না করে তাদের সঙ্গে নিয়েই জলবায়ু পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের আহবান জানিয়েছেন খুলনায় অনুষ্ঠিত ৬ষ্ঠ বার্ষিক উপকূলীয় শিশু জলবায়ু সম্মেলনের বক্তারা। তাঁরা বলেছেন, উপকূলীয় অঞ্চলের শিশুদের বাস্তব অভিজ্ঞতা ও মতামতকে পরিকল্পনায় যুক্ত করার পাশাপাশি জলবায়ু অভিযোজন, পুনর্বাসন ও ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় স্থানীয় পর্যায়ে অর্থায়নের সুযোগ তৈরি করতে হবে।

‘জলবায়ু সহনশীলতার জন্য শিশু নেতৃত্ব’ প্রতিপাদ্যে মঙ্গলবার (২২ সেপ্টেম্বর) খুলনার সিএসএস আভা সেন্টারে দুই দিনব্যাপী এ সম্মেলন শুরু হয়। জাগ্রত যুব সংঘ (জেজেএস) ও উপকূলীয় জলবায়ু শিশু ফোরাম যৌথভাবে সম্মেলনের আয়োজন করে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে খুলনা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, গত ৩০ থেকে ৪০ বছর ধরে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ¡াসসহ নানা দুর্যোগে উপকূলীয় মানুষের ক্ষয়ক্ষতি হচ্ছে। প্রতিবার দুর্যোগের পর ত্রাণ ও পুনর্বাসনের উদ্যোগ নেওয়া হলেও স্থায়ী সমাধান হয়নি। ফলে ভবিষ্যতে পুনর্বাসন ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি ও সমন্বিত পরিকল্পনা প্রয়োজন।

তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে উপকূল থেকে বাস্তুচ্যুত হয়ে খুলনা শহরে আসা মানুষ বস্তিতে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। সেখানে শিশুদের শিক্ষা, স্যানিটেশন, নিরাপদ বাসস্থান ও কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিকল্প কর্মসংস্থান, লবণসহিষ্ণু ফসল উৎপাদন, প্রাণবৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং টেকসই পুনর্বাসন পরিকল্পনা নিতে হবে।

নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেন, দুর্যোগের পর ত্রাণ দেওয়া হলেও তা স্থায়ী পুনর্বাসনের বিকল্প নয়। অতীতে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সমন্বিত ও পরিকল্পিতভাবে বাস্তবায়িত হয়নি। এখন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা দরকার।

উপক‚লীয় এলাকার সাইক্লোন সেন্টারগুলোর অব্যবস্থাপনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, অনেক আশ্রয়কেন্দ্র দীর্ঘদিন সংস্কারহীন। কোথাও পর্যাপ্ত স্যানিটেশন নেই, কোথাও যোগাযোগব্যবস্থা দুর্বল। ফলে দুর্যোগের সময় মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে যেতে চায় না। এসব অবকাঠামো সংস্কারের পাশাপাশি মানুষের মধ্যে আস্থাও তৈরি করতে হবে।

শিশুদের অংশগ্রহণের বিষয়ে তিনি বলেন, শিশুরা এখন শুধু সমস্যার কথা বলতে চায় না, তারা সমাধানের অংশীদার হতে চায়। তাদের পরিকল্পনা ও অভিজ্ঞতাকে বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করতে হবে। সম্মেলনে উঠে আসা সুপারিশ শুধু আলোচনা সভায় সীমাবদ্ধ না রেখে রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা ও নীতিনির্ধারণের পর্যায়ে নেওয়ার আহবান জানান তিনি।

জলবায়ু মোকাবিলায় বিদেশি অর্থায়নের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীলতার পরিবর্তে দেশের নিজস্ব অর্থায়নের সক্ষমতা বাড়ানোর কথাও বলেন কেসিসি প্রশাসক। তিনি বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চল পুনর্গঠনে নিজেদের অর্থায়নে দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ প্রয়োজন।
সম্মেলনে শিশু প্রতিনিধিরা বলেন, ‘আমরা শুধু সমস্যার কথা বলতে চাই না, সমাধানের অংশ হতে চাই।’ তাঁদের মতে, জলবায়ু ও দুর্যোগ মোকাবিলার পরিকল্পনায় শিশুদের অভিজ্ঞতা ও মতামতকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাঁদের বক্তব্য—‘শিশুদের নিয়ে সিদ্ধান্ত নয়, শিশুদের সঙ্গে নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হবে।’

আয়োজকেরা জানান, জেজেএসের Strengthening Children's Voice and Leadership in Addressing Climate Change and Disaster Risk in Bangladesh  প্রকল্পের আওতায় সম্মেলনটি আয়োজন করা হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে প্রায় পাঁচ হাজার শিশুর সঙ্গে পরিচালিত কার্যক্রমের অভিজ্ঞতা এখানে তুলে ধরা হচ্ছে।

দুই দিনের সম্মেলনে ডিজিটাল স্টোরিটেলিং, পোস্টার উপস্থাপনা, শিশুদের নেতৃত্বে জলবায়ু কার্যক্রম, দক্ষিণ-পশ্চিম উপকূলের শিশুদের জীবনে জলবায়ু সংকটের প্রভাব, জলবায়ু অর্থায়নে শিশু ও ক্ষতিগ্রস্ত জনগোষ্ঠীর প্রবেশাধিকার এবং জলবায়ুজনিত ক্ষয়ক্ষতি ও লোকসান মোকাবিলাসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন জেজেএসের নির্বাহী পরিচালক এটিএম জাকির হোসেন। বিশেষ অতিথি ছিলেন খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মো. রেজাউল করিম, পরিবেশ অধিদপ্তর খুলনার পরিচালক খন্দকার মো. ফজলুল হক, ইউনিসেফ বাংলাদেশের খুলনা বিভাগীয় ফিল্ড অফিস প্রধান মো. কায়সার হোসেন, ডিজাস্টার ফোরামের সদস্য সচিব গওহ্যার নঈম ওয়াহরা ও খুলনা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক তরিকুল ইসলাম।

সম্মেলনের সমাপনী অধিবেশনে শিশু প্রতিনিধিরা ‘সুরক্ষা, অংশগ্রহণ ও শিশুদের জলবায়ু কার্যক্রমের স্থায়িত্ব নিশ্চিতকরণে উপকূলীয় শিশুদের দাবি’ তুলে ধরবেন। দুই দিনের সম্মেলন বুধবার (২৩ সেপ্টেম্বর) শেষ হবে। 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ