খুলনা | রবিবার | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬ | ১১ আশ্বিন ১৪৩৩

সুন্দরবনকে ঘিরে নতুন পর্যটন সম্ভাবনা তৈরি হচ্ছে

খবর প্রতিবেদন |
০১:৪০ এ.এম | ২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬


‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ সামনে রেখে খুলনা অঞ্চলে সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পর্যটকদের সুন্দরবন ভ্রমণের জন্য পর্যটনবাহী নৌযান প্রস্তুত করা হচ্ছে এবং ট্যুর অপারেটররাও ব্যস্ত হয়ে উঠেছেন।

আসন্ন পর্যটন মৌসুমে সুন্দরবনে নতুন করে পর্যটকদের আগমন বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে তুলে ধরতে আরও উদ্যোগ নেওয়ার আহŸান জানিয়েছেন পর্যটনসংশ্লিষ্টরা।

বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, সুন্দরবনে সাধারণত অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পর্যটনের প্রধান মৌসুম। এ সময়ে আবহাওয়া অনুকূল থাকে এবং নদী ও খাল তুলনামূলক শান্ত থাকে।

সূত্র জানায়, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে প্রায় ১ লাখ পর্যটক সুন্দরবন ভ্রমণ করেছেন। তবে পর্যটনবাহী নৌযানে করে বনে প্রবেশ করেছেন প্রায় ৪০ হাজার পর্যটক।

পরিবারের সঙ্গে সুন্দরবন ভ্রমণ করা ৯ বছর বয়সী সুমাইয়া তাবাসসুম বলেন, তিনি বিশেষভাবে বাঘ দেখার জন্য আগ্রহী ছিলেন। তিনি বলেন, ‘আমি বাঘ দেখতে খুব আগ্রহী ছিলাম, কিন্তু দেখতে পারিনি। তবে হরিণসহ বিভিন্ন প্রাণী দেখেছি। সুন্দরবন ভ্রমণ সত্যিই আমি খুব উপভোগ করেছি।

বাসসের সঙ্গে আলাপকালে পর্যটক সাহিদা আক্তার লতা বলেন, সুন্দরবনের প্রাকৃতিক পরিবেশ ও বন্যপ্রাণীর প্রতি আগ্রহ থেকেই তিনি সেখানে গেছেন।

তিনি বলেন, সবুজের সমারোহ, নদী ও বনের নিরিবিলি পরিবেশে সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা ব্যস্ত নগরজীবন থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন।

সাহিদা আক্তার লতা আরও বলেন, সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য, হরিণ, বানর ও বিভিন্ন প্রজাতির পাখি দেখার ব্যাপারে তিনি বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। পাশাপাশি সম্ভব হলে রয়েল বেঙ্গল টাইগার দেখারও আশা করেছিলেন।

পরিবারের সঙ্গে সুন্দরবন ভ্রমণ করা আরেক পর্যটক রুবেল বলেন, সুন্দরবন ভ্রমণ শুধু আনন্দদায়কই নয়, শিশুদের জন্য শিক্ষণীয়ও। তারা বই ও টেলিভিশনে আগে যেসব প্রকৃতি ও বন্যপ্রাণী সম্পর্কে জেনেছে, সেগুলো সরাসরি দেখার সুযোগ পায়।

ট্যুর অপারেটররা জানান, সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকের সংখ্যা বাড়তে থাকে। এ সময়ে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পরিবার নিয়ে মানুষ সুন্দরবনে ভ্রমণে আসেন।

দ্য ইন্টারভাল ট্যুরসের পরিচালক সৈয়দ আতিক শাহরিয়ার তাকিম বলেন, সাধারণত নভেম্বর থেকে মার্চ পর্যন্ত পর্যটকের সংখ্যা বাড়ে। এ বছরও পর্যটকের সংখ্যা বাড়বে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সুন্দরবনকেন্দ্রিক পর্যটন স্থানীয় বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরও উপকার করে। এর মধ্যে রয়েছেন দোকানদার, মাছ ও সবজি বিক্রেতা, রিকশা ও অটোরিকশাচালক, পরিবহনকর্মী, হোটেল ও রেস্তোরাঁর কর্মচারী, মাঝি, গাইড এবং দিনমজুর।

তবে খুলনার ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব সুন্দরবনের (টোয়াস) জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি মাজহারুল ইসলাম কচি বলেন, সুন্দরবনে পর্যটন কমে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, গত বছর পর্যটনবাহী নৌযানে করে মাত্র প্রায় ৪০ হাজার পর্যটক বনে প্রবেশ করেছেন। ছোট নৌযানে করে করমজলে যাওয়া পর্যটকের সংখ্যাও কমেছে। সব মিলিয়ে পর্যটকের সংখ্যা প্রায় এক লাখের বেশি ছিল না।

কচির মতে, পর্যটন কমে যাওয়ার একটি কারণ সুন্দরবনের আশপাশে অননুমোদিত রিসোর্ট গড়ে ওঠা।

তিনি অভিযোগ করেন, কিছু রিসোর্ট কর্তৃপক্ষ এমন সুযোগ-সুবিধা ও বিনোদনের বিজ্ঞাপন দিয়ে পর্যটকদের আকৃষ্ট করে, যেগুলো সুন্দরবনের ভেতরে পাওয়া যায় না। ফলে অনেক দর্শনার্থী বনে প্রবেশ না করে রিসোর্টেই অবস্থান করেন।

সুন্দরবনের প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা এবং দেশি-বিদেশি পর্যটকদের কাছে এর আকর্ষণ বাড়াতে ২০ বছর মেয়াদি ‘সুন্দরবন ইকোট্যুরিজম মাস্টার প্ল্যান’ তৈরি করা হয়েছে। প্রচলিত অবকাঠামো উন্নয়নের পরিবর্তে বনাঞ্চলের প্রাকৃতিক পরিবেশ অক্ষুণ্ন রেখে টেকসই পর্যটন বিকাশের একটি রূপরেখা দেওয়া হয়েছে এ পরিকল্পনায়।

মাস্টার প্ল্যান প্রণয়নে ডেপুটি চিফ অব পার্টি হিসেবে দায়িত্ব পালন করা খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়ের (খুবি) ফরেস্ট্রি অ্যান্ড উড টেকনোলজি ডিসিপ্লিনের অধ্যাপক ড. মো. ওয়াসিউল ইসলাম বলেন, এটি প্রণয়নে প্রায় দুই বছর সময় লেগেছে।

তিনি বলেন, ‘মাস্টার প্ল্যানটি মূলত একটি কারিগরি রূপরেখা, যেখানে সুন্দরবনের পরিবেশগত ও অর্থনৈতিক দিককে সমন্বয় করা হয়েছে। এটি বাস্তবায়িত হলে দেশের পর্যটন শিল্পের বিকাশ, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালীকরণ এবং জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ত্বরান্বিত হবে।’

তিনি বলেন, পরিকল্পনাটির লক্ষ্য সুন্দরবন ও সংলগ্ন এলাকায় পরিবেশবান্ধব পর্যটন, ব্যবস্থাপনা ও বিপণনকে উৎসাহিত করা। এর মাধ্যমে জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে অবদান রাখা এবং স্থানীয় মানুষের আর্থসামাজিক অবস্থার উন্নয়ন করা হবে।

পরিকল্পনাটির লক্ষ্য আরও বেশি বিদেশি পর্যটক আকর্ষণ এবং বৈদেশিক মুদ্রা আয় বাড়ানো। অধ্যাপক ওয়াসিউল ইসলামের মতে, সুন্দরবনের শান্ত, নিরিবিলি পরিবেশ এবং চাঁদনি রাত বিদেশি দর্শনার্থীদের বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে।

এদিকে ‘বিশ্ব পর্যটন দিবস’ উপলক্ষে খুলনা টোয়াস আগামীকাল রোববার সকাল ৯টায় একটি বিশেষ রোড শোর আয়োজন করেছে।

রোড শোটি বিআইডব্লিউটিএ লঞ্চ টার্মিনাল থেকে শুরু হয়ে জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও শহীদ হাদিস পার্ক হয়ে শিববাড়ী মোড়ে গিয়ে শেষ হবে।

টোয়াসের সাংগঠনিক সম্পাদক শেখ আবির ইমতিয়াজ বলেন, এ আয়োজন কেবল একটি র‌্যালি নয়, বরং খুলনা ও সুন্দরবনের পর্যটন সম্ভাবনা তুলে ধরার একটি প্রতীকী উদ্যোগ।

তিনি বলেন, শিল্পনগরী হিসেবে পরিচিত খুলনা এ অঞ্চলের পর্যটনের গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার হয়ে উঠতে পারে। এ সম্ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে সুন্দরবন।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা বলেন, সুন্দরবনকে আন্তর্জাতিক পর্যটন গন্তব্য হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, গবেষণা, আন্তর্জাতিক ব্র্যান্ডিং এবং সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন।

তারা যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন, পর্যটন অবকাঠামো, গবেষণা সুবিধা, দক্ষ জনবল, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে প্রচার এবং সমন্বিত দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার ওপরও গুরুত্বারোপ করেন।

তারা বলেন, পর্যটক, ট্যুর অপারেটর, গাইড, নৌযান শ্রমিক, স্থানীয় জনগোষ্ঠী ও বন বিভাগের সমন্বিত উদ্যোগ সুন্দরবন সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

পর্যটনসংশ্লিষ্টরা জানান, সুন্দরবনের বিভিন্ন এলাকা থেকে প্লাস্টিক ও বর্জ্য অপসারণে পরিচ্ছন্নতা অভিযান পরিচালনার উদ্যোগও নিয়েছে টোয়াস।

তাদের মতে, সুন্দরবন, বাগেরহাটের ঐতিহাসিক স্থাপনা, নদীকেন্দ্রিক পর্যটন, লোকসংস্কৃতি এবং দক্ষিণ-পশ্চিম বাংলাদেশের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যকে একীভূত করে খুলনাকে একটি আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে তোলার সুযোগ রয়েছে।
সূত্র : বাসস 

প্রিন্ট

আরও সংবাদ